নমিতা নিঃশব্দে নিজের ঘরে ফিরিয়া আসিল। শুনিতে পাইল মা-ও কাকিমার পক্ষ লইয়া তাহাকেই মন্দ বলিতেছেন। মা’র এই অসহায় অবস্থায় কাকিমার বিরোধিতা করিবার উপায় ছিল না, তাই তাহাকে বাধ্য হইয়া কাকিমার এই কটুবাক্যে সায় দিতে হইতেছে। আর-আর দিন তিরস্কৃত হইয়া নমিতা নিজেকে একান্ত ব্যর্থ মনে কবিয়া চোখের জল ফেলিত, আজ সে বুঝিল, এইভাবে এই অন্যায় বরদাস্ত করা তাহার আত্মসম্মানের অনুকূল হইবে না। নারী এবং পরাবলম্বী হইয়াছে বলিয়াই যে, তাহাকে মাথা পাতিয়া চিরকাল এই ঘৃণ্য নির্যাতন সহিতে হইবে এবং আত্মসম্মানে জলাঞ্জলি দিয়া একটা প্রতিবাদ করিবার জন্য পর্যন্ত ভাষা পাইবে না, তাহা ভাবিতে তাহার সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ জ্বালতে লাগিল। কিন্তু সম্প্রতি তাহার কোনো প্রতিকার নাই—তবু মনে মনে এই একটা বিদ্রোহতাব পোষণ করিয়া তাহার তৃপ্তির আর অবধি রহিল না।
মা নমিতার সঙ্গে কোনো কথা না কহিয়া বালিশে মুখ গুঁজিয়া কাদিতে লাগিলেন; নমিতাও নিঃশব্দে বইয়ের উপর মুখ গুঁজিয়া রহিল। এই অবরোধ হইতে তাহারা কবে মুক্তি পাইবে? প্রদীপ সেই যে একটু বন্ধুতার আশ্বাস দিয়া পলাইয়াছে, আর তাহার দেখা নাই। পরের কাছ হইতে আশ্রয় বা সাহায্য নিতে গেলে কত বিপদ, কত ভয়, নমিতাকে নিজের পায়ে দাঁড়াইতে হইবে। কত নিন্দা, কত গ্লানি, কত অখ্যাতি—নমিতা শিহরিয়া উঠিল। সংসারে বন্ধুরূপে কাহাকেও স্বীকার বা গ্রহণ করাও বাঙালি মেয়ের নিষিদ্ধ,স্বামী যদি মরিল, তবেই তুমি অব্যবহৃত ছিন্ন জুতার সামিল হইয়া উঠিলে। এক বেলা আলোচাল খাইয়া তোমাকে ইহজীবন সার্থক করিতে হইবে। কোথায় একটা লোক মরিল, আর অমনি তোমার দেহ ও আত্মা একসঙ্গে পক্ষাঘাতে অসাড় হইয়া উঠিবে : এই বিধান মাথা পাতিয়া নিতে তাহার আর ইচ্ছা হইল না, অথচ প্রদীপ একটু স্নেহাতিশয্যে তাহার হাত ধরিয়া ফেলিয়াছিল বলিয়া, শ্বশুর-মহাশয় তাহাকে কেবল মারিতে বাকি রাখিয়াছিলেন। এমন কি, সেখানে তাহার চিত্তবিভ্রম ঘটিবার সুযোগ আছে বলিয়া, তাহাকে কাকার বাড়িতে পাঠাইয়া দেওয়া হইয়াছে।
ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই সমস্ত বাড়ি নিঝুম হইয়া গিয়াছে। নমিতা বই মুড়িয়া রাখিয়া চুলের খোঁপাটা বাঁধিয়া লইয়া নীচে নামিতে লাগিল। এই তাহার প্রথম বিদ্রোহ। ভয় যে করিতেছিল না তাহা নয়, তবু যে-লোক সামান্য দুইটি ভাত চাহিয়া না পাইয়া ফিরিয়া গিয়াছে, তাহার প্রতি সে কেন যে একটি মধুর সমবেদনা অনুভব করিতেছে বুঝা কঠিন। সুমি কাকিমার ছেলেপিলেদের সহিত তাস নিয়া ঘর-বানানোর খেলাতে মত্ত ছিল, দিদিকে লক্ষ্য করিল না। নমিতা সোজা অজয়ের ঘরের কাছে আসিয়া দাঁড়াইল।
দরজা দু’ফাঁক হইয়া রহিয়াছে, বেশ দেখা গেল ঘরে কেহ নাই। ঘরে কেহ নাই ভাবিয়াই নমিতা আসিতে পারিয়াছে, নচেৎ তক্তপোষের উপর অজয়কে শুইয়া থাকিতে দেখিলে বিদ্রোহিনী নমিতা লজ্জায় জিত, কাটিয়া ধীরে ধীরে প্রত্যাবর্তন করিত হয় তো।
ঘরের চেহারা দেখিয়া নমিতা ছি ছি করিয়া উঠিল—এই ঘরে মানুষে থাকে! তক্তপোষের উপর ছেড়া একটা মাদুর পাতা—তাহার উপর একটা তোষক আছে বটে, কিন্তু সেটাকে একটা কথা বলিলেও অত্যুক্তি করা হয়। মশারির তিনটা কোণ ছিঁড়িয়া গিয়া বিছানার উপরই বিস্তৃত হইয়া আছে, ছেড়া বালিশের তুললাগুলি মেঝেয় ও বিছানায় এলোমেলো হইয়া হাওয়ায় উড়িতেছে। সদ্য-কাচাননা কয়েকটা ধুতি মেঝেয় ধূলার উপরই পড়িয়া আছে—ঘরে কতদিন যে। ঝট পড়ে নাই, তাহার চেয়ে আকাশে কয়টা তারা আছে বলা সহজ। টেবিলটার উপর স্তুপীকৃত বই, খাতা, ওষুধের শিশি, দাড়ি কামাইবার সরঞ্জাম—যেন একটা প্রকাণ্ড বাজার বসিয়াছে। নমিতা যেন হঠাৎ একটা কাজ পাইয়া গেল। এই বিশৃঙ্খল ঘরে যে-লোকটি বাস করে, সে কোন নিয়মের অনুগত নয় বলিয়া তাহার মনে ক্ষোতের সঙ্গে সঙ্গে স্বচ্ছ একটি স্নেহ জমিয়া উঠিতে লাগিল।
অতি যত্নে নমিতা এই নংরা ঘরকে মার্জনা করিতে বসিল। ঝাঁটা কুড়াইয়া আনিয়া ধূলা ঝাড়িল, টেবিলটা ভদ্রলোকের ব্যবহারের উপযুক্ত করিয়া তুলিল এবং টেবিলের কাছে যে চেয়ার আছে, নিজের অলক্ষিতে তাহারই উপর বসিয়া সামনের আয়নায় নিজের মুখ হঠাৎ দেখিতে পাইয়া লজ্জায় রাঙা হইয়া উঠিল। তাড়াতাড়ি চেয়ার ছাড়িয়া উঠিয়া বিছানাটার সংস্কার করিতেছে, বলা-কহ নাই, হঠাৎ খোলা দরজা দিয়া সেই একমাথা রুথু চুল নিয়া অজয় আসিয়া হাজির!
বিস্ময়ের প্রথম ঘোরটা কাটিতেই অজয় চেয়ারে বসিয়া পড়িয়া শ্রান্তকণ্ঠে কহিল,—“যতই কেন না নাস্তিকতা করি, ভগবান বারে বারে প্রমাণ করে দিচ্ছেন যে, তিনি আছেনই আছেন। এখান থেকে ভাত
পেয়ে একবার ভাবছিলুম বেলেঘাটায় যাব, বাস্-এও উঠেছিলুম, কিন্তু হঠাৎ জ্বর এসে গেল। ভীষণ জ্বর!” বলিয়া নিজেই নিজের কপালে হাত রাখিল। কহিল,—“ভাব ছিলুম ঘরে ত’ ফিরে যাব, কিন্তু বিছানা-পত্র যে রকম নোংরা হয়ে আছে শোব কি করে? বিছানা গুছোবার প্রবৃত্তি আমার কোনো কালেই ত’ নেই।”
মশারির একটা কোণ, হাতে ধরিয়া নমিতা চিত্রাপিতের মত দাঁড়াইয়া আছে। বিস্ময়ের সঙ্গে বেদনা মিশাইয়া কহিল,-“জ্বর হ’ল?”
—“কত অত্যাচার আর সইবে বল? তখন যে ক্ষুধার সময় ভাত পেলুম না, স্নানও যে করতে পারলুম না—ভালোই হয়েছে। অসুখটা তা হলে আরো বাড়ত—আমার অসুখ বাড়তে দিলে চলবে কেন? আমার যে কত কাজ—কী প্রকাণ্ড দায়িত্ব আমার হাতে।” একটু থামিয়া আবার সে প্রশ্ন করিল,—“কিন্তু তুমি হঠাৎ এ-ঘরে কেন, নমিতা?”
