বিছানাটা ক্ষিপ্রহাতে যথাসম্ভব গুছাইয়া নিতে নিতে নমিতা কহিল, —“আপনিই ত’ তার উত্তর দিয়েছেন। আপনাকে নাস্তিকতা থেকে রক্ষা কতে।”
একটা নিশ্বাস ছাড়িয়া অজয় বলিল,-“হবে।”
বিছানাটাকে শুইবার মত উপযুক্ত করিয়া নমিতা কহিল,—“আপনি। কাপছেন, শিগগির শুয়ে পড়ুন।”
অজয় এক লাফে বিছানায় আসিয়া আশ্রয় নিল।
নমিতা একটু কাছে সরিয়া আসিয়া বলিল,—“খুব কষ্ট হচ্ছে?”
অজয় কহিল,—“আমাকে এক গ্লাশ জল দিতে পার? খাব।”
—“আছি।” নমিতা তাড়াতাড়ি রান্নাঘর হইতে জল নিয়া আসিল।
জল খাইয়া সামান্য একটু সুস্থ হইয়া অজয় বলিল,-“এ ক’দিন বরাদুরে ত’ আর কম ঘুরিনি। মাথাটা যেন ফেটে পড়ছে। একটু হাওয়া করবে, নমিতা? দেখ, পাখাটা বোধ হয় তক্তপোৰের তলায় ঘুমুচ্ছে।”
তক্তপোষের তলা হইতে পাখাটা টানিয়া আনিয়া নমিতা শিয়রে দাঁড়াইয়া ক্ষিপ্রহাতে বাতাস করিতে লাগিল। কহিল,—“কাকিমাকে ডেকে আনি, কেমন?”
অজয় অস্থির হইয়া কহিল,—“না না, আর কাউকে ডাকতে হবে। চেয়ারটা টেনে এনে এখেনে বসে’ তুমিই হাওয়া কর একটু।”
নমিতা না বলিয়া পারিল না : “কিন্তু কেউ দেখতে পেলে কি বলবেন ভাবুন দিকি।”
নমিতার মুখের উপর স্থির দুইটি চক্ষু তুলিয়া অজয় বলিল,–“তোমাকে মন্দ বলবেন? কিন্তু মন্দ তুমি ত’ কিছু করছ না। কছ? রোগীর প্রতি যদি একটু পক্ষপাতিত্ব দেখাও, তার ত’ একটা বড়ো রকম প্রশংসাও আছে।”
—“কিন্তু যারা নিন্দা করবেন তারা ত’ আমার এই সেবাটুকুকেই দেখবেন না, দেখবেন অন্য কিছু।”
—“লোকে যদি ভুল দেখে তার জন্যে তুমি শাস্তি নেবে কেন? তুমি নিজে যদি অন্যায় বা অসঙ্গত বা অশিষ্টাচার মনে কর, দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে চলে যাও—কিন্তু লোকেব তুচ্ছ মিথ্যাকে ভয় করে যদি পালাও, তা হলে আমার দুঃখ থেকে যাবে। আমাকে একটু হাওয়া করা কি তোমার অন্যায় মনে হচ্ছে?”
তাড়াতাড়ি চেয়ারটা টানিয়া শিয়রের কাছে বসিয়া নমিতা কহিল, —“এখন আপনি চুপ করে একটু শুয়ে থাকুন তো, বিকেলে হয় ত’ জ্বরটা নেবে যাবে।”
একান্ত বাধ্য ছেলেটির মত অজয় চোখ বুজিয়া পড়িয়া রহিল। কয়েক মিনিট পাখা চালাইবার পর অজয় ঘুমাইয়া পড়িয়াছে ভাবিয়া, নমিতা চারিদিকে একবার ভাল করিয়া চাহিয়া নিল। তারপর চোরের মত অতি সন্তর্পণে তাহার ডান-হাতখানি অজয়ের কপালের উপর রাখিয়া, তাড়াতাড়ি তখুনি আর সরাইতে পারিল না।
১০. বাস-এ উঠিয়া প্রদীপের বিস্ময়
বাস্-এ উঠিয়া প্রদীপের বিস্ময়ের আর সীমা রহিল না : সামনের জায়গাটাতে পিছন ফিরিয়া উমা বসিয়া আছে। নিশ্চয়ই উমা। তাই বলিয়া এক-বাস লোকের সামনে হঠাৎ তাহাকে সম্ভাষণ করিলে সেটা বাঙলা-সমাজের রুচিতে হয়তো বাধিবে। উমা কোথায় নামে সেইটুকু লক্ষ্য করিবার জন্য প্রদীপ তাহার গন্তব্য স্থানের সীমাটুকু পার হইয়া চলিল। কেন না উমাকেও হঠাৎ চমকাইয়া দিতে হইবে।
বাস একটা গলির মোড়ে আসিয়া থাকিল। উমা এত উদাসীন যে, নামিবার সময়ও প্রদীপকে একবার লক্ষ্য করিল না, কিন্তু রাস্তায় পা দিতেই টের পাইল, পেছন হইতে কে তাহার আঁচল টানিয়া ধরিয়াছে। ভয়ে চোখ মুখ পাংশু হইয়া উঠিতে না উঠিতেই আনন্দে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল :
—“আপনি এখানে? বা রে! আর আমি আপনাকে সারা শহর খুঁজে বেড়াচ্ছি।”
প্রদীপ ততক্ষণে নিশ্চয়ই তাহার আঁচল ছাড়িয়া দিয়াছে। ফুটপাতের উপর উঠিয়া আসিয়া কহিল,—“সারা শহর খুঁজে বেড়াচ্ছ কি রকম? গুপ্তচর নাকি? এখানে এলে কবে?”
উমা কহিল,—“বাঃ, এখানে এসেছি আজ ঠিক সাত দিন হ’ল। বাবা-মাও এসেছেন। বাবা দু’মাসের ছুটি নিয়েছেন যে। আমি যে বেথুন-ইস্কুলে ভর্তি হয়ে গেলাম।”
প্রদীপ উমারই বিস্ময়ের প্রতিধ্বনি করিল: “বাঃ, এত খবর—আমি ত’ কিছুই জানতে পাইনি।”
—“কি করে পাবেন? আমাদের খবর পাবার জন্যে ত’ আপনার আর মাথা ধরে নি! ল্যাঙ্কাশায়ারে ক’টা কাপড়ের মিল বন্ধ হ’ল এ-সব বড়-বড় খবর রাখতেই আপনাদের সময় যায় ফুরিয়ে, না? আমরা বাচলাম কি মরুলাম—তাতে আপনার বয়ে গেল।”
উমার কথার সুরে স্নিগ্ধ অভিমান ঝরিয়া পড়িল। সে যে মনে মনে কখন এমন অন্তরঙ্গ হইয়া উঠিয়াছে, প্রদীপ তাহা ভাবিয়া পাইল। কণ্ঠস্বর কোমলতর করিয়া কহিল,—“আমি যে এখানে ছিলাম বহুদিন। গিয়েছিলাম বহু দূরে—পাঞ্জাবে। জরুরি কাজ ছিল।”
একটি অস্ফুট ভঙ্গি করিয়া উমা কহিল,—“সবই ত’ আপনার জরুরি কাজ। কিন্তু যাবার আগে আমাদের আপনার ঠিকানাটা লিখে পাঠালে নিশ্চয়ই পাঞ্জাবের ট্রেন মিস করতেন না। তা’, আমাদের সঙ্গে আপনার আর সম্পর্ক কি বলুন। দাদার সঙ্গে সব ছাই হয়ে গেছে।”
রাস্তায় দাঁড়াইয়া এই সব কথার কি উত্তর দিবে, প্রদীপের ভাষায় কিছুতেই কুলাইয়া উঠিল না। এই মেয়েটির কথায় তাহার চিত্ত যেন ভরিয়া উঠিল। এই পৃথিবীর পারে কেহ তাহার জন্য একটি সশঙ্ক স্নেহ নিভৃতে লালন করিতেছে, ভাবিতে তাহার মন ভিজিয়া গেল। বলিল,-“আমার ঠিকানার হঠাৎ এত দরকার হল?”
—“না, দরকার আর কি! অজানা মানুষ, কলকাতায় এলাম— তেমন কোনো বন্ধু-আত্মীয়ও আর নেই যে, দু-চারটে উপদেশ দেবে। দাদা থাকলে বরং—”
কথাটা অসমাপ্ত রাখিয়াই উমা প্রদীপের মুখের দিকে তাকাইল এবং চোখোচাখি হইতেই সে ফিক্ করিয়া হাসিয়া ফেলিল। সেই স্বল্প সঙ্কেতময় হাসিটিতে প্রদীপের মর্মবেদনা নিমেষে মুছিয়া দিয়া উমা কহিল,—“দাদার পুরোনো ডায়রিতে আপনার মেস্-এর একটা ঠিকানা পেয়েছিলাম। সেখানে বার তিনেক লোক পাঠিয়েছি; প্রথম বার বল্লে, বাবু ঘুমুচ্ছেন; দ্বিতীয় বার বল্লে, বাবু বাড়ি নেই; তৃতীয় বার বলে, ও বাড়ীর কেউ বাবুকে চেনেই না।” বলিয়া উমা একটু নুইয়া পড়িয়া খিল খিল করিয়া হাসিয়া উঠিল।
