এই রজনী-হল-উতলা। হালের মাপকাঠিতে হয়তো ফিকে, পানসে। কিন্তু এই জন্যে সেদিন চারদিকে তুমুল হাহাকার পড়ে গেল—গেল, গেল, সব গেল—সমাজ গেল, সাহিত্য গেল, ধর্ম গেল, সুনীতি গেল! জনৈকা সন্ত্রান্ত মহিলা পত্রিকায় প্রতিবাদ ছাপলেন–শীলতার সীমা মানলেন না, দাওয়াই বাতলালেন লেখককে। সে যদি বিয়ে না করে থাকে তবে যেন বিয়ে করে, আর বউ যদি সম্প্রতি বাপের বাড়িতে থাকে তবে যেন মানিয়ে নেয় চটপট। তৃতীয় বিকল্পটা কিন্তু ভাবলেন না। অর্থাৎ লেখক যদি বিবাহিত হয় আর স্ত্রী যদি সন্নিহিতা হয়েও বিমুখা থাকে তা হলে কর্তব্য কি? সেই কর্তব্য নির্দেশ করলেন আরেকজন সম্রান্ত মহিলা–প্রায় সম্রাজ্ঞী শ্ৰেণীর। তিনি বক্তৃতামঞ্চে দাঁড়িয়ে বললেন, আঁতুড়ঘরেই এ সব লেখকদের নুন খাইয়ে মেরে ফেলা উচিত ছিল। নির্মলীকরণ নয়, এ একেবারে নির্মূলীকরণ।
আগুনে ইন্ধন জোগাল আমার একটা কবিতা—গাব আজ আনন্দের গান, রজনী-হল-উতলার পরের মাসেই ছাপা হল কল্লোলে :
মৃন্ময় দেহের পাত্রে পান করি তপ্ত তিক্ত প্রাণ
গাব আজ আনন্দের গান।
বিশ্বের অমৃতরস যে আনন্দে করিয়া মন্থন
গড়িয়াছে নারী তার স্পর্শোদ্বেল তপ্ত পূর্ণ স্তন;
লাবণ্যললিততনু যৌবনপুষ্পিত পূত অঙ্গের মন্দিরে
রচিয়াছে যে আনন্দ কামনার সমুদ্রের তীরে
সংসার-শিয়রে–
যে আনন্দ আন্দোলিত সুগন্ধনন্দিত স্নিগ্ধ চুম্বনতৃষ্ণায়
বঙ্কিম গ্রীবার ভঙ্গে, অপাতে, জঙ্ঘায়,
লীলায়িত কটিতটে, ললাটে ও কটু ভ্রূকুটিতে
চম্পা-অঙ্গুলিতে–
পুরুষপীড়নতলে যে আনন্দে কম্প্র মুহ্যমান
গাব সেই আনন্দের গান।
যে আনন্দে বনে বাজে নব নব দেবতার পদনৃত্যধ্বনি।
যে আনলে হয় সে জননী।
যে আনন্দে সতেজ প্রফুর নব দম্ভদৃপ্ত নির্ভীক বর্বর
ব্যাকুল বাহুর বন্ধে কুন্দকান্তি সুন্দরীরে করিছে জর্জর,
শক্তির উৎসব নিত্য যে আনন্দে স্নায়ুতে শিয়ায়
যে আনন্দ সম্ভোগস্পৃহায়—
যে আনন্দে বিন্দু বিন্দু রক্তপাতে গড়িছে সন্তান
গাব সেই আনন্দের গান।।
পরের মাসে বেরোল যুবনাশ্বর পটলডাঙার পাঁচালি, যার কুশীলব হচ্ছে কুঠে বুড়ি, নফর, ফকরে, সদি, গুবরে, নুলো আর খেঁদি পিসি; স্থান পটলডাঙার ভিখিরি পাড়া, প্যাচপেচে পাঁকের মধ্যে হোগলার কুঁড়ে ঘর। আর কথাবার্তা, যেমনটি হতে হয়, একান্ত অশাস্ত্রীয়। তারপরে, তত দিনে, তেরোশ তেত্রিশ সালের বৈশাখে, কালি-কলম বেরিয়ে গেছে—তাতে মাধবী প্রলাপ লিখেছে নজরুল :
আজ লালসা-আলস-মদে বিবশা রতি
শুয়ে অপরাজিতায় ধনী স্মরিছে পতি।
তার নিধুবন—উন্মন
ঠোঁটে কাঁপে চুম্বন
বুকে পীন যৌবন
উঠিছে ফুঁড়ি,
মুখে কাম কণ্টক ব্রণ মহুয়া-কুঁড়ি।
করে বসন্ত বনভূমি সুরত কেলি
পাশে কাম-যাতনায় কাঁপে মালতী বেলি।
ঝুরে আলু-থালু কামিনী
জেগে সারা যামিনী,
মল্লিকা ভামিনী
অভিমানে ভার,
কলি না-ছুঁতেই ফেটে পড়ে কাঁঠালি চাঁপার।
আসে ঋতুরাজ, ওড়ে পাতা জয়ধ্বজা
হল অশোক শিমুলে বন পুষ্পরজা।
তার পাংশু চীনাংশুক
হল রাঙা কিংশুক
উৎসুক উন্মুখ
যৌবন তার
যাচে লুণ্ঠন-নির্মম দস্যু তাতার।
দূরে শাদা মেঘ ভেসে যায়—শ্বেত সারসী
ওকি পরীদের তরী, অপ্সরী-আরশী?
ওকি পাইয়া পীড়ন-জ্বালা
তপ্ত উরসে বাল
শ্বেতচন্দন লালা
করিছে লেপন?
ওকি পবন খসায় কার নীবিবন্ধন?
এততেও শান্তি নেই। কয়েক মাস যেতে না যেতেই কালি-কলমে নজরুল আরেকটা কবিতা লিখলে—অনামিকা। নামের সীমানায় নেই অথচ কামের মহিমায় বিরাজ করছে যে বিশ্বরমা তারই স্তবগান।
যা কিছু সুন্দর হেরি করেছি চুম্বন
যা কিছু চুম্বন দিয়া করেছি সুন্দর–
সে সবার মাঝে যেন তব হরষণ
অনুভব করিয়াছি। ছুঁয়েছি অধর
তিলোত্তমা, তিলে-তিলে! তোমারে যে করেছি চুম্বন
প্রতি তরুণীর ঠোঁটে। প্রকাশ-গোপন।…
তরু, লতা, পশুপাখী, সকলের কামনার সাথে
আমার কামনা জাগে, আমি রমি বিশ্বকামনাতে!
বঞ্চিত যাহারা প্রেমে, ভুঞ্জে যারা রতি,
সকলের মাঝে আমি–সকলের প্রেমে মোর গতি!
যেদিন স্রষ্টার বুকে জেগেছিল আদি সৃষ্টি-কাম,
সেই দিন স্রষ্টা সাথে তুমি এলে, আমি আসিলাম।
আমি কাম তুমি হলে রতি
তরুণ-তরুণী বুকে নিত্য তাই আমাদের অপরূপ গতি!…
বারে-বারে পাইলাম—বারে-বারে মন যেন কহে–
নহে এ সে নহে!
কুহেলিকা! কোথা তুমি? দেখা পাব কবে?
জন্মেছিলে, জন্মিয়াছ, কিম্বা জন্ম লবে?
চূড়া স্পর্শ করল বুদ্ধদেবের কবিতা, বন্দীর বন্দনা—ফাল্গুনের কল্লোলে প্রকাশিত :
বাসনার বক্ষমাঝে কেঁদে মরে ক্ষুধিত যৌবন
দুর্দ্দম বেদনা তার স্ফুটনের আগ্রহে অধীর।
রক্তের আরক্ত লাজে লক্ষ বর্ষ-উপবাসী শৃঙ্গারের হিয়া
রমণী-রমণ-রণে পরাজয়-ভিক্ষা মাগে নিতি।
তাদের মিটাতে হয় আত্মবঞ্চনার নিত্য ক্ষোভ।
আছে ক্রুর স্বার্থদৃষ্টি, আছে মূঢ় স্বার্থপর লোভ,
হিরন্ময় প্রেমপাত্রে হীন হিংসাসর্প গুপ্ত আছে;
আনন্দ-নন্দিত দেহে কামনার কুৎসিত দংশন
জিঘাংসার কুটিল কুশ্রিতা!…
জ্যোতির্ময়, আজি মম জ্যোতির্হীন বন্দীশালা হতে
বন্দনা-সঙ্গীত গাহি তব।
স্বর্গলোভ নাহি মোর, নাহি মোর পুণ্যের সঞ্চয়
লাঞ্ছিত বাসনা দিয়া অর্ঘ্য তব রচি আমি আজি
শাশ্বত সংগ্রামে মোর বিক্ষত বক্ষের যত রক্তাক্ত ক্ষতের বীভৎসতা
হে চিরসুন্দর, মোর নমস্কার সহ লহ আজি।
