টাকা থাকলেই বড়লোক হওয়া যায় বটে, কিন্তু বড় মানুষ হওয়া যায় না। বড় মানুষের বাড়ির একটা লক্ষণ হচ্ছে এই যে, সব ঘরেই আলো থাকে। কল্লোল সেই বড় মানুষের বাড়ি। তার সব ঘর আলো করা।
তবু সেদিন কল্লোল ভেঙে কালি-কলমের সৃষ্টিতে নৃপেনের বিক্ষোভের বোধহয় অন্ত ছিল না। সে ধরল গিয়ে শৈলজাকে, মুখোমুখি প্রচণ্ড ঝগড়া করলে তার সঙ্গে। এমন কি তাকে বিশ্বাসহন্তা পর্যন্ত বললে। শৈলজা বিন্দুমাত্র চঞ্চল হল না। তার স্বাভাবিক সস্মিত গাম্ভীর্য বজায় রেখে বললে, ব্যস্ত নেই, তোকেও আসতে হবে।
বস্তুত কল্লোল-কালিকলমের মানে কোনো দলাদলি বা বিরোধ-বিপক্ষতা ছিল না। যে কল্লোলে লেখে সে কালি-কলমেও লেখে আর যে কালি-কলমের লেখক সে কল্লোলেরও লেখক। যেমন জগদীশ গুপ্ত, নজরুল, প্রবোধ, জীবনানন্দ, হেম বাগচি। প্রেমেন ফের কল্লোলে গল্প লিখল, আমিও কালি-কলমে কবিতা লিখলাম। কোথাও ভেদ-বিচ্ছেদ রইল না, পাশাপাশি চলবার পথ মসৃণ হয়ে গেল। বরং বাড়ল আর একটা আড্ডার জায়গা। কল্লোল আর কালি-কলম একই মুক্ত বিহঙ্গের দুই দীপ্ত পাখা।
কিন্তু নৃপেন প্রতিজ্ঞাভ্রষ্ট হয় নি। কালি-কলমে লেখা তে। দেয়ইনি, বোধহয় কোনদিন যায়ওনি তার আপিসে-আড্ডায়।
মনটা বুদ্ধদেবের দিকে ঝুঁকে পড়ল। এবং তেরোশ তেত্রিশের এক চৈত্রের রাতে ঢাকা রওনা হলাম।
ক্ষিতীন সাহা বুদ্ধদেবের বন্ধু, কলকাতায় মেসে থেকে পড়ে, বাড়ি ঢাকায়। হঠাৎ তার কঠিন অসুখ হয়ে পড়ল, ঢাকায় বাপ-মার কাছে যাবার দরকার। পথে একজন সঙ্গী চাই। আমি বললাম, আমি যাব।
তার আগে পূজোর ছুটিতে বুদ্ধদেব চিঠি লিখেছিল: আপনি ও নেপেনদা এ ছুটিতে কিন্তু একবার ঢাকায় আসবেনই। আপনাদের দুজনকে আমি প্রগতি-সমিতির পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ পাঠাচ্ছি। যদিও পাথেয় পাঠাতে আমরা বর্তমান অবস্থায় অক্ষম, তবে এখানে এলে আতিথেয়তার ত্রুটি হবে না। আপনার পকেট আশু রৌপ্য-গর্ভ হয়ে উঠুক।..এ নিমন্ত্রণ আমাদের সবাকার,-আমার একার নয়। আমাদের। সম্মিলিত সম্ভাষণ ও আমার ব্যক্তিগত অনুরাগ জ্ঞাপন করি।
ক্ষিতীনকে তার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে সাতচল্লিশ নম্বর পুরানা পল্টনে এসে পৌঁছুলাম। বুদ্ধদেবের বাড়ি। বুদ্ধদেব তো আকাশ থেকে পড়ল! না, কি, উঠে এল আকাশে! এ কী অবাক
কাণ্ড!
আমাকে দেখে একজন বিস্মিত হবে আর তার বিস্ময়টুকু আমি উপভোগ করব এও একটা বিস্ময়!
আরে, কী ভয়ানক কথা, আপনি?
হ্যাঁ, আর ঢাকা থাকা গেল না—চলে এলাম।
খুশিতে উছলে উঠল বুদ্ধদেব। উঠলেন কোথায়?
আর কোথায়!
দাঁড়ান, টুনুকে খবর পাঠাই, পরিমলকে ডাকি।
সাধারণ একখানা টিনের ঘর, বেঁড়া দিয়ে ভাগ করা। প্রান্তের ঘরটা বুদ্ধদেবের। সেই ঘরেই অধিষ্ঠিত হলাম। পাশালো একটা তক্তপোষ আর ন্যাড়া-ন্যাড়া কাঠের দু-একটা টেবিল-চেয়ার সমস্ত ঘরের সম্পদ, আর বইভরা কাঠের একটা আলমারি। দক্ষিণে ফাঁকা মাঠ, উধাও-ধাওয়া অফুরন্ত হওয়া। একদিকে যেমন উদ্দাম উন্মুক্তি, অন্যদিকে তেমনি কঠোরব্রত কৃচ্ছতা। একদিকে যেমন খামখেয়ালের এলোমেলোমি, অন্যদিকে তেমনি আবার কর্মোদযাপনের সংকল্পস্থৈর্য। আড্ডা হল্লা, তেমনি আবার পরীক্ষার পড়া-তেমনি আবার সাহিত্যের শুশ্রূষা। সমস্ত কিছু মিলে একটা বর্ধন-বিস্তারের উদ্যতি।
প্রায় দিন পনেরো ছিলাম সে-যাত্রায়। প্রচুর সিগারেট,–সামনের মুদিদোকানে এক সিগারেটের বাবদই একা বুদ্ধদেবের তখন ষাট-সত্তর টাকা দেনা—আর অঢেল চা—সব সময়ে বাড়িতে নয়, চায়ের দোকানে, যে কোনো সময়ে যে কোনো চায়ের দোকানে। আর সকালে-সন্ধ্যায় টহল, পায়ে হেঁটে কখনো বা ঢাকার নামকরা পংখীরাজ ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে। সঙ্গে টুনু বা অজিত দত্ত, পরিমল রায় আর অমলেন্দু বসু। আর গল্প আর কবিতা, ছড়া আর উচ্চ হাসির তারকার। শুধু পরিমলের হাসিটাই একটু শ্লেষাশ্লিষ্ট। সেই সঙ্গে কথায়-কথায় তার ছড়ার চমক স্ফূর্তিকে আরো ধারালো করে তুলত। গেলে পাঞ্জাবে, জেলে জান যাবে কিংবা দেশ হয়েছে স্বাধীন, তিন পেয়ালা চা দিন,—সেই সব ছড়ার দু-একটা এখনো মনে আছে। ক্রমে-ক্রমে দলে সামিল হল এসে যুবনাশ্ব বা মণীশ ঘটক, তার ভাই সুধীশ ঘটক, আর অনিল ভট্টাচার্য, ছবির জগতের আলফাবিটা—আর সর্বোপরি ভৃণ্ড। নবরত্বের সভা গুলজার হয়ে উঠল। মনে হল যেন বোহিমিয়ায় এসে বাস নিয়েছি।
বলা বাহুল্য নিভৃততম ছিল বুদ্ধদেব। মুক্ত উঠোনে পিঁড়িতে বসে একসঙ্গে স্নান, পাশাপাশি আসনে বসে নিত্য ভুরিভোজ নিত্যকালের জিনিস হয়ে রয়েছে। সমস্ত অনিয়ম ক্ষমা করে বুদ্ধদেবের মার (অতি শৈশবে মাতৃবিয়োগ হবার পর দিদিমাকেই বুদ্ধদেব মা বলত) যে একটি অনিমেষ স্নেহ ছিল চারপাশে, তারই নীরব স্পর্শ আমাদের নৈকট্যকে আরো যেন নিবিড় করে তুলল। একটা বিরাট মশারির তলায় দুজনে শুতাম একই তক্তপোষে। কোনো কোনো দিন গল্প করে কাব্যালোচনা করে সারারাত না ঘুমিয়েই কাটিয়ে দিতাম। কোন কোনো রাতে অজিত এসে জুটত, সঙ্গে অনিল কিংবা ভৃগু। তাস খেলেই রাত ভোর করে দেওয়া হত। বুদ্ধদেব তাস খেলত না, সমস্ত হল্লা-হাসি উপেক্ষা করে পড়ে-পড়ে ঘুমুত এক পাশে।
সে সব দিনে মশারি টাঙানো হত না। লণ্ঠনের আলোতে বসে সুদীর্ঘ রাত্রি তাসখেলা—এক পয়সা যেখানে স্টেক নেই—কিংবা দুই বা ততোধিক বন্ধু মিলে শুদ্ধ কাব্যালোচনা করে রাত পোহান—সেটা যে কি প্রাণনায় সেদিন সম্ভব হত আজকের হিসেবে তা অনির্ণেয়। যে-যেদিন মশারি ফেলা হত সে-সেদিনও তাকে বাগ মানিয়ে রাখা সাধ্য ছিল না। শেষরাত্রির দিকেই বাতাস উঠত-সে কি উত্তাল উদ্দাম বাতাস—আর আমাদের মশারি উড়িয়ে নিয়ে যেত। সবুজ ভোরের আলোয় চোখ চেয়ে মনে হত দুইজনে যেন কোন পাল-তোলা ময়ূরপঙ্খীতে চড়ে কোন নির্জন নদীতে পাড়ি দিয়েছি।
