এবারকার কল্লোলে শৈলজার ছবি দিয়েছে দেখে ভারি আনন্দ পেলাম। আধুনিকদের মধ্যে যারা শ্রেষ্ঠ তাদের যথাযোগ্য সম্মান করার সময় বোধহয় এসেছে। তাহলে কিন্তু এবার মোহিতলালের ছবিও দিতে হয়। কারণ আজকের দিনে কথা-সাহিত্যের ক্ষেত্রে যেমন শৈলজানন্দ, কাব্যসাহিত্যের ক্ষেত্রে তেমনি মোহিতলাল–নয় কি?
নজরুল ইসলাম এখানে দিন-কতক কাটিয়ে গেলেন। এবার তার সঙ্গে ভালোমত আলাপ হল। একদিন আমাদের এখানে এসেছিলেন; গানে, গল্পে, হাসিতে একেবারে জমজমাট করে রেখেছিলেন। এত ভালো লাগলো! আর ওঁর গান সত্যি অদ্ভুত! একবার শুনলে সহজে ভোলা যায় না। আমাদের দুটো নতুন গজল দিয়ে গেছেন, স্বরলিপি সুদ্ধ ছাপবো….নাট্যমন্দির এখানে এসেছে। তিনরাত অভিনয় হবে। আমি আজ যেতে পারলাম না-একদিনও যেতে পারবো না হয়তো। অর্থাভাব। যাক—একবার তো দেখেইছি। এর পর আবার স্টার আসছে। ঢাকাকে একেবারে লুটে নেবে।
প্রগতি সত্যি-সত্যি আর চললো না। কোনোমতে জ্যৈষ্ঠটা বের করে দিতে পারলেই যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচি। তবু—যদি কখনো অর্থাগম হয়, আবার কি না বার করবো?…আপনার মাকে আমার প্রণাম জানাবেন।
১৮. শনিবারের চিঠি ও সজনীকান্ত দাস
কোন এক গোরা টিমকে ছ-ছটা গোল দিলে মোহনবাগান। রবি বোস নামে নতুন এক খেলোয়াড় এসেছে ঢাকা থেকে-এ তারই কারুকার্য। সেইবার কি? না, যেবার মনা দত্ত পর পর তিনটে কর্নারশট থেকে হেড করে পর-পর তিনটে গোল দিলে ভি-সি-এল-আইকে? মোটকথা, ঢাকার লোক যখন এমন একটা অসাধ্যসাধন করল তখন মাঠ থেকে সিধে ঢাকায় চলে না যাওয়ার কোনো মানে হয় না। যে দেশে এমন খেলোয়াড় পাওয়া যায় সে দেশটা কেমন দেখে আসা দরকার।
সুতরাং খেলার মাঠ থেকে সোজা শেয়ালদা এসে ঢাকার ট্রেন ধরল তিনজন। দীনেশরঞ্জন, নজরুল আর নৃপেন। সোজা বুদ্ধদেবের বাড়ি। সেইখানে অতিরিক্ত আকর্ষণ, আমি বসে আছি আগে থেকে।
দে গরুর গা ধুইয়ে—মোহনবাগান-মাঠের সেই চীৎকার বুদ্ধদেবের ঘরের মধ্যে ফেটে পড়ল। সঙ্গে-সঙ্গে প্রতিনিনাদ।
সেই সব ছন্নছাড়ারা আজ গেল কোথায়? যারা বলত সমস্বরে–
আমরা সুখের স্ফীত বুকের ছায়ার তলে নাহি চরি
আমরা দুখের বক্র মুখের চক্র দেখে ভয় না করি।
ভগ্ন ঢাকে যথাসাধ্য বাজিয়ে যাব জয়বাদ্য
ছিন্ন আশার ধ্বজা তুলে ভিন্ন করব নীলাকাশ,
হাস্যমুখে অদৃষ্টেরে করব মোরা পরিহাস।
ছিল ভৃগুকুমার গুহ। স্বাস্থ্য নেই স্বাচ্ছন্দ্য নেই, অথচ মধুবর্ষী হাসির প্রস্রবণ। বিমর্ষ হবার অজস্র কারণ থাকলেও যে সদানন্দ। যদি বলতাম, ভৃগু, একটু হাসো তো, অমনি হাসতে সুরু করত। আর সে-হাসি একবার সুরু হলে সহজে থামতে চাইত না। প্রবন্ধ লেখবার ঝকঝকে কলম ছিল হাতে, কিন্তু যা সবচেয়ে বেশি টানত তা তার হৃদয়ের চাকচিক্য। ছিল অনিল ভটচাজ। নিজের কল্পনার কৌশলে যে দুস্থতাকেও শিল্পমণ্ডিত করে তুলেছে! বাঁশি বাজায় আর সিগারেটের ধোঁয়ায় থেকে-থেকে চক্ররচনা করে। মনোঞ্জ-মধুর সঙ্গস্পর্শের সুধা বিলোয়। ছিল সুধীশ ঘটক। যেন কোন স্বপ্নলোকে নিরুদ্দেশের অভিযাত্রী। সব যেন লক্ষ্মীছাড়ার সিংহাসনের যুবরাজ।
যৌবরাজ্যে বসিয়ে দে মা লক্ষ্মীছাড়ার সিংহাসনে
ভাঙা কুলোয় করুক পাখা তোমার যত ভৃত্যগণে।
দগ্ধভালে প্রলয়শিখা দিক না এঁকে তোমার টীকা
পরাও সজ্জা লজ্জাহারা জীর্ণক ছিন্নবাস;
হাস্যমুখে অদৃষ্টেরে করব মোরা পরিহাস।
ভাই অচিন্ত্য, বহুকাল পরে আজ বিকেলে তোমার চিঠি পেলাম! আজ সকালেই তোমাকে এক কার্ড লিখেছি, তবু আবার না লিখে পারলাম না।
প্রগতি নিশ্চয়ই পেয়েছ—আগাগোড়া কেমন লাগল জানিয়ো। তোমার কাছ থেকে প্রগতি যে স্নেহ ও সহায়তা পেল তার তুলনা নেই। এই ব্যাপারে আমরা কত নিঃস্ব ও নিঃসহায়—ভেবে ভেবে এক-এক সময় আশ্চর্য লাগে। লাভের মধ্যে আমাদের নিরবচ্ছিন্ন দুশ্চিন্তা, প্রচুর আর্থিক ক্ষতি ও আরো প্রচুর লোকনিন্দা—একটি লোক নেই যে সত্যিসত্যি আমাদের আদর্শের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন। তবু কেন চালাচ্ছি? আমাদের মধ্যে যে surplus energy আছে, তা এইভাবে একটা outlet খুঁজে নিয়েছে। খেয়ে-পরে-ঘুমিয়ে নিশ্চিন্তচিত্তে জীবনযাত্রা নির্বাহ করতে পারব না, বিধাতা আমাদের এ অভিশাপ দিয়েছেন। তাই একটা কিছু করতে হয়, কোনো একটা নেশায় নিজেদের ডুবিয়ে রাখতে হয়। আমার তো মনে হয় আমাদের জীবনে প্রগতির প্রয়োজন ছিল। যে শক্তি আমাদের ভিতর আছে তার যথোপযুক্ত ব্যবহার না করলেই অন্যায় হত। তবে অর্থসংকটটাই বিশেষ করে পীড়াদায়ক। হাত একেবারে বিক্ত—কি করে চলবে জানিনে। তবু আশা করতে ছাড়িনে। তবু দমে যাই না। কেমন যেন বিশ্বাস জন্মেছে যে প্রগতি চলবেই—যেহেতু চলাটা আমাদের পক্ষে দরকার।
তুমি যদি বিচিত্রায় চাকরি পাও, তাহলে খুবই সুখের কথা। অর্থের দিকটাই সবচেয়ে বিবেচনা করবার। পঞ্চাশ টাকা এমন মন্দই বা কি। তার উপর টিউশনি তো আছেই। তবে বিচিত্রায় একটা anti-আধুনিক feeling আছে, কিন্তু তাতে কতটুকুইবা যাবে আসবে? তোমার ল final কবে? ওটা পাশ করলে পর স্থায়ী ভাবে একটা কিছু কাজ করলেই নিশ্চিন্ত হতে পারো।
তোমার চিঠিটা পড়ে অবধি আমার মন কেমন যেন ভারি হয়ে আছে-কিছু ভালো লাগছে না। শুধু ভাবছি, এও কি করে সম্ভব হয়? তুমি যেসব কথা লিখেছ তা যেন কোনো নিতান্ত conventional বাঙলা উপন্যাসের শেষ পরিচ্ছেদ। জীবনটাও কি এমনি মামুলি ভাবে চলে? আমাদের গুরুজনেরা আমাদের যা বলে উপহাস করেন, তাঁদের সেই সংস্কারাচ্ছন্ন যুক্তিই কি টিকে থাকবে? আমাদের সমস্ত idealism সব স্বপ্নই কি মিথ্যা? দান্তে কি পাগল ছিল? আর শেলি বোকা? পৃথিবীতে কি কোথাও কবিতা নেই? কবিতা যারা লেখে তারা কি এমনি ভিন্ন জাতের লোক যে তারা সবাইকে শুধু ভুলই বুঝবে? কবির চোখে পরমসুন্দরের যে ছায়া পড়েছে আর কেউ কি তা দেখতে পাবে না। পৃথিবীর সব লোকই কি অন্ধ?
