কী প্রচুর বিশ্বাস নিয়ে আমরা চলি, এর জন্য কত ত্যাগস্বীকার করি, কত দুঃখবরণ করে নিই। এ কথা কি কখনো ভাবার বে এর প্রতিদান এই হতে পারে। আমরা যে নিজেকে একান্ত ভাবে ঢেলে দিয়ে ফতুর হয়ে থাকি সে দেয়ার কোনো কূলকিনারা থাকে না। সেই গান যদি অগ্রাহ্য হয়, তাহলে আবার নতুন করে জীবন গড়ে তুলতে পারি এমন ক্ষমতা আমাদের থাকে না। এটা কি আমাদের প্রতি মস্ত অবিচার করা হয় না—অন্যের জীবনকে এমন ভাবে নিষ্ফল করে দেয়ার কি অধিকার আছে? ইতি তোমাদের বুদ্ধদেব
একবার একসঙ্গে ফিরলাম দুজনে ঢাকা থেকে বুদ্ধদেব আর আমি। ইস্টিমারে সাধারণ ডেকের যাত্রী—সে ডেকে পাশে বাক্স-তোরঙ্গ রেখে সতরঞ্চি বিছিয়ে হয় ঘুম, নয় তো তাসখেলাই একমাত্র সুকাজ। কিন্তু শুদ্ধ গল্প করেই যে রাশি-রাশি মুগ্ধ মুহূর্ত অপব্যয় করা যায় তা কে জানত। সে গল্পের বিষয় লাগে না, প্রস্তুতি লাগে না। পরিবেশ লাগেনা। যা ছিল আজেবাজে, অর্থাৎ আজ-বাদে কাল যা বাজে হয়ে যাবে, তাতেই ছিল চিরকালের বাজনা।
একটানা জলের শব্দ—আমাদের কথার তোড়ে তা আর লক্ষ্যের মধ্যে আসছে না। কিন্তু স্টিমার যখন-ভোঁ দিয়ে উঠত, তখন একটা গম্ভীর চমক লাগত বুকের মধ্যে। যতক্ষণ না ধ্বনিটা শেষ হত কথা বন্ধ করে থাকতাম। কোনো স্টেশনের কাছাকাছি এলে বা ছেড়ে যাবার উপক্রম করলেই স্টিমার বাঁশি দিত। কিন্তু যখনই বাঁশি বাজত, মনে হত এটা যেন চলে যাবার সুর, ছেড়ে যাবার ইসারা। ট্রেনের সিটির মধ্যে কি-রকম একটা কর্কশ উল্লাস আছে, কিন্তু স্টিমারের বাঁশির মধ্যে কেমন একটা প্রচ্ছন্ন বিষাদ। স্থির স্থলকে লক্ষ্য করে চঞ্চল জলের যে কান্না, এ যেন তারই প্রতীক।
আমার বাসা তখন তিরিশ নম্বর গিরিশ মুখার্জি রোড। সংক্ষেপে তিরিশ গিরিশ। তারই এক তলার এক ছোট্ট কুঠুরিতে আমি সর্বময়। সেই কৃশ-কৃপণ ঘরেই উদার হৃদ্যতায় আতিথ্য নিয়েছে বন্ধুরা। বুদ্ধদেব আর অজিত, কখনো বা অনিল আর অমলেন্দু। সেই ছোট বন্ধ ঘরের দেওয়ার যে কি করে সরে-সরে মিলিয়ে যেত দিগন্তে, কি করে সামান্য শূন্য বিশাল আকাশ হয়ে উঠত, আজ তা স্বপ্নের মত মনে হয়। হৃদয় যে পৃথিবীর সমস্ত স্থানের চেয়ে বিস্তারময় তা কে না জানে।
ভাই অচিন্ত্য,
নারায়ণগঞ্জে কয়েক ঘণ্টা halt করে আজ সন্ধ্যায় বাড়ি এসে পৌঁচেছি। টুনু আগেই এসেছিল। মা আমার সঙ্গে এলেন না, আপাতত তিনি দিনকতক নারায়ণগঞ্জেই কাটাবেন। এতে আমারই হল মুস্কিল। মা না থাকলে এ বাড়ি আমার কাছে শূন্য, অর্থহীন। শারীরিক অসুবিধে, আয়াস ইত্যাদি ছাড়াও মা-র অভাব আমার কাছে অনেকখানি। মা না থাকলে মনে হয় না যে এ বাড়িতে আমার সত্যিকার স্থান আছে। ছুটির বাকি কটা দিন খুব যে সুখে কাটবে এমন মনে হচ্ছে না। এখন আপশোষ হচ্ছে এত শিগগির চলে এলাম বলে। ভাবছি, আরো কয়েকটা দিন কাটিয়ে এলে কারুর কিছু ক্ষতি হত না। এক তোমার ছাড়া;–তা তোমার ওপর জোর কি আবদার চলে বই কি। কলকাতায় এই দিনগুলি যে কি ভরপুর আনন্দে কেটেছে এখন বুঝতে পারছি। তোমাদের প্রত্যেকের কথা কী গভীর স্নেহের সঙ্গেই না স্মরণ করছি। বিশেষ করে সুধীশকে মনে পড়ছে। আসবার সময় স্টেশনে ওব মুখোনা ভারি মলিন দেখেছিলাম।
ঢাকা একেবারে ফাঁকা হয়ে গেছে—পথঘাট নির্জন। পরিমল বাড়ি চলে গেছে, থাকবার মধ্যে অমল আর অনিল। সন্ধ্যেবেলায় ওদের সঙ্গে খানিকক্ষণ ঘুরলাম—টুনুও ছিলো। এখানে এখন কিছুই যেন করার নেই। আমার ঘরটা নোঙরা, অগোছাল হয়ে আছে—মার হাত না পড়লে শোধরাবে না। এখন পর্যন্ত জিনিসপত্রও খুলিনি–ভারি ক্লান্ত লাগছে অথচ ঘুম আসছে না। কাল দিনের বেলায় সব সিজিলমিছিল করে গুছিয়ে বসতে হবে। তারপর একবার কাজের মধ্যে ডুব দিতে পারলেই হু-হু করে দিন কেটে যাবে।
কল্লোলের সবাইকে আমাদের কথা বলো। তোমাদের সঙ্গে আবার যে কবে দেখা হবে তারি দিন গুনছি। ইতি। চিরানুরক্ত বুদ্ধদেব
ভাই অচিন্ত্য,
- R, স্বদেশী-বাজারের গল্প পড়ে আমাকে চিঠি লিখেছেন গল্প চেয়ে। প্রত্যুত্তরে আমি একটি গল্প পাঠিয়ে দিয়েছি। টাকার কথা খোলাখুলি লিখেছি—সেটাই ভালো। লেখাটা in itself আর আমার life-এর কোন point নয়; অর্থাগমের সম্ভাবনা না দেখলে আর লিখবো না-লিখতে ইচ্ছা করে না। এই জন্যই মাসখানেকের মধ্যে এক লাইনও কবিতা লিখিনি। আত্মসমর্থনকল্পে D. R.-কে অনেক কথা লিখতে হয়েছে। আশা করি সে চিঠি ও গল্প তুমি পড়েছ।
এখন পর্যন্ত যে ব্যবস্থা আছে তাতে ২০শে ডিসেম্বরের মধ্যেই কলকাতায় গিয়ে উপস্থিত হতে পারবো, আশা করি। কলেজে ছুটি হবার আগেই পালাবো; কারণ তা না হলে অসম্ভব ভিড়ে পথিমধ্যেই প্রাণনাশের আশঙ্কা আছে। ক্যাপটেন ঘোষ নেবুতলায় বাসা নিয়েছেন, তাঁর ওখানে এবার উঠবে। তোমার ল-র কথা আমিও ভেবে রেখেছি। রোজ বিকালে দেখা হলেই চলবে। ভৃগুও কলকাতায় আসবে। টুনুর ঠিক নেই, ওর first class পাওয়া এখন সব চেয়ে দরকার। শীতের ছোট দিন–মিষ্টি রোদ—দুচারজন বন্ধু, সময়ের আবার ডানা গজাবে, ছোটখাট জিনিস নিয়ে খুশির আর অন্ত থাকবে না।
প্রগতি তুলে দিলাম। অসম্ভব–অসম্ভব–আর চালানো একেবারে অসম্ভব। আমার ইহকাল-পরকালে, অন্তরে-বাহিরে, বাক্যে-মনে আর আপনার বলে কিছু বইলো না। কত আশা নিয়েই যে সুরু করেছিলাম, কত উচ্চাভিলাষ, স্নেন, আনন্দ—কী প্রকাণ্ড idealismই যে এর পেছনে ছিলো! যাক, এখন বাজারে যা কিছু ধার আছে তা একটু-একটু করে শোধ করে উঠতে পারলেই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বাঁচি। অত্যন্ত প্রিয়জনও দীর্ঘকাল বিষম রোগে ভুগলে যেমন তার মৃত্যুই বাঞ্ছনীয় হয়ে ওঠে, প্রগতিও শেষের দিকে তেমনি অসহ্য হয়ে উঠেছিল। প্রগতির মৃত্যুসংবাদ কলকাতার ব্রডকাস্ট করে দিয়ো। তুমি আমার প্রাণপূর্ণ ভালোবাসা নাও। ইতি। তোমার বুদ্ধদেব
