সজনীকান্ত একদিন কল্লোল-আপিসে এসে উপস্থিত হল। আড্ডা জমাতে নয় অবিশ্যি, কখানা পুরানো কাগজ কিনতে নগদ দামে। উদ্দেশ্য মহৎ, সাধ্যমত প্রচার করতে কাউকে। ভাবখানা এমন একটু প্রশ্রয় পেলেই যেন আড্ডার ভোজে পাত পেড়ে বসে পড়ে। আসলে সজনীকান্ত তো কল্লোলেরই লোক, ভুল করে অন্য পাড়ায় ঘর নিয়েছে। এই বোয়াকে না বসে বসেছে অন্য রোয়াকে। তেমনি দীনেশরঞ্জনও শনিবারের চিঠির হেড পিয়াদা! শনিবারের চিঠির প্রথম হেডপিস, বেত্রহন্ত ষণ্ডামার্কের ছবিটি তারই আঁকা। সবই এক ঝাঁকের কই, এক সানকির ইয়ার, শুধু টাকার এপিঠ আর ওপিঠ। নইলে একই কর্মনিষ্ঠা। একই তেজ। একই পুরুষকার।
প্রেমেন শুয়ে ছিল তক্তপোষে। বললুম, আলাপ করিয়ে দিই—
টানা একটু প্রশ্রয় দিলেই সজনীকান্তকে অনায়াসে চেয়ার থেকে টেনে এনে শুইয়ে দেয়া যেত তক্তপোষে–অঢেল আড্ডার ঢিলেমিতে। কিন্তু কলির ভীমের মত প্ৰেমেন হঠাৎ হুমকে উঠল কে সজনী দাস?
এ একেবারে দরজায় খিল চেপে ঘর বন্ধ করে দেয়া। আলো নিবিয়ে মাথার উপরে লেপ টেনে দিয়ে ঘুমুনো। প্রশ্নের উত্তর থাকলেও প্রশ্নকর্তার কান নেই। আবার শুয়ে পড়ল প্রেমেন।
সজনীকান্ত হাসল হয়তো মনে মনে। ভাবখানা, কে সজনী দাস, দেখাচ্ছি তোমাকে।
টেকনিক বদলাল সজনীকান্ত। অত্যল্পকালের মধ্যে প্রেমেনকে বন্ধু করে ফেলল।
সঙ্গে-সঙ্গে শৈলজা। ক্রমে-ক্রমে নজরুল। পিছু-পিছু নৃপেন।
শক্তিধর সজনীকান্ত! লেখনীতে তো বটেই, ব্যক্তিত্বেও।
পুরীতে বেড়াতে গিয়েছি, সঙ্গে বুদ্ধদেব আর অজিত। একদিন দেখি সমুদ্র থেকে কে উঠে আসছে। পুরাণে-মহাভারতে দেখেছি কেউ কেউ অমনি উদ্ভূত হয়েছে সমুদ্র থেকে। তাদের কারুর হাতে বিষভাণ্ডও হয়তো ছিল। কিন্তু এমনটি কাউকে দেখব তা কল্পনাও করতে পারিনি। আর কেউ নয়, স্বয়ং সজনীকান্ত।
একই হোটেলে আছি। প্রায় একই ভোজনভ্রমণের গণ্ডীর মধ্যে। একই হাস্যপরিহাসের পরিমণ্ডলে।
সজনীকান্ত বললে, শুধু বিষভাণ্ড নয়, সুধাপাত্রও আছে। অর্থাৎ বন্ধু হবারও গুণ আছে আমার মধ্যে।
তাতে সন্দেহ কি, কিন্তু আমরাও যদি বন্ধু হয়ে যাই তবে ব্যবসা চলবে কি দিয়ে? কাকে নিয়ে থাকবে? গালাগালের মধ্যে ব্যক্তিবিদ্বেষ একটু মেশাতে হবে তো? বন্ধু করে ফেললে ঐটুকু ঝাঁজ আনবে কোত্থেকে? তোমার ব্যবসায় মন্দা পড়বে যে।
কথাটা ঠিকই বলেছ। তোমাদের সাহিত্য, আমাদের ব্যবসা। সাহিত্যিকরা রাজহাঁস আর ব্যবসায়ীরা পাতিহাঁস! পাতিহাঁসের খাদ্য জল-কাদা, রাজহাঁসের খাদ্য দুধ। কিন্তু গালাগাল সইতে পারবে তো?
গালাগাল দিচ্ছ কে বলছে? দস্যু রত্নাকরও প্রথমে মরা মরা বলেছিল। মরার বাড়া গাল নেই। সবাই ভেবেছিল বুঝি গাল দিচ্ছে। কিন্তু, জানো তো, ম মানে ঈশ্বর, আর রা মানে জগৎ–আগে ঈশ্বর পরে জগৎ। তরে গেল রত্নাকর। অর্জুন যখন শ্রীকৃষ্ণের স্তব করলেন, প্রথমেই বললেন, অচিন্ত্যং অব্যক্তং অনন্তং অব্যয়ং! আর বুদ্ধদেব–তিনি তো ভগবান তথাগত-নামোচ্চারণভেষজৎ তুমিও পার হয়ে যাবে দেখো।
আর তোমরা?
আমরা তো ভালো দলেই আছি। রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী থেকে সুরু করে নজরুল ইসলাম পর্যন্ত সবাইর সঙ্গে আমরাও নিন্দার এক পঙক্তিতে বসেছি—আমাদের ভয় নেই।
তথাস্তু! তবে একটা নব সাহিত্য-বন্দনা শোন :
জয় নবসাহিত্য জয় হে
জয় শাশ্বত, জয় নিত্যসাহিত্য জয় হে।
জয়, অধুনা-প্রবর্তিত বঙ্গে
রহ চিরপ্রচলিত রঙ্গে
শ্রমিকের, ধনিকের, গণিকার, বণিকের
সাম্যের কামের, শাশ্বত ক্ষণিকের–
জড় ও পাষাণের ভস্ম ও শ্মশানের
আঁস্তাকুড়ে যাহা ফেলি উদ্বৃত্ত হে
সকল অভিনব-সাহিত্য জয় হে।
প্রগতি-কল্লোল-কালিকলম
অন্তর ক্ষতেতে লেপিলে মলম
রসের নব নব অভিব্যক্তি
উত্তরা ধূপছায়া আত্মশক্তি–
প্রেম ও পীরিতের নিত্য গদ্গদ সলিলে অভিষিক্ত
জয় নব সাহিত্য জয় হে
জয় হে জয় হে জয় হে
প্রাচীন হইল রসাতলগত, তরুণ হল নির্ভয় হে
জয় হে জয় হে জয় হে।
হেম বাগচির সঙ্গে আলাপ হয় বলাই সিঙ্গি লেন-এর মেসে। জীবনানন্দের বেলায় যেমন, ওর বেলায়ও ওর ঠিকানা খুঁজে নিয়ে ওকে বার করি। নতুন-লেখক বা শিল্পী খুঁজে নিয়ে তাদের সঙ্গে আলাপ করাতে দারুণ উৎসাহ, বিশেষত সে যদি মর্মজ্ঞ হয়। হেম হচ্ছে তেমন কবি যার সান্নিধ্যে এসে বসলে মনে হয় নিবিড়স্নিগ্ধ বৃক্ষছায়াতলে এসে বসেছি। সবল-বিশাল চেহারা, চোখ দুটি দীর্ঘ ও শীতল—স্বপ্নময়। তীব্রতার চেয়ে প্রশান্তি, গাঢ়তার চেয়ে গভীরতার দিকে দৃষ্টি বেশি। প্রথম যখন ওকে পাই তখন ওর জীবনে সদ্য মাতৃবিয়োগব্যথার ছায়া পড়েছে—সেই ছায়ায় ওর জীবনের সমস্ত ভঙ্গিটি কমনীয়। সেই লাবণ্যটি সমস্ত জীবনে সে মেহ ও শ্রদ্ধার সঙ্গে লালন করেছে, তাই তার কবিতায় এই শুচিতা এই স্নিগ্ধতা। হাডিঞ্জ হস্টেলে থেকে হেম যখন ল পড়ে তখন প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় চারতলার উপরে তার ঘরে আড্ডা দিতে গিয়েছি, দ্বৈত কলকূজন ছেড়ে পরে চলে এসেছি বহুস্বননের কল্লোলে। কোনো উদ্দামতায় হেম নেই, সে আছে নির্মল স্থৈর্যে, কোনো তর্কতীক্ষ্ণতায় সে নেই; সে আছে উত্তপ্ত উপলব্ধিতে। নিকষকষিত সোনার মতই সে মহার্ঘ।
কিন্তু প্রবোধকুমার সান্যাল অন্য জাতের মানুষ। ক্ষিতি-অপ-তেজ হয়তো ঠিকই আছে, কিন্তু মরুৎ আর ব্যোম যেন অন্য জগতের। মুক্ত হাওয়ার মুক্ত আকাশের মানুষ সে, আর সেই হাওয়া আর আকাশ আমাদের এই বদ্ধ জলার জীবনে অল্পদৃষ্ট। তাকে খুঁজে নিতে হয় না, সে আপনা থেকেই উচ্ছ্বসিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। কল্লোলে প্রথম বছরেই তার গল্প বেরোয়, কিন্তু সশরীরে সে দেখা দেয় চতুর্থ বর্ষে। আর দেখা দেওয়া মাত্রই তার সঙ্গে রক্তের রাখিবন্ধন হয়ে গেল। প্রবোধের চরিত্রে একটা প্রবল বন্যতা ছিল, সেই সঙ্গে ছিল একটি আশ্চর্য স্থৈর্য ও দৃঢ়তার প্রতিশ্রুতি। বাসা ভেঙে দিতে পারে প্রবোধ, কিন্তু কোনোদিন আশ্রয় তুলে দেবে না কিছুতেই। বিচ্ছেদ আছে প্রবোধের কাছে, কিন্তু বিয়োগ নেই। সমস্ত চাঞ্চল্য-চাপল্য সত্ত্বেও তার হৃদয়ে একটা বলিষ্ঠ ঔদার্য আছে, সমস্ত উত্থানে-পতনে তার মধ্যে জেগে আছে ঘরছাড়া সদাতৃপ্ত সন্ন্যাসী। দুর্বিপাকে পড়েও তার এই উদারতা ঘোচ না। শত ঝড়েও মুছে যায় না তার মনের নীলাকাশ। আর সকলের সঙ্গে বুদ্ধির ও বিদ্যার যোগাযোগ, প্রবোধের সঙ্গে একেবারে অন্তরের সংস্পর্শ। ওর মাঝে মেঘ এলেও মলিনতা আসে না। রমতা সাধু আর বহতা জল, মানে যে সাধু ঘুরে বেড়ায় আর যে জলে নিরন্তর স্রোত বয়, তা কখনো মলিন হয় না।
