অজয় হাসিয়া উঠিল; কহিল,—“তোমাকে এ-সব কথা কে শেখালে? বিধবা তুমি কি ইচ্ছে করে’ হয়েছ? তুমি কি সাধ করে স্বেচ্ছায় এই বৈরাগ্যের বেশ নিয়েছ? নিয়তির বিধানের চেয়েও সমাজের শাসন যখন প্রবল হয়ে ওঠে, তখন অন্ধের মতো তার কাছে। বশ্যতা স্বীকার করা মানে নিজেকে অপমান করা। তোমার ভগবান তোমাকে ঘরে বসে’ মুড়ি নিয়ে ছেলেখেলা করতে উপদেশ দিয়েছেন? এই যে দলে দলে লোক যুদ্ধে প্রাণ দিচ্ছে, দেশ স্বাধীন কতে কারাগারকে তীর্থ করে তুলছে, তারা সব ভগবানের বিরুদ্ধাচারী?”
নমিতা ঘাড় নীচু করিয়া অস্ফুটকণ্ঠে কহিল,—“কিন্তু সংসারের শান্তি রাখতে হলে প্রতি পদে আমাকে তার মুখ চেয়ে চলতে হবে। সংসার চায় আমি বসে বসে কড়ি নিয়ে ছেলেখেলা করি।”
অজয় উত্তেজিত হইয়া উঠিয়াছে : “কাদের নিয়ে সংসার? জান, সমাজ আমরা সৃষ্টি করেছি, আমরাই তাকে ভাঙবো। আমাদের আবার অধিকার না থাকলে আমরা তাকে মাম্বো কেন? যা তোমাকে তৃপ্তি দেয় না বরং সমস্ত জীবনকে সঙ্কুচিত খর্ব করে রাখে, সেই আচার তোমাকে পাড়ার পাঁচজনকে খুসি করতে অম্লানবদনে পালন করতে হবে, সেটা খুব উচ্চাঙ্গের সতধৰ্ম্ম নয়। তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে মনের উপর প্রভুত্ব খাটাতে পারে এমন একটা কৃত্রিম শক্তিকে যদি তুমি মাননা, তবে সেই হবে তোমার সত্যিকারের মৃত্যু। আমরা এমন মরবার জন্যে জন্মাইনি।”
ঝর ঝর করিয়া শরৎকালের বৃষ্টি নামিয়া আসিল। নমিতা কণ্ঠস্বর আর্ল করিয়া কহিল,—“কিন্তু সংসার বা সমাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবার শক্তি বা ঘোগ্যতা আমার কিছুই নেই। যারা দেহে মরবার আগে আত্মায় মরে থাকে, আমি তাদেরই একজন। আমাকে দিয়ে আমার নিজেরো কোনো আশা নেই।”
কথা শুনিয়া অজয় মুগ্ধ হইয়া গেল,বৃষ্টির সঙ্গে এই কথা কয়টি মিলিয়া আকাশে ও মনে এমন একটি মাধুৰ্য বিস্তার করিল যে, ক্ষণকালের জন্য সে অভিভূত হইয়া রহিল।
পরমুহূর্তেই উদ্দীপ্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করিল : “ভারতবর্ষ বহু বৎসর ধরে’ স্বাধীনতার সাধনা করছে, সে খবর তুমি রাখ?”
একটু হাসিয়া নমিতা বলিল,—“রাখি বৈ কি।”
—“কিন্তু কেন সফল হচ্ছে না জান?”
—“কেন?”
—“আমরা এত সব ছোটখাটো শাসন ও সংস্কারের দাসত্ব করছি যে বড়ো একটা মুক্তির পথে আমাদের পদে-পদে বাধা ঘটছে। আমরা যে মন্দির-বেদী গড়তে চাই তার থেকে অস্পৃশ্য বলে’ অনেক কাউকে সরিয়ে রাখি। নিজের কাছে মুক্ত, স্বতন্ত্র না হতে পারলে বাইরের মুক্তি আমরা কি করে পেতে পারি বলল? প্রকৃতির রাজ্যে সব কিছুই নিয়মাধীন—আমাদের বেলায়ই তার ব্যতিক্রম ঘটবে সেটা আমাদের প্রকাণ্ড দুরাশা। আমরা সমাজে ছ’শো ছত্রিশটা দেওয়াল গেঁথে একে অন্যের থেকে পৃথক হয়ে কোটি কোটি স্বার্থপরতার সর্ষ বাধাবো, সমাজগঠনে সুবিধে না দিয়ে নাবীকে রাখব পদদলিত, চাষা-মজুরকে রাখবো পায়ের ক্রীতদাস আর হাতের ক্রীড়নক—আমরা কি করে বৃহত্তর স্বাধীনতার দাবি করতে পারি? তার মানে, সাফল্য আমাদের সেইদিনই অনিবাৰ্য নমিতা, যেদিন আমরা প্রত্যেকে বর্তমানের এই শূন্য না থেকে এক হয়ে উঠেছি। আমরা প্রত্যেকে যদি এক হই, তবে কেউ আর একাকী থাকবে না। তেত্রিশ কোটি শূন্য যোগ দিলে সেই শূন্যই থেকে যাবে—শত যোগবলেও সেই যোগফল তুমি বদলাতে পারবে না কখনো।”
খানিক থামিয়া অজয় আবার কহিল,—“হ্যাঁ, বিদ্রোহ করবার যোগ্যতা তোমার নেই—নিজের অসম্পূর্ণতা সম্বন্ধে তোমার এই জ্ঞানটুকু আছে বলে তোমার ওপর শ্রদ্ধা আমার বেড়ে গেলো। কিন্তু সেই যোগ্যতা তোমাকে অর্জন করতে হবে। তুমি চম্কে উঠো না। যোগ্য না হয়ে আজ যদি তুমি সংসারের বিরুদ্ধাচরণ কর, সেটা তোমাকে শোভা পাবে না বলেই লোকের চোখে লাগবে প্রখর দৃষ্টিকটু, এবং স্বয়ং আমি পৰ্যন্ত বলববা অন্যায়—তোমাকে ধিক্কার দেবব। কিন্তু যেদিন তুমি আত্মার শৌর্য্যে ঐশ্বৰ্য্যশালিনী হয়ে উঠে এই সব তুচ্ছ সংস্কার ও মিথ্যাচারকে ছুঁড়ে ফেলে বাইরে বেরিয়ে আসবে—সেদিন সব্বারই আগে যার প্রণাম পাবে সে আমাব।”
নমিতার হৃদয় উদ্বেল হইয়া উঠিতেছিল; ধীর সংযতকণ্ঠে সে কহিল,—“কিন্তু সমাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহাচরণটাই কি বড়ো কীর্তি হবে?”
—“যাকে তোমার এখন মাত্র বিদ্রোহাচরণ মনে হচ্ছে, তখন দেখবে সেই তোমার জীবন। তখন যেটা তোমার কাছে একান্ত সহজ, ন্যায্য ও স্বাভাবিক মনে হবে—সেটাই অন্যের মতে হবে অন্যায়, কেউ-কেউ বা তার সংজ্ঞা দেবে পাপ। পরের পায়ের সঙ্গে পা মিলিয়ে চলবার জন্যে আমরা হাটতে শিখিনি। অনবরত সীমারেখা টেনে-টেনে জীবনকে আমরা কুণ্ঠিত ও সঙ্কীর্ণ করে রেখেছি বলেই আমরা অহর্নিশ প্রতিবেশীদের সঙ্গে সাদৃশ্য বাঁচিয়ে চলতে চাই। কিন্তু জীবনের পরিধিকে বিস্তৃত করে দিতে থাক, ব্যক্তিত্বের সাধনায় তুমি ক্রমোন্নতি লাভ কর, দেখবে তুমি অদ্বিতীয় হয়ে উঠেছ। তাকে যদি বিদ্রোহ বল, আমরা সেই বিদ্রোহ নিশ্চয়ই করব। তখন বিদ্রোহ না করাটাই হবে আত্মহত্যা।”
শরৎকালের বৃষ্টি স্বল্পায়ু—অনেকটা নারীর ভালবাসার মত। বৃষ্টির পরে আকাশ আবার স্নিগ্ধ ও বেদনাতুর চোখের মত ভাবগম্ভীর হইয়া উঠিয়াছে। আবার কথা সুরু বরিতে দেরি হইতেছিল। চুপ করিয়া কত ক্ষণ কাটিল কাহারো কিছু খেয়াল ছিল না। হঠাৎ অজয় প্রশ্ন করিল : “সমস্ত দিন তুমি কি করে কাটাও?”
নিমেষে নমিতার ঘোর কাটিল বুঝি,—আবার সে তাহার নিরানন্দ পৃথিবীর মুখোমুখি আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। কহিল,–“কি করে আর কাটাই? কাজ কৰ্ম্ম করি আর ঘুমুই।”
