আমাদের রাজকন্যাকে, দুঃখের বিষয়, সনাক্ত করবার কোনো উপায় নেই। কোনদিন সে আসবে কিনা তাই জানিনা, আর এসেও কখন অসাবধানতায় ফসকে যায় এই ভয়ে আমরা সারা। তাই আমরা প্রথম অগ্রদূতীকেই ধরে বলি অনেক সময়, বর ফিরিয়ে নাও ভগবান। ভগবানকে আমরা যতটা সজাগ ও সদয় মনে করি, তিনি বোধহয় ততটা নন কারণ তিনি মাঝে-মাঝে বলেন তথাস্তু। আর আমাদের সত্যিকারের রাজকন্যা হয়ত একদিন আসে, যদিও মাঝে মাঝে অগ্রদূতীর ছদ্মবেশ খুলে আসল রাজকন্যা বেরিয়ে পড়ে। মাঝে মাঝে কিন্তু তিনি বর ফিরিয়ে নেন না, এবং অনেক সমব সদয় হয়েই। তোর জীবনে ভগবান এবার তথাস্তু বলেন না কেন কে জানে। যে প্রেমের নীড় মানুষ অটুট করে রচনা করে তার মাঝে থাকে সমস্ত অগ্রদূতীর প্রেমের ছায়া।
কল্লোলের এমন অবস্থা নয় যে লেখকদের পয়সা দিতে পারে। শুধু শৈলজা আর নৃপেনকেই পাঁচ-দশ টাকা করে দেওয়া হত, ওদের অনটনটা কষ্টকর ছিল বলে। আর সবাই লবডঙ্কা। আমরা শুধু মাটি পাট করছি। হাঁড়ি গড়তে হবে, ঢিল-বালি সব বের করে দিচ্ছি। সাধু গাঁজা তৈরি করছে, তার সাজতে-সাজতেই আনন্দ। আমাদেরও প্রায় তেমনি। লেখবার বিস্তৃত ক্ষেত্র পেয়েছি এতেই আমাদের স্ফূর্তি। ঢালছি আর সাজছি, দম যখন জমবে তখন দেখা যাবে। চকমকির পাথর যদি কারু থাকে তবে ঘা মারলে আগুন বেরুবেই।
তবু একেক দিন দীনেশদা হঠাৎ গলা জড়িয়ে ধরে পাশে বসে পড়তেন। শূন্য বুক-পকেটে একটি টাকা টুপ করে কখন খসে পড়ত। এ টাকাটা দানও নয়, উপার্জনও নয়, শুধু স্বপ্নে কুড়িয়ে-পাওয়া একটি অভাবিত মেহম্পর্শের মত—এমনি অনুভব করতাম। নিশ্চিন্ত হতাম, আরো দিন চারেক আড্ডা চালাবার জন্যে ট্রাম চলবে।
কিন্তু প্রেমেন শৈলজার অর্থের প্রয়োজন তখন অত্যন্ত। তাই তারা ঠিক করলে আলাদা একটা কাগজ বের করবে। সেই কাগজে ব্যবস্থা করবে অশনাচ্ছাদনের। সঙ্গে সুমন্ত্র মুরলীধর বসু। তন্ত্রধারক বরদা এজেন্সির শিশির নিয়োগী।
বেরুল কালি-কলম—তেরশ তেত্রিশের বৈশাখে। দুটো বিশেষত্ব প্রথমেই চোখে পড়ল। এক, সাধাসিধে ঝকঝকে নাম; দুই, একই কাগজের তিনজন সম্পাদক-শৈলজা প্রেমেন আর মুরলীদা। আর প্রথম সংখ্যায় সব চেয়ে উল্লেখযোগ্য রচনা মোহিতলালের নাগার্জন।
তুরিতে উঠিয়া গেনু মন্ত্রবলে স্মরণের আলোক-তোরণে,
—প্রবেশি অকম্পিত নিঃশঙ্ক চরণে।
অমর মিথুন যত মূরছিল মহাভয়ে–শ্লথ হল প্রিয়া আলিঙ্গন।
কহিলাম, ওগো দেব, ওগো দেবীগণ,
আমি সিদ্ধ নাগার্জুন, জীবনের বীণাযন্ত্রে সকল মূর্চ্ছনা
হানিয়াছি, এবে তাই আসিয়াছি করিতে অর্চ্চনা
তোমাদের রতিরাগ; দাও মোরে দাও ত্বরা করি
কামদুঘা সুরভির দুগ্ধধারা এই মোর করপাত্র ভরি!
—মানব-অধর-সীধু যে রসনা করিয়াছে পান
অমৃত পায়স তার মনে হল ক্ষার-কটু প্রলেহ সমান।
জগৎ-ঈশ্বরে ডাকি কহিলাম, ওগো ভগবান!
কি করিব হেথা আমি? তুমি থাক তোমার ভবনে,
আমি যাই; যদি কভু বসিতাম তব সিংহাসনে,
সকল ঐশ্বৰ্য্য মোর লীলাইয়া নিতাম খেলায়ে–
বাঁকায়ে বিদুৎ-ধনু, নভোনাভি পূর্ব্বমুখে হেলায়ে হেলায়ে
গড়িতাম ইচ্ছাসুখে নব-নব লোক লোকান্তর।
তবু আমি চাহি না সে, তব রাজ্যে থাক তুমি চির একেশ্বর।
মোর ক্ষুধা মিটিয়াছে; শশী-সূৰ্য্য তোমার কন্দুক?
আমারও খেলনা আছে—প্রেয়সীর সুচারু চুচুক!
স্তোত্র-স্তুতি ভাগ্য তব, তবু কহ শুধাই তোমারে–
কভু কি বেসেছ ভালো মুদিতাক্ষী যশোধারা,
মদিরাক্ষী বসন্তসেনারে?
এ-কবিতায় অবশ্য কোনোই দোষ পায়নি শনিবারের চিঠি কারণ মোহিতলাল যে নিজেই ঐ দলের মণ্ডল ছিলেন। শুনেছি কৃত্তিবাস ওঝা নাকি ওঁরই ছদ্মনাম! শনিবারের চিঠিতে সরস-সতী নাম দিয়ে সরস্বতী-বন্দনাটি বিচিত্র।
সারাটা জাতের শিরদাঁড়াটায় ধরেছে ঘুণ–
মার জঠরেও কাম-যাতনায় জ্বলিছে ভ্রূণ।
শুকদেব যথা করেছিল বেদ-অধ্যয়ন–
গর্তে বসেই শেষ করে তারা বাৎস্যায়ন!
বুলি না ফুটিতে চুরি করে চায়—মোহন ঠাম!
ভাষা না শিখিতে লেখে কামায়ন–কামের সাম।
জ্ঞান হলে পরে মায়েরে দেখে যে বারাঙ্গনা!
তার পরে চায় সারা দেশময় অসতীপণা।
এদেরি পূজোয় ধরা দিয়েছ যে সরস্বতী,
চিনি নে তোমায়, কোন বলে তুমি আছিলে, সতী?
দেখি তুমি শুধু নাচিয়া বেঁড়াও হাঁস-পা-তালে,–
অঙ্গে ধবল, কুষ্ঠও বুঝি ওষ্ঠে-গালে!
কালি-কলম বেরুবার পর বাইরে থেকে দেখতে গেলে, কল্লোলের সংহতিতে যেন চিড় খেল। প্রথমটা লেগেছিল তাই প্রায় প্রিয়বিচ্ছেদের মত। একটু ভুল-বোঝার ভেলকিও যে না ছিল তা নয়। কেউ কেউ এমন মনে করেছিল যে কল্লোলের রীতিমত লাভ হচ্ছে, দীনেশদা ইচ্ছে করেই মুনফার ভাগ-বাটোয়ারা করছেন না। এ সন্দেহে যে বিন্দুমাত্র ভিত্তি নেই, তার কারণ কালি-কলম নিজেও ব্যবসার ক্ষেত্রে ফেল মারল। এক বছর পরেই প্রেমেন সটকান দিলে, দু বছর পরে শৈলজা। মুরলীদা আরো বছর তিনেক এক পায়ে দাঁড়িয়ে চালিয়েছিলেন বটে কিন্তু মুরলীধ্বনিও মীণতর হতে-হতে বন্ধ হয়ে গেল। সঙ্গে বরদা থাকলেও ভাগ্যে বরদাত্রী জোটে না সব সময়।
সুতরাং প্রমাণ হয়ে গেল, সত্যিকার সিরিয়স পত্রিকা চালিয়ে তা থেকে জীবিকানির্বাহ করা সাধ্যাতীত। বেশির ভাগ পাঠকের চোখ ঢাউসগুলোর দিকে, নয়তো খিস্তি-খেউড়ের দিকে। কল্লোল তো শেষের দিকে সুর বেশ খাদে নামিয়ে আনবার চেষ্টা করেছিল, জনরঞ্জনের প্রলোভনে। কিন্তু তাতে ফল হয় না! অবশিষ্ট ভক্তরাও রুষ্ট হয় আর নিষ্কলঙ্ক ধর্ম থেকে বিচ্যুতি ঘটে। কল্লোল তাই কল্লোলের মতই মরেছে। ও যে পাতকো হয়ে বেঁচে থাকেনি ওটাই ওর কীতি।
