সুমি বলিল,—“কাল রাতে বাড়ি ফেরে নি। দু’দিন আমার সঙ্গে দেখা নেই।”
অজয়ের জন্য নমিতার মনে উদ্বেগ ও সহানুভূতি পুঞ্জিত হইয়া উঠিল। সংসারের দৈনন্দিন চলা-ফেরার সঙ্গে তাহার একটুও মিল নাই, দূর হইতে অজয়ের ব্যবহারের এই প্রকাণ্ড অসঙ্গতিটা নমিতা লক্ষ্য করিয়াছে। কখন যে অজয় বাড়ি আসে তাহার ঠিক নাই, দুই দিন হয় ত’ আসিলই না, স্নান না করিয়াই হয় ত’ ভাতের থালা লইয়া গিলিতে বসে, মধ্যরাতে কল হইতে জল পড়িতেছে শুনিয়া কাকিমার আদেশে কল বন্ধ করিতে আসিয়া দেখিয়াছে, অজয় স্নান করিতেছে— আর অগ্রসর হয় নাই। এই সব নিয়মবহির্ভূত আচরণে দিদির মুখে তিরস্কারেরও আর বিরাম ছিল না, তবু এই ছেলেটি সমস্ত অভিযোগ আলোচনায় কান না পাতিয়া দিব্যি আত্মসম্মান লইয়া এই বাড়িতেই কালাতিপাত করিতেছে। অজয়কে নমিতার মনে হয় অসাধারণ, কোনো অভ্যাস বা নিয়মের সঙ্গেই সে নিজেকে খাপ খাওয়াইতে পারিবে না। তাহাকে দেখিয়া মনে হয় সে যেন কি-এক কঠোর সাধনায় লিপ্ত, একা-একা সংগ্রাম করিতে তাহার নিজের শক্তি যেন আর কুলাইতেছে না—তাহার ললাটে প্রতিজ্ঞার তীব্র দীপ্তি থাকিলেও দুই চোখে একটি ঔদাস্যময় ক্লান্তির ভাব আছে। ক্ষণেকের জন্যও সংসারের কাজকর্মের ফাঁকে অজয়কে দেখিতে পাইলে নমিতা যেন তাহার অন্তরের এই অন্তহীন ক্লান্তিকর সংগ্রামের ইতিহাস এক মুহুর্তেই পড়িয়া নেয়। মনে হয় অজয়কে কোনো কাজে সাহায্য কবিতে পারিলে সে ধন্য হইয়া যাইত। কিন্তু যে দুই হাতে সবেগে নাড়া দিয়া তাহাকে এমন করিয়া জাগাইয়া দিল, সে সহসা আবার অপরিচয়ের অন্ধকারে ধীরে-ধীরে অপসৃত হইয়া যাইবে, ইহা ভাবিতে নমিতা চোখে যেন অন্ধকার দেখিতে লাগিল।
সেদিন দুপুরের খাওয়া-দাওয়া চুকিয়া গেলে প্রায় একটার সময় এক মাথা রুক্ষ চুল লইয়া অজয় আসিয়া নীচের উঠানটুকুতে দাঁড়াইয়া হাঁক দিল : “দিদি হাঁড়িতে ভাত আছে?”
দিদি তখন দিবানিদ্রা ভোগ করিতেছিলেন, তাই এক ডাক যথেষ্ট নয়। অজয় আবার ডাক দিল। পাশের ঘরে নমিতা দেয়ালে পিঠ রাখিয়া অভিধানের সাহায্যে একটা রুষীয় উপন্যাসের মৰ্ম্মোদঘাটন করিবার চেষ্টা করিতেছিল, ক্ষুধিত অজয়ের ডাক শুনিয়া সে ধড়মড় করিয়া উঠিল। তাড়াতাড়ি গিয়া ঘুমন্ত কাকিমার পায়ে নাড়া দিয়া তাঁহাকে জাগাইয়া তুলিল। এই ব্যবহারটাও যে তাহার নীতিশাস্ত্রের ঠিক অনুযায়ী হয় নাই তাহা সে জানিত, কিন্তু ক্ষুধার সময় অজয় দুইটা ভাত চাহিতে আসিয়াছে, এই খবর পাইয়া সে কিছুতেই নিশ্চেষ্ট উদাসীন হইয়া বসিয়া থাকিতে পারিল না।
কাকিমা উঠিয়া জানালা দিয়া মুখ বাড়াইয়া তীক্ষ্ণকণ্ঠে বলিয়া উঠিলেন,—“এই অসময়ে কে তোর জন্যে ভাতের থালা নিয়ে বসে থাবে শুনি? রাতে কোথায় পড়ে ছিলি? তুই তোর খুসি-মত যা-তা করবি, কখন খাবি কখন খাবি নেবসে বসে’ কে তার হিসেব রাখবে? আমি বাড়িতে বাবাকে লিখে দিচ্ছি—এরকম হলে তোমার এখানে আর পোষাবে না। সংসারের সুবিধে না দেখে নিজের খেয়ালমাফিক চলা-ফেরা করতে চাও, হোটেল আছে।”
এত কথায়ও অজয়ের স্থৈর্য্য একটুও টলিল না—এ-সব কথা যেন তাহার একেবারেই গ্রাহ করিবার নয়। সে পরিষ্কার সহজ গলায় কহিল,—“বেশ ত’ নাই পেলুম ভাত—চৌবাচ্ছায় জল আছে ত’? স্নান করতে পারলেই আমার অর্ধেক খিদে যাবে। যাঃ, জলও নেই। আমি এখন আবার বেরুচ্ছি, দিদি। সন্ধ্যের সময় আসতে পারি, তখন দু’মুঠো ভাত পেলেই আমার চলবে।” বলিয়া অজয় সেই অভুক্ত অবস্থায়ই বাহির হইয়া গেল।
বিড়বিড় করিতে করিতে কাকিমা জানালা হইতে ফিরিয়া আসিয়া আবার শয্যা লইলেন, কিন্তু নমিতার মনে কোথায় বা কেন যে ব্যথা করিয়া উঠিল, তাহা সে ভাল করিয়া বুঝিতে পারিল না। কাকিমার এই ব্যবহারে তাহার নিজেরই আর লজ্জার শেষ ছিল না—এ-সব ক্ষেত্রে প্রতিবাদ বা প্রতিবিধান করিবার তাহার কোনোই অধিকার নাই। তবু যতদূর সম্ভব কণ্ঠস্বর কোমল করিয়া সে কহিল, “না খেয়ে বাড়ি থেকে চলে গেলেন। সামান্য দুটো ফুটিয়ে দিলে হত না?”
একে নমিতাই অকারণে তাঁহার সুখনিদ্রার ব্যাঘাত হইয়াছে, তাহার উপর তাহার মুখের উপর অজয়ের হইয়া সে ওকালতি করিতে চায়—কাকিমা জ্বলিয়া উঠিলেন : “তোর আবার আদর উথলে উঠলো কেন? তুই যে দিন-কে-দিন বড় বেহায়া হচ্ছি।”
নিজের উপর সমস্ত তিরস্কার ও লাঞ্ছনা নমিতা নীরবে সহ্য করিয়াছে, কিন্তু অজয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করিয়া এই হীন বাক্যযন্ত্রণা সে সহিতে পারিল না। তবু স্বভাবসুলভ বিনয় করিয়াই কহিল,—“না খেয়ে বাড়ি থেকে কেউ চলে গেলে বাড়ির মঙ্গল হয় না শুনেছি—সংসারে শ্রী থাকে না।”
কথার তাৎপর্যে যতটা না হোক, নমিতা যে আবার তাহার কথার প্রতিবাদ করিল, এই অশ্রদ্ধা দেখিয়া কাকিমা রাগে একেবারে বিছানার উপর উঠিয়া বসিলেন; সুর চড়াইয়া দিতে হইল : “বাড়ির মঙ্গল হবে না মানে? তুই আমার সমস্ত বাড়িকে শাপ দিচ্ছিস নাকি? নিজে স্বামী খেয়ে শাকচুন্নি সেজে পরের মঙ্গলে তোমার হিংসে হচ্ছে।” ধীর-কণ্ঠে নমিতা কহিল,—“অমন যা-তা বলল না কাকিমা।”
—“কেন বলবো না শুনি? সংসারে শ্রী থাকবে না? শ্ৰী আছে তোমার কপালে!”
গোলমাল শুনিয়া নমিতার মা উঠিয়া আসিলেন। তাহাকে শুনাইবার জন্য কাকিমা গলায় আরো শান্ দিতে লাগিলেন : “আমার ভায়ের জন্য এতই যদি তোর মন পুড়ছিল হতভাগী, নিজে গিয়ে মাছ মাংস বেঁধে দিলি নে কেন? ক্ষীরের পুলি তৈরি করে দিতি বসে’ বসে।”
