এ বিবরণটি সংগ্রহ করে আনেন সত্যেন্দ্রপ্রসাদ বসু। সংগ্রহ করে আনেন শরৎচন্দ্রের সঙ্গে সাক্ষাৎ সংস্পর্শ থেকে। কানপুরে প্রবাসী বাঙালিদের সাহিত্য-সম্মিলনে তাকে সভাপতি করে ধরে নিয়ে যাবার জন্যে গিয়েছিল সত্যেন। শরৎচন্দ্র তখন আর শিবপুরে নন, চলে গেছেন রূপনারানের ধারে, কিন্তু তা হলেও অপরিচিত অভ্যাগতকে সংবর্ধনা করতে এতটুকু তার অন্যথা নেই।
কিন্তু সত্যেনের কথাটাই বলি। এতবড় মহার্ঘ প্রাণ আর কটা দেখেছি আশে-পাশে? সত্যেন সাহিত্যিক নয়, জানালিস্ট, কিন্তু সাহিত্যরসবুদ্ধিতে তীক্ষ্ণ-তৎপর। প্রত্যহের জীবনের সঙ্গে শুধু খবরের কাগজের সম্বন্ধ—তেমন জীবনে সে বিশ্বাসী নয়। মানুষের সম্বন্ধে সমস্ত খবর শেষ হয়ে যাবার পরেও যে একটা অলিখিত খবর থাকে তাই সে জিজ্ঞাসু। যতই কেননা খবর শুনুক, আসল সংবাদটি জানবার জন্যে সে অলক্ষিতে একেবারে অন্তরের মধ্যে এসে বাসা নেয়। আর অন্তরে প্রবেশ করবার পক্ষে কোন মুহূর্তটি নিভৃত-প্রশস্ত তা খুঁজে নিতে তার দেরি হয় না।
প্রেমরসোচ্ছলিত প্রতপ্ত প্রাণ। সুগঠিত স্বাস্থ্যসমৃদ্ধ চেহারা–চারুদর্শন প্রাণখোলা প্রবল হাসিতে নিজেকে প্রসারিত করে দিত চারপাশে। কল্লোলের দল যখন হোলির হল্লায় রাস্তায় বেরুত তখন সত্যেনকে না হলে যেন ভরা-ভরতি হত না। কল্লোলের প্রতি এই তার অনুরাগের রং সে তার চারপাশের কাগজেও বিকীর্ণ করেছে। বালিতে-চিনিতে মিশেল সব লেখা। খরদূষণ সমালোচকের দল বালি বেছেছে, আর সত্যেনের মত যারা সত্যসন্ধ সমালোচক—তারা রচনা কবেছে চিনির নৈবেদ্য। সে সব দিনে কল্লোলদলের পক্ষে প্রচারণের কোনো পত্রিকাপুস্তিকা ছিলনা, তদবির করে সভায় সভাপতিত্ব নিয়ে নিজের পেটোয়াদের বা নিজের পাবলিশিং হাউসের বিজ্ঞাপন দেবার দুর্নীতি তখনো আসেনি বাংলা সাহিত্যে। সম্বল শুধু আত্মবল আর সত্যেনের সুভাষিতাবলী। কলকাতার সমস্ত দৈনিক-সাপ্তাহিক তার আয়ত্তের মধ্যে, দিকে-দিকে সে লিখে পাঠাল আধুনিকতার মঙ্গলাচরণ। দেখা গেল দায়িত্ববোধযুক্ত এমন সব পত্র-পত্রিকাও আছে যারা কয়েলের দলকে অনুমোন করে, অভিনন্দন জানায়। সেই বালির বাঁধ কবে নস্যাৎ হয়ে গেল, কিন্তু চিনির স্বাদটুকু আজও গেল না।
চক্ষের পলকে চলে গেল সত্যেন। বিখ্যাত সংবাদপরিবেশক প্রতিষ্ঠানে উঠে এসেছিল উচ্চ পদে। কিন্তু সমস্ত উচ্চের চেয়েও যে উচ্চ, একদা তারই ডাক এসে পৌঁছুল। আপিস থেকে ভ্রান্ত হয়ে ফিরে এসে স্ত্রীকে বললে, খেতে দাও, খিদে পেয়েছে।
বলে পোশাক ছাড়তে গেল সে শোবার ঘরে। স্ত্রী ত্বরিত হাতে খাবার তৈরি করতে লাগল। খাবার তৈরি করে স্ত্রী দ্রুত পায়ে চলে এল রান্নাঘর থেকে। শোবার ঘরে ঢুকে দেখে সত্যেন পুরোপুরি পোশাক তখনো ছাড়েনি। গায়ের কোটটা শুধু খুলেছে, আর গলার টাইটা আধ-খোলা। এত শ্রান্ত হয়েছে যে আধ-শোয়া ভঙ্গিতে শরীর এলিয়ে দিয়েছে বিছানায়।
ও কি, শুয়ে পড়লে কেন? তোমার খাবার তৈরি। ওঠো।
কে কাকে ডাকে। বেশত্যাগ করবার আগেই বাসত্যাগ করেছে সত্যেন।
আবার নতুন করে আঘাত বাজে যখন ভাবি সেই সৌমাৎ সৌম্য হাস্যদীপ্ত মুখ আর দেখব না। কিন্তু কাকেই বা বলে দেখা কাকেই বা বলে দেখতে-না পাওয়ায় মাটি থেকে পুতুল তৈরি হয় আবার তা ভাঙলে মাটি হয়ে যায়। তেমনি যেখান থেকে সব আসছে আবার সেখানেই সব লীন হচ্ছে। লীন হচ্ছে সব দেখা আর না-দেখা, পাওয়া আর না-পাওয়া।
সত্যেনের মতই আরেকটি প্রিয়দর্শন ছেলে—বয়সে অবিশ্যি কম ও কায়ায়ও কিঞ্চিৎ কৃশতর—একদিন চলে এল কল্লোলের কর্ণওয়ালিশ স্ট্রীটের দোকানে। তার আগে তার একটি কবিতা বেরিয়েছিল হয়তো কল্লোলে—নিকষ কালো আকাশ তলে, হয়তো বা সেই পরিচয়ে। এল বটে কিন্তু কেমন যেন একা-একা বোধ করতে লাগল। তার সঙ্গী তার বন্ধুকে যেন কোথায় সে ছেড়ে এসেছে, তাই অসুস্থ হতে পারছে না। চোখে ভয় বটে, কিন্তু তার চেয়ে বেশি, সেভয়ে বিস্ময় মেশানো। আর যেটি বিস্ময় সেটি সর্বকালের কবিতার বিস্ময়। যেটি বা রহস্য সেটি সর্বকালের রুচির-রম্যতার রহস্য।
সত্যেনের সঙ্গে অজিতকুমার দত্তের নাম করছি, তারা একসময় একই বাসার বাসিদে ছিল। আর অজিতের নাম করতে গিয়ে বুদ্ধদেবের নাম আনছি এই কারণে তারা একে-অন্যের পরিপূরক ছিল, আর তাদের লেখা একই সঙ্গে একই সংখ্যায় বেরিয়েছিল কল্লোলে।
বুদ্ধদেবকে দেখি প্রথম কল্লোল-আপিসে। ছোটখাট মানুষটি, খুব সিগারেট খায় আর মুক্ত মনে হাসে। হাসে সংসারের বাইরে দাঁড়িয়ে, কোনো ছলাকলা কোনো বিধি-বাধা নেই। তাই এক নিশ্বাসেই মিশে যেতে পারল কল্লোলের সঙ্গে—এক কালস্রোতে। চোখে মুখে তার যে একটি সলজ্জতার ভাব সেটি তার অন্তরের পবিত্রতার ছায়া, অকপট স্ফটিকস্বচ্ছতা। বড় ভাল লাগল বুদ্ধদেবকে। তার অনতিবর্ধ শরীরে কোথায় যেন একটা বজ্রকঠোর দাঢ় লেখা রয়েছে, অনমনীয় প্রতিজ্ঞ, অপ্রমেয় অধ্যবসায়। যখন শুনলাম ভবানীপুরেই উঠেছে, একসঙ্গে এক বাসএ ফিরব, তখনই মনে-মনে অন্তরঙ্গ হয়ে গেলাম।
বললাম, গল্প লেখা আছে আপনার কাছে?
এর আগে বত্রিশের ফাল্গুনের কল্লোলে সুকুমার রায়ের উপরে সে একটা প্রবন্ধ লিখেছে। বাংলাদেশে সেটাই হয়তো প্রথম প্রবন্ধ যেটাতে সুকুমার রায়কে সত্যিকার মূল্য দেবার সৎচেষ্টা হয়েছে। আবোলতাবোলের মধ্যে শ্লেষ যে কতটা গভীর ও দূরগত তারই মৌলিক বিশ্লেষণে সমস্তটা প্রবন্ধ উজ্জ্বল। প্রবন্ধের গদ্য যার এত সাবলীল তার গল্পও নিশ্চয়ই বিস্ময়কর।
