অচিন্ত্য,
শেষ পর্যন্ত প্রগতি বোধহয় উঠে গেলো না। তুমি বলবে অমন প্রাণান্ত করে চালিয়ে লাভ কি? লাভ আছে।
পরিমলবাবুর (ঘোষ) সঙ্গে আজ কথা কয়ে এলাম। তিনি পঁচিশ টাকার মত মাসিক সাহায্য জুটিয়ে দিতে পারবেন, আশ্বাস দিলেন। আমি কলকাতায় দশের ব্যবস্থা করেছি। সবসুদ্ধ পঞ্চাশ টাকার মত দেখা যাচ্ছে। আরো কিছু পাব আশা করা যাচ্ছে। তার ওপর বিজ্ঞাপনে দুটো-পাঁচটা টাকা কি আর না উঠবে। উপস্থিত ঋণ শোধ করবার মত উপায়ও পরিমলবাবু বাংলে দিলেন। এবং কাগজ যদি চলেই, কিছু ঋণ থাকলে যায় আসে না।
তোমার কাছে কিছু সাহায্য চাই। পাঁচটা টাকা তুমি সহজেই spare করতে পারো। সম্পূর্ণ নিজেদের একটা কাগজ থাকা-সেটা কি কম সুখের? আধুনিক সাহিত্যের আন্দোলনটা আমরা কয়েকজনে মিলে control করছি, এ কথা ভাবতে পারার luxury কি কম? কি তোমার সঙ্গে argue করেই বা কি লাভ? তোমার কাছে শুধু মিনতি করতে পারি।
মনে হচ্ছে কাকে যেন হারাতে বসেছিলাম, ফিরে পেতে চলেছি। শরীর যদিও অত্যন্ত খারাপ, মন ভালো লাগছে। কিন্তু তুমি আমাকে নিরাশ করে না। With love, B.।
কল্লোল থেকে ক্কচিৎ যেতাম আমরা চীনে পাড়ার রেস্তোরাঁতে। তখন নানকিন ক্যাণ্টন আর চাঙোয়া তিনটেই চীনে-পাড়ার মধ্যেই ছিল, একটাও বেরিয়ে আসেনি কুলচ্যুত হয়ে। ব্ল্যাক আর বার্ন দুটো কথাই কদাকার, কি ব্ল্যাকবার্ন একত্র হয়ে যখন একটা গলির সঙ্কেত আনে তখন স্বপ্নে-দেখা একটা রূপকথার রাজ্য বলে মনে হয়।
শহরের কৃত্রিম একঘেয়েমির মধ্যে থেকে হঠাৎ যেন একটা ছুটির সংবাদ। রুক্ষ রুটিনের পর হঠাৎ যেন একটু সুন্দর অসম্বদ্ধতা—সুন্দর অযত্নবিন্যাল। দেশের মধ্যে বিদেশ–কর্তব্যের মধ্যখানে হঠাৎ একটু দিবাস্বপ্ন।
এলেই চট করে মনে হয় আর কোথাও যেন এসেছি। শুধু আলাদা নয়, বেশ একটু অচেনা-অচেনা। সমস্ত শহরের ছুটোছুটির ছন্দের সছে এখানকার কোনো মিল নেই। এখানে সব যেন ঢিলে-ঢালা, ঢিমে-তেতালা। খাটো-খাটো পোশাকে বেঁটে-বেঁটে কতকগুলি লোক, আর পুতুলের মত অগুনতি শিশু। ভাসা-ভাসা চোখে হাসি-হাসি মুখ! একেকটা হরফে একেকটা ছবি এমনি সব চিত্রিত সাইনবোর্ডে বিচিত্র দোকান। ভিতরের দিকটা অন্ধকার, যেন তন্দ্রাচ্ছন্ন, কারা হয়ত ঠকঠাক কাজ করছে আপন মনে, কারা হয়তো বা চুপচাপ জুয়ো খেলছে গুম হয়ে আর দীর্ঘ নলে প্রচণ্ড ধূমপান করছে। যারা চলেছে তারা যেন ঠিক চলে যাচ্ছে না, ঘোরাফেরা করছে। ভিড়ে-ভাড়ে যতটা গোলমাল হওয়া দরকার তার চেয়ে অনেক নিঃশব্দ। হয়ত কখনো একটা রিকশার টুং-টাং, কিংবা একটা ফিটনের খুঁটখাট। সবই যেন আস্তে-সুস্থে গড়িমসি করে চলেছে। এদের চোখের মত গ্যাসপোস্টের আলোও যেন কেমন ঘোলাটে, মিটিমিটি। ভয়ে পা-টা যেন একটু ছমছম করে। আর ছমছম করে বলেই সব সময়ই এত নতুন নতুন মনে হয়। কোনো জিনিসের নতুনত্ব বজায় রাখতে পারে শুধু দুটো জিনিস—এক ভয়, দুই ভালোবাসা।
সরু গলি, আবছা আলো, অকুলীন পাড়া,অথচ এরি মধ্যে জাঁকালো রেস্তরাঁ, সাজসজ্জার ঢালাচালি। হাতির দাঁতের কাঠিতে চাউ-চাউ খাবে, না সপ-সুই? না কি আস্ত-সমস্ত একটি পক্ষীনীড়? এ এমন একটা জায়গা যেখানে শুধু জঠরেরই খিদে মেটে না, চিত্তের উপবাস মেটে—বে চিত্ত একটু সুন্দর কবিতা, সুন্দর বন্ধুতা, আর সুন্দর পরিবেশের জন্যে সমুৎসুক।
তখন একটা বাগভঙ্গি চলেছে আধুনিকদের লেখায়। সেটা হচ্ছে গল্পে-উপন্যাসে ক্রিয়াপদে বর্তমানকালের ব্যবহার। এ পর্যন্ত রাম বললে, রাম খেল, রাম হাসল ছিল—এখন সুরু হল রাম বলে, রাম খায়, রাম হাসে। সর্বনাশ, প্রচলিত প্রথার ব্যতিক্রম যে, শনিবারের চিঠি ব্যঙ্গ শুরু করল। অথচ সজনীকান্তর প্রথম উপন্যাস অজয়ে এই বর্তমান কালের ক্রিয়াপদ। একবার এক ডাক্তার বসন্তের প্রতিষেধকরূপে টিকে নেওয়ার বিরুদ্ধে প্রবল আন্দোলন চালায়। সভা করে-করে সকলকে জ্ঞান বিলোয়, টিকের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে তোলে। এমনি এক টিকাবর্জন সভায় বক্তৃতা দিচ্ছে ডাক্তার, অমনি ভিড়ের মধ্যে থেকে কে চেঁচিয়ে উঠল। তুমি তোমার আস্তিন গুটোও দেখি। আন্তিন গুটিয়ে দেখা গেল ডাক্তারের নিজের হাতে টিকে দেওয়া।
তেমনি আরেকটা চলেছিল বানানভঙ্গি। সংস্কৃত শব্দের বানানকে বিশুদ্ধ রেখে বাংলা বা দেশজ শব্দের বানানকে সরল করে আনা। নীচ যে অর্থে নিকৃষ্ট তাকে নীচই রাখা আর যে অর্থে নিম্ন তাকে নিচে ফেলা। বাংলা বানানের ক্ষেত্রে ণত্ব-ষত্ব বিধানকে উড়িয়ে দেওয়া—তিনটে স-কে একীভূত করার সূত্র খোঁজা। রবীন্দ্রনাথ যে কেন চষমা বা জিনিষ বা পূষতূ লিখবেন তা তো বুঝে ওঠা যায় না। রানি বলতেই বা মূর্ধন্য ণ লোপ করবেন তো দীর্ঘ ঈ-কার কেন লোপ করবেন না তা কে বলবে। কিন্তু সব চেয়ে পীড়াদায়ক হয়ে উঠল মূর্ধন্য ষ-এর সঙ্গে ট-এর সন্মিলন। নষ্ট-ভ্রষ্ট স্পষ্ট করে লেখ, আপত্তি নেই, কিন্তু স্টিমার স্টেশন অগাস্ট ক্রিস্টমাসের বেলায় মূর্ধন্য ষ-এ ট দেবার যুক্তি কি? একমাত্র যুক্তি দন্ত্য স-এ ট-র টাইপ নেই ছাপাখানায়—যেটা কোনো যুক্তিই নয়। টাইপ নেই তো দন্ত স-য় হসন্ত দিয়ে লেখা যাক। যথা স্টিমার, স্টেশন স্ট্যাম্প আর স্টেথিসকোপ। নিন্দুকেরা ভাবলে এ আবার কী নতুন রকম সুরু করলে। লাগো হসন্তের পিছনে। হসন্ত খসিয়ে দিয়ে তারা কথাগুলোকে নতুন রূপসজ্জা দিলে—সটিমার আর সটেশন—আহা, কি সটাইল রে বাবা!
