আছে। একটু যেন কুণ্ঠিত কণ্ঠস্বর।
দিন না কল্লোলে।
তবুও যেন প্রথমটা বিস্ফারিত হল না বুদ্ধদেব। বাংলাসাহিত্যে তখন একটা কথা নতুন চালু হতে শুরু করেছে। সেই কথাটারই সে উল্লেখ করলে : গল্পটা হয়তো মর্বিড।
হোক গে মর্বিড। কোনটা রুগ্ন কোনটা স্বাস্থ্যসূচক কোন বিশারদ তা নির্ণয় করবে। আপনি দিন। নীতিধ্বজদের কথা ভাববেন না।
উৎসাহের আভা এল বুদ্ধদেবের মুখে।
বললাম, নাম কি গল্পের?
নামটি সুন্দর।
কি?
রজনী হল উতলা।
১৬. কল্লোল যুগের ‘সাহিত্যে অশ্লীলতা’
মনে হল প্রকৃতি চলতে-চলতে যেন হঠাৎ এক জায়গায় এসে থেমে গেছে-যেন উৎসুক আগ্রহে কার প্রতীক্ষা করছে। নাটকের প্রথম-অঙ্কের যবনিকা উঠবার আগ-মুহূর্তে দর্শকরা কেমন হঠাৎ দিন, নিঃশব্দ হয়ে যায়, সমস্ত প্রকৃতিও যেন এক নিমেষে সেইরূপ নিঃসাড় হয়ে গেছে। তারাগুলো আর ঝিকিমিকি খেলছে না, গাছের পাতা আর কাঁপচে না, রাতে যে সমস্ত অদ্ভুত, অকারণ শব্দ চারদিক থেকে আসতে থাকে, তা যেন কার ইঙ্গিতে মৌন হয়ে গেছে, নীল আকাশের বুকে জ্যোছনা যেন ঘুমিয়ে পড়েছে—এমন কি বাতাসও যেন আর চলতে না পেয়ে ক্লান্ত পশুর মত নিস্পন্দ হয়ে গেছে—অমন সুন্দর, অমন মধুর, অমন ভীষণ নীরবতা, অমন উৎকট শান্তি আর আমি দেখিনি। আমি নিজের অজানতে অস্ফুট কণ্ঠে বলে উঠলুম—কেউ আসবে বুঝি? .
অমনি আমার ঘরের পর্দা সরে গেল। আমার শিয়রের উপর যে একটু চাঁদের আলো পড়েছিল তা যেন একটু নড়ে-চড়ে সহসা নিবে গেল—আমি যেন কিছু দেখছি না, শুনছি না, ভাবছি না—এক তীব্র মাদকতার ঢেউ এসে আমাকে ঝড়ের বেগে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। তারপর…
তারপর হঠাৎ আমার মুখের উপর কি কতগুলো খসখসে জিনিস এসে পড়ল—তার গন্ধে আমার সর্বাঙ্গ রিমঝিম করে উঠল। প্রজাপতির ভানার মত কোমল দুটি গাল, গোলাপের পাপড়ির মত দুটি ঠোঁট, চিবুকটি কি কমনীয় হয়ে নেমে এসেছে, চারুকণ্ঠটি কি মনোরম, আশোকগুচ্ছের মত নমনীয়, নিখ শীতল দুটি ব–কি সে উত্তেজনা, কি সর্বনাশা সেই সুখ-তা তুমি বুঝবে না, নীলিমা!
তারপর ধীরে ধীরে দুখানি বাহু লতার মত আমাকে বেষ্টন করে ধরে যেন নিজেকে পিষে চুর্ণ করে ফেলতে লাগল–আমার সারা দেহ থেকে-থেকে কেঁপে উঠতে লাগল–মনে হল আমার দেহের প্রতি শিরা বিদীর্ণ করে রক্তের হোত বুঝি এখুনি ছুটতে থাকবে।
আমার মনের মধ্যে তখনো কৌতূহল প্রবল হয়ে উঠল—এ কে? কোনটি? এ, ও, না, সে? তখন সব নামগুলো জপমালার মত মনে-মনে আউড়ে গেছলুম, কিন্তু আজ একটিও নাম মনে নেই। সুইচ টিপবার জন্যে হাত বাড়াতেই আরেকটি হাতের নিষেধ তার উপর এসে পড়ল।
তোমার মুখ কি দেখাবে না?
চাপা গলায় উত্তর এল—তার দরকার নেই।
কিন্তু ইচ্ছে করছে যে!
তোমার ইচ্ছা মেটাবার জন্যেই তো আমার সৃষ্টি! কিন্তু ঐটি বাদে।
কেন? লজ্জা?
লজ্জা কিসের? আমি তো তোমার কাছে আমার সমস্ত লজ্জা খুইয়ে দিয়েছি।
পরিচয় দিতে চাও না?
না। পরিচয়ের আড়ালে এ রহস্যটুকু ঘন হয়ে উঠুক।
আমার বিছানায় তো চাঁদের আলো এসে পড়েছিল—
আমি জানালা বন্ধ করে দিয়েছি।
ও! কিন্তু আবার তা খুলে দেওয়া যায়!
তার আগে আমি ছুটে পালাব।
যদি ধরে রাখি?
পারবে না।
জোর?
জোর খাটবে না।
একটু হাসির আওয়াজ এল। শীর্ণ নদীর জল যেন একটুখানি কুলের মাটি ছুঁয়ে গেল।
তুমি যেটুকু পেয়েছ, তা নিয়ে কি তুমি তৃপ্ত নও?
যা চেয়ে নিইনি, অর্জন করিনি, দৈবাৎ আশাতীতরূপে পেয়ে গেছি, তা নিয়ে তো তৃপ্তি-তৃপ্তির কথা ওঠে না।
তবু?
তোমার মুখ দেখতে পাওন্নার আশা কি একেবারেই বৃথা?
নারীর মুখ কি শুধু দেখবার জন্যেই?
না, তা হবে কেন? তা যে অফুরন্ত সুধার আধার।
তবে?
আমি হার মানলুম।…
নীলিমা বললে, এইখানেই কি তোমার গল্প শেষ হল?
মাস্টারের কাছে ছাত্রের পড়া-বলার মত করে জবাব দিলুম-না, এইখানে সবে শুরু হল। কিন্তু এর শেষেও কিছু নেই—এই শেষ ধরতে পারো।…
পরের দিন সকালে আমার কি লাঞ্ছনাটাই না হল! রোজকার মত ওরা সব চারদিক থেকে আমায় ঘিরে বসল—রোজকার মত ওদের কথার স্রোত বইতে লাগল জলতরঙ্গের মত মিষ্টি সুরে, ওদের হাসির নোল ঘরের শান্ত হাওয়াকে আকুল করে ছুটতে লাগল, হাত নাড়বার সময় ওদের বালা-চুড়ির মিঠে আওয়াজ রোজকার মতই বেজে উঠল— সবাকার মুখই ফুলের মত রূপময়, মধুর মত লোভনীয়। কিন্তু আমার ক মৌন, হাসির উৎস অবরুদ্ধ। গত রাত্রির চিহ্ন আমার মুখে আমার চোখের কোণে লেগে রয়েছে মনে করে আমি চোখ তুলে কারো পানে তাকাতে পারছি না। তবু লুকিয়ে লুকিয়ে প্রত্যেকের মুখ পরীক্ষা করে দেখতে লাগলুম–যদি বা ধরা যায়! যখন যাকে দেখি, তখনই মনে হয় এই বুঝি সেই! যখনি যার গলার স্বর শুনি, তখনই মনে হয়, কাল রাত্রিতে এই কণ্ঠই না ফিসফিস করে আমায় কত কি বলছিল! অথচ কারো মধ্যেই এমন বিশেষ কোনো পরিবর্তন দেখলুম না, যা দেখে নিশ্চিতরূপে কিছু বলা যায়। সবাই হাসছে, গল্প করছে। কে? কে তা হলে?…
ভেবেছিলুম সমস্ত রাত জেগে থাকতে হবে। মনের সে অবস্থায় সচরাচর ঘুম আসে না। কিন্তু অত্যন্ত উত্তেজনার ফলেই হোক বা পায়ে হেঁটে সারাদিন ঘুরে বেড়ানোর দরুন শারীরিক ক্লান্তিবশতই হোক, সন্ধ্যার একটু পরেই ঘুমে আমার সারা দেহ ভেঙে গেল—একেবারে নবজাত শিশুর মতই ঘুমিয়ে পড়লুম। তারপর আবার আস্তে-আন্তে ঘুম ভেঙে গেল—আবার প্রকৃতির সেই স্থির, প্রতীক্ষমান, নিষ্কম্প অবস্থা দেখতে পেলুম—আবার আমার ঘরের পর্দা সরে গেল-বাতাস সৌরভে মূচ্ছিত হয়ে পড়ল—জ্যোছনা নিবে গেল—আবার দেহের অণুতে-অণুতে সেই স্পর্শসুখের উন্মাদনা—সেই মধুময় আবেশ—সেই ঠোঁটের উপর ঠোঁট ক্ষইয়ে ফেলা—সেই বুকের উপর বুক ভেঙে দেওয়া–তারপর সেই স্নিগ্ধ অবসাদ—সেই গোপন প্রেমগুঞ্জন—তারপর ভোরবেলায় শূন্য বিছানায় জেগে উঠে প্রভাতের আলোর সাথে দৃষ্টিবিনিময়–
