রসিকতাটা বুঝতে পেরেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাই সরাসরি খারিজ করে দিলেন আর্জি। লিখলেন :
কল্যাণীয়েষু
কঠিন আঘাতে একটা আঙুল সম্প্রতি পঙ্গু হওয়াতে লেখা সহজে সরছে না। ফলে বাকসংযম স্বতঃসিদ্ধ।
আধুনিক সাহিত্য আমার চোখে পড়ে না। দৈবাৎ কখনো যেটুকু দেখি, দেখতে পাই, হঠাৎ কলমের আব্রু ঘুচে গেছে। আমি সেটাকে সুশ্রী বলি এমন ভুল করো না। কেন করিনে তার সাহিত্যিক কারণ আছে, নৈতিক কারণ এস্থলে গ্রাহ্য না হতেও পারে। আলোচনা করতে হলে সাহিত্য ও আর্টের মূলতত্ত্ব নিয়ে পড়তে হবে। এখন মনটা ক্লান্ত, উদ্ভ্রান্ত, পাপগ্রহের বক্র দৃষ্টির প্রভাব প্রবল—তাই এখন বাগবাত্যার ধূলো দিগদিগন্তে ছড়াবার সখ একটুও নেই। সুসময় যদি আসে তখন আমার যা বলবার বলব। ইতি ২৫শে ফাল্গুন, ১৩৩৩।
শুভাকাঙ্ক্ষী
শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
একদিন রবীন্দ্রনাথের নষ্টনীড় আর ঘরে বাইরে নিয়েও এমনি রোষপ্রকাশ হয়েছিল, উঠেছিল দুরিত-দুর্নীতির অভিযোগ। ‘পারিবারিক সম্পর্ক’কে অসম্মান করার আর্তনাদ। সে যুগের সজনীকান্ত ছিলেন সুরেশচন্দ্র সমাজপতি। কিন্তু এ যুগের সজনীকান্ত নষ্টনীড় আর ঘরে বাইরে সম্বন্ধে দিব্যি সার্টিফিকেট দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথকে। ঐ চিঠিতেই তিনি লিখেছেন : ঠিক যতটুকু পর্যন্ত যাওয়া প্রয়োজন, ততটুকুর বেশী আপনি কখনও যাননি। অথচ যে সব জিনিষ নিয়ে আপনি আলোচনা করেছেন সেই সব জিনিষই আধুনিক এই লেখকদের হাতে পড়লে কি রূপ ধারণ করত ভাবলে শিউরে উঠতে হয়। একরাত্রি, নষ্টনীড় ও ঘরে বাইরে এরা লিখলে কি ঘটত—ভাবতে সাহস হয়না। যুগে যুগে সজনীকান্তদের এই একই রকম প্রতিক্রিয়া, একই রকম কাণ্ডজ্ঞান। আসন্ন যুগের সজনীকান্তরা এরি মধ্যে হয়তো চিঠি লিখছেন বুদ্ধদেবকে আর নজরুল ইসলামকে-ঠিক যতটুকু পর্যন্ত যাওয়া প্রয়োজন ততটুকুর বেণী আপনারা কখনো যাননি। অথচ যে সব জিনিস নিয়ে আপনারা আলোচনা করেছেন সেই সব জিনিসই আধুনিক লেখকদের হাতে পড়লে কি রূপ ধারণ করত ভাবলে শিউরে উঠতে হয়। বন্দীর বন্দনা মাধবী প্রলাপ ও অনামিকা এরা লিখলে কি ঘটত ভাবতে সাহস হয় না।
সেই এক ভাষা। একই ‘প্রচলিত রীতি’।
১৭. সাতচল্লিশ নম্বর পুরানা পল্টন
সাহিত্য তো হচ্ছে কিন্তু জীবিকার কি হবে? আর্ট হয়তো প্রেমের চেয়েও বড়, কিন্তু সবার চেয়ে বড় হচ্ছে ক্ষুধা। এই সাহিত্যে কি উল্পের সংস্থান হবে?
আমি আর্টকে প্রিয়ার চেয়েও ভালবাসি—এই কথাটি আজ কদিন ধরে আমার মনে আঘাত দিচ্ছে। আমাকে লেখা প্রেমেনের আরেকটা চিঠি: মনে হচ্ছে আমি সুবিধার খাতিরে প্রিয়াকে ছোট করতে পারি, কিন্তু আর্ট নিয়ে খেলা করতে পারি না। আমার প্রিয়ার চেয়েও আর্ট বড়। আমি যাকে তাকে বিয়ে করতে পারি কিন্তু আর্টকে শুধু নামের বা অর্থের প্রলোভনে হীন করতে পারি না—অন্তত এখন তাই মনে। হচ্ছে। সেই আদিম যুগে উলঙ্গ অসভ্য মানুষ সৃষ্টি করবার যে প্রবল অন্ধ প্রেরণায় নারীকে লাভ করবার জন্যে প্রতিদ্বন্দ্বী পুরুষের সঙ্গে যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছে সেই প্রেরণাই আজ রূপান্তরিত হয়ে আর্টিষ্টের মনকে দোলা দিচ্ছে। এই দোলার ভেতর আমি দেখতে পাচ্ছি গ্রহতারার দুর্বার অগ্নিনৃত্যবেগ, সূর্যের বিপুল বহ্নিজালা, বিধাতার অনাদি অনন্ত কামনা সৃষ্টি, সৃষ্টি—আজ আর্টিষ্টের সৃষ্টি শুধু নারীর ভেতর দিয়ে সৃষ্টির চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে বলেই প্রিয়ার চেয়ে আর্ট বড়। সৃষ্টির ক্ষুধা সমস্ত নিখিলের অণুপরমাণুতে, প্রতি প্রাণীর কোষে কোষে। সেই সৃষ্টির লীলা মানুষ অনেক রকমে করে এসে আজ এক নতুন অপরূপ পথ। পেয়েছে। এ পথ শুধু মানুষের—বিধাতার মনের কথাটি বোধ হয় মানুষ এই পথ দিয়ে সব চেয়ে ভালো করে বলতে পারবে; সৃজনকামনার চরম ও পরম পরিতৃপ্তি সে এই পথেই আশা করে। অন্তত এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে এই আর্ট সেই আদিম অনাদি সৃষ্টি-ক্ষুধার রূপান্তরিত বিকাশ।
এতক্ষণ এত কথা বলে হয়ত কথাটাকে জটিল করে ফেললুম, হয়ত কথাটার একদিক বেশি স্পষ্ট করতে গিয়ে আর একদিক সম্বন্ধে তুল ধারণা করবার সুযোগ দিলুম।
নারীর মধ্যে প্রিয়াকে চাই এবং প্রিয়ার মধ্যে প্রেমকে চাই। যার কাছে ভালবাসার প্রতিদান পাব তারি মাঝে এ পর্যন্ত যত নারীকে। ভালবেসেছি ও পেয়েছি ও হারিয়েছি বা ভালবেসেছি ও পাইনি সকলে নতুন করে বাঁচবে—এই আমার মত। জানি এ মত অনেকের কাছে বিতৃষ্ণাময় লাগবে, এমত অনেকের কাছে হৃদয়হীনতার পরিচায়কও লাগবে হয়ত। কিন্তু হৃদয়হীন হতে রাজী নই বলেই এই আপাতহৃদয়হীন মত আমি নিজে পোষণ করি। প্রেম খুঁজতে গিয়ে প্রিয়ার নারীত্ব আমাকে আঘাত দিয়েছে বলে আমি নারীর মধ্যে প্রেম পাবার আশা ত্যাগ করব না। নিজের কথাই বলছি তোর কথা বলতে গিয়ে।
আমার এখন দৃঢ় ধারণা হযেছে ছেলেবেলা থেকে একটা রূপকথা শুনে আসছি—সে রূপকথা যেমন অসত্য তেমনি সুন্দর। রূপকথাটাকে আমরা কিন্তু তাই রূপকথা ভাবি না, ভাবি সেটা সত্য। মানুষের প্রেম সত্যি করে একবার মাত্র জাগে এই কথাটাই রূপকথা। প্রেম অমর এটা সত্য হতে পারে কিন্তু অমর প্রেম লাভ করবার আগে প্রেমের অনেক আশ্বাস ও আভাস আসে যাকে আমরা তাই বলে ভুল করি।
এক গরীব চাষা অনেক তপস্যা করে এক দেশের এক রাজকন্যাকে পাবার বর পেয়েছিল। কিন্তু রাজকন্যা আসবার সময় প্রথম যে দাসী এল খবর দিতে, সে তাকেই ধরে রেখে দিলে। সে যখন জানলে সে রাজকন্যা নয়, তখন সে ভগবানকে ডেকে বললে, তোমার বর ফিরিয়ে নাও, আমার দাসীই ভাল। তারপর যখন সত্যিকারের রাজকন্যা এল তখন কী অবস্থাটা হল বুঝতেই পারিস।
