এক দুপুর বেলা অজিত, বুদ্ধদেব আর আমি—আমরা তিনজনে মিলে মুখে-মুখে একটা কবিতা তৈরি করলাম। কবিতাটা ঢাকাকে নিয়ে, নাম ঢাকা-ঢিক্কি বা ঢাকা-ঢক্কা। কবিতার অনুপ্রাস নিয়ে শনিবারের চিঠির বিদ্রুপের প্রত্যুত্তর। অনুপ্রাস কতদূর যেতে পারে তারই একটা চূড়ান্ত উদাহরণ :
ফাগুনের গুণে ‘সেগুনবাগানে’ আগুন বেগুন পোড়ে,
ঠুনকো ঠাটের ‘ঠাঠারিবাজারে’ ঠাঠা ঠেকিয়াছে ঠিক;
ঢাকার ঢেঁকিতে ঢাকের ঢেঁকুর ঢিটিক্কারেতে ঢোঁড়ে,
সং ‘বংশালে’ বংশের শালে বংশে সেঁধেছে শিক।
ভুয়া ‘উয়ারির’ কুয়ার ধুঁয়ায় চুঁয়ায় গুয়ার শুয়া,
বাছা ‘এছাকের’ কাছার কাছেতে কাছিমের কাছি আছে,
‘চকের’ চাকু-চাক্কায় চিকা চকচকি চাখে চুয়া
সাচিবন্দরে মন্দোবীরা বন্দী বান্ধিয়াছে।
পাষণ্ড ঐ ‘মৈনুণ্ডির’ মুণ্ডে গণ্ডগোল,
‘সূত্রাপুরের’ সূত্রধরের পুত্রেরা কাৎরায়,
‘লালবাগে’ লাল ললনার লীলা ললিত-লতিকা-লোল
‘জিন্দাবাহার’ বৃন্দাবনেরে নিন্দিছে সন্ধ্যায়।
‘বক্সীবাজারে’ বাক্সে নক্সা মকশো একশোবার,
রমা রমণীরা ‘রমনায়’ রমে রম্য রম্ভাসম;
‘একরামপুরে’ বিক্রি মাকড়ি লাকড়ি শুক্রবার,
গন্ধে অন্ধ ‘নারিন্দ্যা’ যেন হিন্দু ইন্দুপম।
চর্ম্মে ঘৰ্ম্ম ‘আৰ্ম্মেনিটোলা’ কর্ম্মে বর্ম্মাদেশ,
টাকে-টিকটিকি-টিকি ‘টিকাটুলি’ টিকার টিকিট কাটে,
‘তাঁতিবাজারের’ তোৎল তোতার তিত-তরে পিত্যেশ,
‘গ্যাণ্ডারিয়ার’ ভণ্ড গুণ্ডা চণ্ড চণ্ডূ চাটে।
ঢাকায় দুজন পৃষ্ঠপোষক পাওয়া গেল। এক পরিমলকুমার ঘোষ, প্রোফেসর; দুই ফণীভূষণ চক্রবর্তী, বর্তমানে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি। জ্ঞানী গুণীদের মধ্যে থেকে কেউ-কেউ আছেন আমাদের স্বপক্ষে, সেইটেই তখন প্রকাণ্ড উপার্জন।
একদিন দুপুরে আকাশ-কালোকরা প্রচণ্ড বৃষ্টি নামল। স্নান করে উঠে ঠিক খাবার সময়টায়। দাঁড়াও, আগে বৃষ্টি দেখি, পরে খাওয়া যাবে। কিন্তু সাধ্য নেই সর্বভঞ্জন সেই প্রভঞ্জনের সামনে জানলা খোলা যায়। ঘরে লণ্ঠন জ্বেলে দুজনে-বুদ্ধদেব আর আমি–ভাত খেলাম। অদ্ভুত অবিস্মরণীয় পরিবেশে। হাওয়া যখন পড়ল তখন জানলা খুলে চেয়ে দেখি, সর্বনাশ। অন্ধের নড়ি, আমার একমাত্র ফাউণ্টেন পেনটি টেবিল থেকে পড়ে ভেঙে গিয়েছে।
এর পর আর ঢাকায় থাকার কোনো মানে হয় না।
বুদ্ধদেবের কটা চিঠির টুকরো :
আপনি যদি ওর সঙ্গে চিঠি লেখালেখি শুরু করেন তা হলে খুব ভেবে-চিন্তে সুন্দর করে লিখবেন কিন্তু। কারণ এইসব চিঠি যে ভবিষ্যতে বাঙলা দেশের কোনো অভিজাত পত্রিকা-বিশেষ গৌরবের সহিত ছাপবে না এমন কথা জোর করে বলা যায় না। কিন্তু মেয়েটি আপনার হাতের লেখা পড়তে পারবে কিনা সে বিষয়ে আমার সন্দেহ আছে। আমি অন্ততঃ আপনাকে এইটুকু অনুরোধ করতে বাধ্য হচ্ছি যে আমাকে চিঠি লেখবার সময় কলমে যেন বেশি করে কালি ভরে নেন এবং অক্ষরগুলোকে ইচ্ছে করে অত ক্ষুদে-ক্ষুদে না করেন। কারণ আমরা ডাক পাই গোধূলিলগ্নে। তখন ঘরেও আলো জ্বলে না, আকাশের আলোও ম্লান হয়ে আসে। কাজেই আপনার চিঠি পড়তে রীতিমত কষ্ট হয়।
অচিন্ত্যবাবু, আষাঢ় মাস থেকে আমরা প্রগতি ছেপে বার করচি। মস্ত দুঃসাহসের কাজ, না? হঠাৎ সব ঠিক হয়ে গেল। এখন আর ফেরা যায় না। একবার ভালো করেই চেষ্টা করে দেখি না কি হয়। প্রেমেনবাবুকে এ খবর দেবেন।
‘আষাঢ়’ মানে তেরোশ তেত্রিশের আষাঢ় আর ‘ছেপে’ মানে এর আগে ‘প্রগতি’ হাতে-লেখা মাসিক পত্রিকা ছিল।
আপনি দুঃখ ও নৈরাশ্যের ভেতর দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন ভেবে আমার সত্যি-সত্যি মন খারাপ লাগে। কি হয়েছে? কেন? এ সব প্রশ্ন করা সত্যি অসঙ্গত—অন্তত চিঠিতে। কিন্তু আপনার দুঃখের কারণ কি তা জানতে সত্যি ইচ্ছে করে—অলস কৌতূহলবশত নয় কেবল—আপনাকে বন্ধু বলে হৃদয়ে গ্রহণ করেছি, তাই। আপনার প্রতি সুখদুঃখের সঙ্গে আমি নিজেকেও ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট বিবেচনা করি। আপনি কি ঢাকায় আসবেন? আসুন না। আমার যতদূর বিশ্বাস ঢাকা আপনার ভালো লাগবে-পল্টনের এই খোল। মাঠের মধ্যেই একটা মস্ত শান্তি আছে। আপনি এলে আমাদের যে অনেকটা ভালো লাগবে তা তো জানেনই।
প্রগতি আগামী বছর চলবে কিনা এখনো ঠিক করিনি। সাধ তো আকাশের মত প্রকাণ্ড, কিন্তু পুঁজিতে যে কুলোয় না। এ পর্যন্ত এর পেছনে নিজেদের যত টাকা ঢালতে হয়েছে তার হিসেব করলে মন খারাপ হয়ে যায়। এ ভাবে পুনোপুরি লোকসান দিয়ে আর এক বছর চালানো সম্ভব নয়। এখনো অবিশ্যি একেবারে হাল ছেড়ে দিইনি। গ্রীষ্মের ছুটি হওয়ামাত্র একবার বিজ্ঞাপন-সংগ্রহের চেষ্টায় কলকাতায় যাব। যদি কিছু পাওয়া যায় তাহলে প্রগতি চলবে। যথাসাধ্য চেষ্টার ফলেও যদি কিছু না হয়, তাহলে আর কি করা? আপনি আর প্রেমেনবাবু মিলে একটা নতুন উপন্যাস যদি লেখেন তা হলে তা দ্বিতীয় বর্ষের আষাঢ় থেকে আরম্ভ করা যায়।
আপনি কবে কলকাতা থেকে বেরোবেন? ঢাকায় কি আসবেন না একবার? শীত প্রায় কেটে গিয়েছে—আর কয়েকদিন পরেই পল্টনের বিস্তৃত মাঠ অতিক্রম করে হু-হু করে জোয়ারের জলের মত দক্ষিণা বাতাস এসে আমার ঘরে উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়বে—যে বাতাস গত বছর আপনাকে মুগ্ধ করেছিল, যে বাতাস আপনার কলম ভেঙেছিল। এবারো কি একবার আসবেন না? যখন ইচ্ছে। You are ever welcome here.
প্রগতিকে টিকিয়ে রাখা সত্যিই বোধ হয় যাবে না। তবু একেবারে আশা ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করে না—কুসংস্কারগ্রস্ত মনের মত miracleএ বিশ্বাস করবার দিকে ঝুঁকে পড়ছি। প্রগতি উঠে গেলে আমার জীবনে যে vacuum আসবে তা আর কিছু দিয়েই পূর্ণ করবার মত নয়—সেই হিসেবেই সব চেয়ে খারাপ লাগছে। কালিকলম কি আর এক বছর চলবে?
