বিধাতা, জানোনা তুমি কী অপার পিপাসা আমার
অমৃতের তরে।
না হয় ডুবিয়া আছি কৃমি-ঘন পঙ্কের সাগরে
গোপন অন্তর মম নিরন্তর সুধার তৃষ্ণায়
শুষ্ক হয়ে আছে তবু।
না হয় রেখেছ বেঁধে; তবু, জেনো, শৃঙ্খলিত ক্ষুদ্র হন্ত মোর
উধাও আগ্রহভরে উর্দ্ধ নভে উঠিবারে চায়
অসীমের নীলিমারে জড়াইতে ব্যর্থ আলিঙ্গনে।…
তুমি মোরে দিয়েছ কামনা, অন্ধকার অমা-রাত্রি সম
তাহে আমি গড়িয়াছি প্রেম, মিলাইয়া স্বপ্ননুধা মম।…
তুমি যারে সৃজিয়াছ, ওগগা শিল্পী, সে তো নহি আমি
সে তোমার দুঃস্বপ্ন দারুণ,
বিশ্বের মাধুর্য-রস তিলে-তিলে করিয়া চয়ন
আমারে রচেছি আমি; তুমি কোথা ছিলে অচেতন
সে মহা-সৃজনকালে—তুমি শুধু জান সেই কথা।
এত সব ভীষণ দুষ্কাণ্ড, এর প্রতিকার কি? সাহিত্য কি ছারেখারে যাবে, সমাজ কি যাবে রসাতলে? দেশের ক্ষাত্রশক্তি কি তিতিক্ষার ব্রত নিয়েছে? কখনো না। সুপ্ত দেশকে জাগাতে হবে, ডাকতে হবে প্রতিঘাতের নিমন্ত্রণে। সরাসরি মার দেওয়ার প্রথা তখনো প্রচলিত হয়নি—আর, দেখতেই পাচ্ছ, কলম এদের এত নির্বীর্য নয় যে মারের ভয়ে নির্বাক হয়ে যাবে। তবে উপায়? গালাগাল দিয়ে ভূত ভাগাই এস। সে-পথ তো অনাদি কাল থেকেই প্রশস্ত, তার জন্যে ব্যস্ত কি। একটু কূটনীতি অবলম্বন করা যাক। কি বলো? মুখে মোটা করে মুখোস টানা যাক—পুলিশ-কনস্টেবলের মুখোস। ভাবখানা এমন করা যাক যেন সমাজস্বাস্থ্যরক্ষার ভার নিয়েছি। এমনিতে ঘেউ-ঘেউ করলে লোকে বিরক্ত হবে, কিন্তু যদি বলা যায়, পাহারা দিচ্ছি, চোর তাড়াচ্ছি, তা হলেই মাথায় করবে দেখো। ধর্মধ্বজের ভান করতে পারলেই কর্ম ফতে। কর্মটা কী জানতে চাও? নিশ্চয়ই এই আত্ম-আরোপিত দায়বহন নয়। কর্মটা হচ্ছে, যে করেই হোক, পাদপ্রদীপের সামনে আসা। আর এই পাদপ্রদীপ থেকেই শিরঃসূর্যের দিকে অভিযান।
আসলে, আমিও একজন অতি-আধুনিক, শৃঙ্খলমুক্ত নবযৌবনের পূজারী। আমার হচ্ছে কংসরূপে কৃষ্ণপূজা, রাবণ হয়ে রামারাধনা। নিন্দিত করে বন্দিত করছি ওদের। ওরা সৃষ্টিযোগে, আমি রিষ্টিযোগে। ওদের মন্ত্র, আমার তন্ত্র। আমাদের পথ আলাদা কিন্তু গন্তব্যস্থল এক। শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন, মন্ত্র ঢেকে সদর দরজা দিয়ে আর তন্ত্র ঢেকে পায়খানার ভেতর দিয়ে। আমার পৌঁছুনো নিয়ে কথা, পথ নিয়ে নয়।
সুতরাং গুরুবন্দনা করে শুরু করা যাক। গুরু যদি কোল দেন তো ভালো, নইলে তাঁকেও ঘোল খাইয়ে ছাড়ব। ঘোল খাইয়ে কোল আদায় করে নেব ঠিক।
তেরোশ তেত্রিশ সালের ফাল্গুনে শনিবারের চিঠির সজনীকান্ত দাস রবীন্দ্রনাথের কাছে আর্জি পেশ করলেন। যেন তিনি কত বড় অধিকারী, সমাজের পক্ষ থেকে কত বড় ভার দেওয়া হয়েছে তাঁকে–এই মামলায় এইটুকুই আসল রসিকতা।
শ্রীচরণকমলেষু
প্রণামনিবেদনমিং
সম্প্রতি কিছুকাল যাবৎ বাঙলাদেশে এক ধরণের লেখা চলছে, আপনি লক্ষ্য করে থাকবেন। প্রধানত কল্লোল ও কালি-কলম নামক দুটি কাগজেই এগুলি স্থান পায়। অন্যান্য পত্রিকাতেও এ ধরণের লেখা ক্রমশঃ সংক্রামিত হচ্ছে। এই লেখা দুই আকারে প্রকাশ পায়–কবিতা ও গল্প। কবিতা ও গদ্যের যে প্রচলিত রীতি আমরা এতাবৎকাল দেখে আসছিলাম লেখাগুলি সেই রীতি অনুসরণ করে চলে না। কবিতা stanza, অক্ষর, মাত্রা অথবা মিলের কোনো বাঁধন মানেনা। গল্পের form সম্পূর্ণ আধুনিক। লেখার বাইরেকার চেহারা যেমন বাধা-বাঁধনহারা ভেতরের ভাবও তেমনি উচ্ছ্বল। যৌনতত্ত্ব সমাজতত্ত্ব অথবা এই ধরণের কিছু নিয়েই এগুলি লিখিত হচ্ছে। যারা লেখেন তাঁরা Continental Literature-এর দোহাই পাড়েন। যারা এগুলি পড়ে বাহবা দেন তারা সাধারণ প্রচলিত সাহিত্যকে রুচিবাগীশদের সাহিত্য বলে দূরে সরিয়ে রাখেন। পৃথিবীতে আমরা স্ত্রী-পুরুষের যে সকল পারিবারিক সম্পর্ককে সম্মান করে থাকি এই সব লেখাতে সেই সব সম্পর্কবিরুদ্ধ সম্বন্ধ স্থাপন করে আমাদের ধারণাকে কুসংস্কারশ্রেণীভুক্ত বলে প্রচার করবার একটা চেষ্টা দেখি। শ্ৰীযুক্ত নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত মহাশয় এই শ্রেণীর লেখকদের অগ্রণী। Realistic নাম দিয়ে এগুলিকে সাহিত্যের একটা বিশেষ অঙ্গ বলে চালাবার চেষ্টা হচ্ছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, নরেশবাবুর কয়েকখানি বই, কল্লোলে প্রকাশিত বুদ্ধদেব বসুর রজনী হল উতলা নামক একটি গল্প, যুবনাশ্ব লিখিত কয়েকটি গত, এই মাসের (ফাল্গুন) কল্লোলে প্রকাশিত বুদ্ধদেব বসুর কবিতাটি ( অর্থাৎ বন্দীর বন্দনা), কালি-কলমে নজরুল ইসলামের মাধবী প্রলাপ ও অনামিকা নামক দুটি কবিতা ও অন্যান্য কয়েকটি লেখার উল্লেখ করা যেতে পারে। আপনি এ সব লেখার দু-একটা পড়ে থাকবেন। আমরা কতকগুলি বিদ্রুপাত্মক কবিতা ও নাটকের সাহায্যে শনিবারের চিঠিতে এর বিরুদ্ধে লিখেছিলাম। শ্ৰীযুক্ত অমল হোম মহাশয়ও এর বিরুদ্ধে একটি প্রবন্ধ লিখেছেন। কিন্তু এই প্রবল স্রোতের বিরুদ্ধে এই প্রতিবাদ এত ক্ষীণ যে, কোনো প্রবল পক্ষের তরফ থেকে এর প্রতিবাদ বের হওয়ার একান্ত প্রয়োজন আছে। যিনি আজ পঞ্চাশ বছর ধরে বাঙলা সাহিত্যকে রূপে রসে পুষ্ট করে আসছেন তার কাছেই আবেদন করা ছাড়া আমি অন্য পথ না দেখে আপনাকে আজ বিরক্ত করছি।
আমি জানি না, এই সব লেখা সম্বন্ধে আপনার মত কি। নরেশ বাবুর কোন বইয়ের সমালোচনায় আপনি তার সাহসের প্রশংসা করেছেন। সেটা ব্যাজস্তুতি না সত্যিকার প্রশংসা, বুঝতে পারি না। আমি নিজে এগুলিকে সাহিত্যের আগাছা বলে মনে করি। বাঙলা সাহিত্য যথার্থ রূপ নেবার পূর্বেই এই ধরণের লেখার মোহে পড়ে নষ্ট হতে বসেছে, আমার এই ধারণা। সেইজন্যে আপনার মতামতের জন্যে আমি আপনাকে এই চিঠি দিচ্ছি। বিরুদ্ধে বা পক্ষে যে দিকেই আপনি মত দেন, আপনার মত সাধারণের জানা প্রয়োজন।…ক্ষুদ্র লেখকের লেখনীতে সত্য প্রতিবাদও অনেক সময় ঈর্ষা বলে হেলা পায়। আপনি কথা বললে আর যাই বলুক, ঈৰ্ষাব অপবাদ কেউ দেবে না। আমার প্রণাম জানবেন। প্রণত শ্ৰীসজনীকান্ত দাস
