—“এ রকম করে’ ক’দিন কাটাবে? তোমার মুখের সেই অসার উত্তরটা আমি শুনতে চাই না। বলতে চাই, এম্নি করে অমূল্য সময় অপব্যয় করে তোমার কোন পরমার্থ লাভ হচ্ছে?”
—“কিন্তু এ ছাড়া আমার আর কী-ই বা করবার আছে?”
—“তুমি পড় না কেন? সুমিকে দিয়ে তোমাকে যে একটা বই। পাঠিয়েছিলুম তা পড়েছিলে?”
নমিতার মুখে অল্প একটু হাসি দেখা দিল; কহিল,-“তা পড়া বারণ হয়ে গেছে।”
—“বারণ হয়ে গেছে? কারণ?”
—“কারণ, কাকা ও-সব উপন্যাস-পড়া নিষেধ করেছেন।”
অজয় অসহিষ্ণু হইয়া উঠিল; “উপন্যাস? ও ত’ একটা ইতিহাস মাত্র—শাদা সত্য ঘটনা। আর, মাছ মাংস মশুর ডালের মত উপন্যাসও তোমাদের নিষিদ্ধ নাকি? মনুর কোন্ অধ্যায়ে তা লেখা আছে?”
নমিতার কণ্ঠস্বরে ব্যঙ্গের আভাস স্পষ্ট হইয়া উঠিল : “আমাকে গীতা পড়তে বলেছিলেন। সংস্কৃত শব্দরূপই জানি না তা তার মাথামুণ্ডু আমি কি বুঝবো ছাই? ওটা আমার চমৎকার ঘুমুবার ওষুধ হয়েছে।”
আরো একটু কাছে সরিয়া আসিয়া অজয় কহিল,—“এটা তোমার কাছে জুলুম মনে হয় না?”
—“জুলুম কিসে?”
-“মানুষকে ভালো করার মধ্যেও একটা পরিমাণ জ্ঞান থাকা উচিত। জামাইবাবুকে একখানা টিগোনোমেট্রির বই দিয়ে আঁক কষতে বল না।”
—“কিন্তু ধর্মগ্রন্থ ছাড়া আর আমাদের পাঠ্য কী হতে পারে?”
—“আমাদের আমাদের করে তুমি নিজেকে একটা গণ্ডীর মধ্যে টেনে এনে ছোট করে তুলছ কেন? তুমি কি মানুষ নও? তোমার কপালে সিদূর নেই বলেই যে তোমার জীবনধারণে কোনো সুখ থাকবে না—এ যারা তোমাকে বোঝাতে চায় তারা তোমার আত্মার অত্যাচারী। তাদেব তুমি মেনো না। আমি আছি তোমাব বন্ধু। কী করে সময় কাটাবে? খুব করে পড়ে। প্রথমত তাই পড়ে। যা বুঝতে ব্যাকরণ লাগে না, লাগে শুধু অনুভূতি। যেমন ধরো কবিতা। তোমাকে প্রস্তুত হতে হবে।”
নমিতা একটু ভীত হইয়া বলিল,—“কিসের জন্যে?”
—“নিজেকে আবিষ্কার করবার জন্যে।”
—“ও-সব কথার মানে আমি বুঝি না।”
—“সে বোঝবার সময়টুকু পৰ্যন্ত তোমাকে অপেক্ষা করতে হবে। আমি আনছি বই। জীবনকে দেখবার জন্যে বই হচ্ছে বাতায়ন, সে বাতায়ন দিকে দিকে উন্মুক্ত করে দিতে হবে।” বলিয়া দ্রুতপদে অজয় অদৃশ্য হইয়া গেল।
মধ্যরাত্রে নমিতা আবার ঘুম হইতে উঠিয়া বারান্দার ধারটিতে আসিয়াছে। কয়েকবার বৃষ্টি হইয়া যাইবার পরেও আকাশের স্তম্ভিত ভাবটা এখনো কাটিয়া যায় নাই—সেই নিরানন্দ বিবর্ণ আকাশের তলে সমস্ত শহরটা যেন অবসন্ন হইয়া ঝিমাইতেছে—পৃথিবী আর চলিতে পারিতেছে না। বিকাল হইতে নমিতার মন-ও রাতের আকাশের মত ঘোলাটে হইয়া রহিয়াছে—নানা সমস্যা ও সংস্কারের আবর্তে পড়িয়া সে হাঁপাইয়া উঠিতেছিল। তাহার জীবনের ভবিষ্যৎ মুহূর্তগুলি যেন তাহাকে আর নিশ্চিন্ত থাকিতে দিবে না—প্রত্যেকটি মুহূৰ্ত্ত ফলবান হইবার জন্য তাহাকে উদ্বস্ত করিয়া তুলিয়াছে। এই আত্মবিস্মৃতিময় আরাম তাহাকে আর পোষাইবে না। কিন্তু এই দুঃখের আরামকে শতধা বিদীর্ণ করিয়া নবজীবনের ঝড় আসিবে কবে?
হঠাৎ তাহার খেয়াল হইল রাস্তায় কে একজন পাইচারি করিতেছে। আজ তাহার চোখ কৌতূহলী হইয়া উঠিয়াছে, ভালো করিয়া ঠাহর করিয়া দেখিল, অজয়। রোজই ত’ এই সময় এমনি একটি লোক রাস্তায় ঘোরাঘুরি করে, এমন করিয়া কোন দিনই সে লক্ষ্য করে নাই। এত দিনের সেই লোকটিই যে অজয় ইহার সম্বন্ধে লেশমাত্র সন্দেহও তাহার মনে রহিল না এবং এই বিশ্বাসটুকুকেই অন্তরে লালন করিতে গিয়া নিমেষে নমিতা রোমাঞ্চিত হইয়া উঠিল। আজ দূর হইতে অজয়কে স্পষ্ট করিয়া দেখিবার জন্য তাহার দৃষ্টি একাগ্র হইয়া উঠিল এবং এমন আগ্রহ সহকারে চাহিয়া থাকাটার মধ্যে কোথাও যে এতটুকু অসৌজন্য থাকিতে পারে, তাহা তাহার ঘুণাক্ষরেও মনে হইল না। লোকটিকে অজয় জানিয়া চোখ ফিরাইয়া লইলে এই রাত্রি বোধ করি আর কাটিত না। চলিতে চলিতে অজয় যখন মোড়ের গ্যাস-পোসটের কাছে আসিতেছে, তখন অনতিস্পষ্ট আলোতে তাহাকে একটু দেখিয়া লইতে না লইতেই অন্ধকার আসিয়া সব কালো করিয়া দিতেছে। তবু যেটুকু সে দেখিতে পাইতেছে না, সেইটুকুর জন্যই তাহার মন উচাটন হইয়া উঠিল।
কাকিমার ছোট খুকিটা অভ্যাসমত চেচাইয়া উঠিয়াছে। একটা হাত-পাখা দিয়া কাকিমা তাহাকে খুব পিটাইতেছেন : “মর মরু শুনি। সারা থিয়েটার জালিয়ে এসে হারামজাদির এখনো কান্না থামে না। কোনো দেবীর কৃপা হলেও ত’ বেঁচে যাই।”
পাশের খাট হইতে কাকা হাকিলেন : “নমি উঠে আসে না কেন?”
কাকিমার উত্তর শোনা গেল : “ধুমুসসা হয়ে গিলতেই পারে সব। নমি আসবেন! মায়ে-ঝিয়ে দিব্যি নাকে তেল দিয়ে ঘুমুচ্ছে। পরের পয়সায় খেলে ডানিও নবাবের বেটি হয়ে ওঠে। ‘
এইবার সামনের ঘর হইওে মা’র ডাক অসিল : “নমিতা।”
অজগর সাপের মত কুণ্ডলী পাকাইয়া বিপুল রাজপথ ঘুমাইয়া রহিয়াছে; আকাশ নিৰ্বাক, অন্ধের চক্ষুর মত সঙ্কেতহীন, গম্ভীর। অজয় আরেকবার মোড় ফিবিয়া গ্যাস-পোসটের তলা দিয়া ঘুরিয়া আসিল, আবার চলিয়াছে। দেয়ালের প্রান্তটুকু ঘেঁসিয়া বসিয়াও তাহাকে আর দেখা গেল না, ফিরিতে আবার এক মিনিট লাগিবে। না, খুকিকে কাঁধে ফেলিয়া হাঁটিয়া-হাটিয়া ঘুম পাড়াইতে হইবে। অজয়ের চোখে কি ঘুম নাই? না, নমিতাকে উঠিতে হইল।
০৯. অজয়কে বুঝিয়া উঠা ভার
অজয়কে বুঝিয়া উঠা ভার। সেই যে সেদিন দুই হাতে করিয়া কতকগুলি বই পায়ের কাছে নামাইয়া দিয়া চলিয়া গিয়াছে, তাহার পর আর দেখা হয় নাই। অথচ এমন কতকগুলি মুহুৰ্ত্ত খুঁজিয়া পাওয়া কখনই মুস্কিল হইত না যখন উদ্যত শাসনের উপদ্রব একটু শিথিল ছিল। একদিন এমন করিয়া সমস্ত হৃদয়ে সংশয়ের ঝড় তুলিয়া সহসা নির্লিপ্ত হইয়া যাইবার কারণ কি, নমিতা কিছুই বুঝিতে পারিল না। নিজে গিয়া যে অজয়কে কিছু জিজ্ঞাসা করিবে, তাহা ভাবিতেও তাহার ভয় করে—সমস্ত সংসারের চোখে সেটা একটা বীভৎস অবিনয় মনে করিয়া সে নিবৃত্ত হয়, দ্বিগুণ মনোযোগ দিয়া বইগুলিকে আঁকৃড়াইয়া ধরে। সুমিকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিল,—“তোর জয়-দা কি করছে রে?”
