প্রদীপ কহিল,—চতুর্থ বার লোক পাঠালে খবর পেতে, বাবু মাথা। ন্যাড়া করে বেলতলায় গেছেন হাওয়া খেতে। কিন্তু তোমাদের বাড়িটা কোথায়?
আঙুল দিয়া দেখাইয়া উমা কহিল,—“ঐ গলিতে। বিয়াল্লিশ নম্বর। যাবেন? গরিবদের ঘরে পায়ের ধূলো দিতে বাধা নেই ত’?”
—“তুমি কী যে বল, উমা!” বলিয়া প্রদীপ উমার হাত ধরিয়া রাস্তাটুকু পার হইয়া গলির মধ্যে আসিয়া পড়িল।
গলিতে পা দিতেই প্রদীপের কেন জানি মনে হইল, সে স্বপ্ন দেখিতেছে। কণ্টকসঙ্কুল রুক্ষ পথ-প্রান্তে কেহ তাহার জন্য একটি আশ্রয়-নীড় নির্মাণ করিয়া রাখিয়াছে ভাবিয়া, বিধাতাকে তাহার বিশ্বাস করিতে ইচ্ছা হইল বোধ হয়। আকাশ-বিস্তীর্ণ মহাশূন্যতায় তাহার উডডান দুই পাখা আবার ক্ষণতরে বিশ্রাম লাভ করিতে পারিবে।
এই মেয়েটি তাহার ছোট দুইটি করতলে এ কী সান্ত্বনা লইয়া আসিয়াছে! নয়, নয়—তাহার জন্য স্নেহ নয়, সেবা নয়—সুধার আস্বাদ সে এই জীবনে নাই বা লাভ করিল! তবু একবার সে এই তিমিরময়ী রাত্রির পার খুজিবে—এই নিরানন্দ পথরেখা কোথায় আসিয়া আবার সুখস্বর্গলোকে উত্তীর্ণ হইয়াছে, তাহার সন্ধান না লইলে চলিবে কেন?
বত্রিশ, তেত্রিশ—বাড়িটার কাছে আসিয়া পড়িয়াছে আর কি! উমার ডাকে সে আরেকটি দুঃখিনী নারীর অনুচ্চারিত অনুনয় শুনিয়া থাকিবে হয় ত’। আরেকটু অগ্রসর হইলেই নমিতার দেখা পাইবে ভাবিতেই প্রদীপের মন বাজিয়া উঠিল। আশ্চৰ্য, এত দিন নমিতার কথা তাহার একটুও মনে হয় নাই। সে এত দিন এত সব ভয়ঙ্কর সমস্যায় জর্জরিত হইয়া ছিল যে, তাহার কাছে কোনো ব্যক্তিবিশেষের সামান্য দুঃখ-দুর্দশা সমুদ্রের তুলনায় গোষ্পদের চেয়েও হীন ছিল। কিন্তু এখন নিবিষ্টমনে নমিতার নিরাভরণ ব্যথা-মলিন মূর্তির কথা মনে পড়িয়া গেল। তাহার ধ্যানের ভারতবর্ষ ত’ এমনই। এমনিই বিগতগগৗরব, হৃতসৰ্বস্ব। শুধু অতীতের একটি ক্ষীণায়মান স্মৃতির সুধা সেচন করিয়া নিজের বর্তমান বিকৃত জীবনকে বাঁচাইয়া রাখিতেছে। নমিতার মত তাহারো কোনো ভবিষ্যৎ নাই। এমনি মূক, এমনি প্রতিবাদহীন।
বাড়ির দরজা পর্যন্ত আগাইয়া আসিল, কিন্তু নমিতার বিষয়ে উমাকে একটা প্রশ্নও করা হইল না। সে কেমন করিয়া দিন কাটাইতেছে না জানি। প্রশ্ন করা হইল না বটে, কিন্তু উমার পদানুসরণ করিয়া উপরে আসিয়াই তাহার চক্ষু সন্ধিৎসু হইয়া উঠিল। একটা তক্তপোষের উপর বসিয়া অরুণা একটি যুবকের সঙ্গে কথা কহিতেছিলেন; প্রদীপ আসিয়া প্রণাম করিলে তিনি পা দুইটাকে একটু সরাইয়া লইলেন মাত্র, কুশলজিজ্ঞাসা বা আনন্দজ্ঞাপনের সাধারণ সাংসারিক রীতিটুকু পৰ্যন্ত পালন করিলেন না। ব্যাপারটা অস্বাভাবিক বটে, কিন্তু ইহার বিসদৃশতাটা প্রথমে প্রদীপের চোখে পড়িল না; সে আপনার খুসিতে বলিয়া চলিল : “দেখা আবার হ’তেই হবে। হয় ত’ এতক্ষণে কোনো অতিথিশালায় গিয়ে পচতে হত, কিন্তু দিব্যি উমার সঙ্গে মা’র কাছে চলে এলাম। আমাকে আর পায় কে?”
এই কথাগুলির সস্নেহ প্রতিধ্বনি মিলিল না। অরুণা একটু দুরে বসিয়া কহিলেন, “তোমার এ বাড়িতে আসাটা উনি পছন্দ করেন না।”
উমা প্রখর-কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল,—“কারণ?”
মেয়ের মুখের এই প্রশ্ন শুনিবার জন্য অরুণা প্রস্তুত ছিলেন না। উমাই যে প্রদীপকে ডাকিয়া আনিয়াছে, এবং তাহাকে হঠাৎ বাড়ি হইতে চলিয়া যাইতে বলাটা যে উমার পক্ষেই অপমানকর, তাহা অরুণাকে তখন কে বুঝাইয়া দিবে? তাই তিনি রুক্ষস্বরে কহিলেন, – “কারণ আবার কি? সত্যি প্রদীপ, তুমি না এলেই উনি খুসি। হবেন।”
প্রদীপ বিস্ময়ে মূক, পাথর হইয়া গেল। মুহূর্তে ব্যাপারটা কি হইয়া গেল সে বুঝিয়া উঠিতে পারিল না। সে একবার উমার মুখের দিকে তাকাইল। সে মুখ কালো, লজ্জায় বিধুর। কোথায় যে একটা কদৰ্যতা রহিয়াছে, প্রদীপ ধরিতে পারিল না। তবু কহিল,—“কোথাও বসে থাকবার সময় আমাদের এমনিই কম, তবু চেনা লোকের মুখ দেখতে পেলে তাদের পাশে একটুখানি না জিরিয়ে যেতে পারি না, মা! আমরাও না। একজনকে ত’ চিরদিনের জন্যেই হারিয়েছি, কিন্তু নমিতাকে দেখতে পাচ্ছিনে ত’। তাকে একবার ডাকবে, উমা?”
অরুণার দৃষ্টি কুটিল হইয়া উঠিল; কথা শুনিয়া তিনি এমন সবেগে ‘সরিয়া বসিলেন যে, যেন শারীরিক গ্লানি বোধ করিতেছেন। দৃশ্যটা উমা ও প্রদীপ দুই জনেরই চোখে পড়িল। কিন্তু এই আচরণের একটা বুদ্ধিসম্মত ব্যাখ্যা বাহির করিবার আগেই অরুণা কহিলেন,—“তার খোঁজে দরকার কি? সে বাপের বাড়ি আছে।”
কটুকণ্ঠস্বরে প্রদীপ সামান্য বিচলিত হইল। তবু সহজ স্বরে স্মিতমুখে কহিল,—“ভালই হ’ল। তার বাপের বাড়ি শুনেছিলাম কলকাতায়ই। ঠিকানাটা ভুলে গেছি। ঠিকানাটা বলুন না, একবার না-হয় দেখা করে রাখি। কখন আবার কোথায় যাই ঠিক নেই।”
প্রদীপের এতটা অবিনয় অরুণার সহ হইল না। তিনি একবার উঠিয়া দাঁড়াইলেন। কহিলেন,—“তার ঠিকানা নিয়ে তোমার কি এমন স্বর্গপ্রাপ্তি ঘটবে শুনি?”
—“আমার না ঘটলে দেশের কিছুটা ঘটতে পারে হয় ত’। নমিতার হাতে এখন আর কী কাজ থাকতে পারে? জীবনে তার যা পরম ক্ষতি ঘটেছে তাকে পরের সেবায় পুষিয়ে নিতে না পারলে নিজের কাছে লজ্জার যে তার সীমা থাকবে না।”
—“তুমি যে চমৎকার বক্তা হয়েছ দেখছি। নমিতার কি করা উচিত না উচিত তার জন্যে তার অভিভাবক আছে। তোমার মাথা না ঘামালে কোনো ক্ষতি নেই।”
