সব দেখি আর কি মনে হয় জান? বণিক সভ্যতার বা আড়ম্বর আর সমারোহের ট্রাজেডি যতই চোখের সামনে প্রকট হয়ে উঠুক না, মাটির ভাঁড়ে ওঠপরশ দিয়ে মাতাল হবার প্রবৃত্তি হয় না। সোনার পেয়ালা চাই। সোনার রঙেই মানুষ পাগল হয়ে ওঠে, মদের নেশায় নয়। মদ খেয়ে মানুষ কতটুকু মাতাল হতে পারে? তাকে মাতাল করতে হলে ঐ মদকে সোনার পেয়ালায় ঢেলে রূপার স্বপনের ছোঁয়াচ দিতে হবে।…
তোমার চিঠির প্রত্যেকটা অক্ষর, তার এক-একটি টান আমার মনকে টেনে রেখেছে। আকাশ ভরে মেঘ করেছে আজ। কী কালো জমাট আঁধার-যেন ভীষণ শত্রুর প্রতীক্ষায় রুদ্ধশ্বাসে দাঁড়িয়ে আছে নিশ্চল হয়ে। এরই মধ্যে তোমার একটা কথার উত্তর খুঁজে পেয়েছি। কবিত্ব সে খালি ফুলের অম্লান হাসিটুকু দেখে, ঈদের অফুরন্ত সুধাস্রোতে ভেসে বা নদীর চিরন্তনী কলধ্বনি শুনেই উবুদ্ধ হয়ে ওঠেনা। রণক্ষেত্রের রক্তস্রোতের ধারায় মৃতদেহের তাপীকৃত পাহাড়ের মাঝে প্ৰেতভৈরবের অট্টহাসির ভীমরোলে, ভল্লখশল্যশূলের উদ্যত অগ্রে, অমানিশার গাঢ় অন্ধকারেও সে বিকশিত হয়। যিনি অন্নপূর্ণা তিনিই আবার ভীমা ভীমবোলা নৃমুণ্ডমালিনী চামুণ্ডা।..
অচিন, খুব একটা পুরানো কথা আমার মনে পড়ছে। সাথী হচ্ছে মানুষেরই মুকুরের মত। তাদেরই মধ্যে নিজের খানিকটা দেখা যায়। তাই যখন তোমাকে প্রেমেনকে শৈলজাকে গোকুলবাবু D. R, নৃপেন পবিত্রকে দেখি তখনই মনে খানিকটা হর্য জেগে ওঠে। নিজেকে খানিকটা-খানিকটা দেখার আনন্দ তখন অসীম হয়ে ওঠে। স্থা, সবায়ের খবর দেব। D. K. পাবলিশিং নিয়ে খুব উঠে-পড়ে লেগেছেন। G. C. আসেন, সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে চলে যান। শৈলজা মাঝে-মাঝে আসেন, বিদ্যুতের মত ঝিলিক দিয়ে একটা সেই বাঁকা চোখের চাউনি ছুঁড়ে চলে যান, কথা বড় কন না। পবিত্র ঠিক তেমনি ভাবে আসে যায় হাসে বকে, আপনার খেয়ালে চলে। ওকে দেখলে মনে হয় যেন স্বতস্ফূর্ত প্রাণধার। আর নৃপেন? ঠিক আগেরই মতো ধূমকেতুর আসা-যাওয়ার ছন্দে চলে…
পুরুলিয়ায় ক্যাম্প করতে এসেছি কলেজ থেকে। তোমার লেখার তালিকা দেখে আমার হিংসে হচ্ছে। আমি তো লেখা ছেড়ে দিয়েছি বল্লেই হয়—তবে আজকাল আর একটা জিনিস ধরেছি সেটা হচ্ছে বিশ্রাম করা। চুপ করে আকাশের দিকে চেয়ে শুয়ে থাকি। দূরে অনেকখানি নীচুতে ধানের ক্ষেতের সবুজ শীষের দোলায়মান বর্ণবিভ্রাট ভারি চমৎকার লাগে কখনও। অনেক দুরে ঠিক স্বপ্নের ছায়ার মতো একটা পাহাড়ের সারির নীল রেখা সারা দিনরাত জেগে আছে চোখের উপর।
এখানে একটি মেয়ের ছবি তুললাম সেদিন। ভারি সুন্দর মেয়েটি, কিন্তু তার সেই চপল ভঙ্গিটিকে ধরতে পারিনি। সেটুকু কোথায় পালিয়ে গেছে। যন্ত্র তার ক্ষমতায় সব আয়ত্ত করেছে বটে, কিন্তু সে প্রাণের ছায়া ধরতে পারে না–
এক রোদে-পোড়া দুপুরে বাজে-শিবপুর যাওয়া হল শরৎচন্দ্রের ছবি তুলতে। ক্যামেরাধারী ভূপতি। মারুন-ধরুন তাড়ান-খেদান, ছবি একটা তাঁর তুলে আনতে হবেই। কিন্তু যদি গা-ঢাকা দিয়ে একেবারে লুকিয়ে থাকেন চুপচাপ? যদি বলেন, বাড়িতে নেই!
খুব হৈ-হল্লা করলে শেষ পর্যন্ত কি না বেরিয়ে পারবেন?
অন্তত বকা-ঝকা করতে তো বেরুবেন একবার। অতএব খুব কড়া করে কড়া নাড়ো। কড়া যখন রয়েছে নাড়বার জন্যেই রয়েছে, যতক্ষণ না হাতে কড়া পড়ে। ভেলির চীৎকারে বিহ্বল হলে চলবে না।
দরজা খুলে দেখা দিলেন শরৎচন্দ্র। দুপুরের রোদের মত ঝাঁজালো নয়, শরচ্চন্দ্রের মতই স্নেহশীল। শুভ্রোজ্জল সৌজন্যে আহ্বান করলেন সবাইকে। কিন্তু প্রাথমিক আলাপের পর আসল উদ্দেশ্য কি টের পেয়ে পিছিয়ে গেলেন। বললেন, খোলটার ছবি তুলে কি হবে?
কিছুই যে হবে না শুধু একটা ছবি হবে এই তাঁকে বহু যুক্তি-তর্ক প্রয়োগ করে বোঝানো হল। তিনি রাজি হলেন। আর রাজিই যদি হলেন তবে তার একটা লিখনত ভঙ্গি চাই। তবে নিয়ে এস নিচু লেখবার টেবিল, গড়গড়া, মোটা ফাউন্টেন-পেন আর ডাব-মার্কা লেখবার প্যাড। পাশে বইয়ের সারি, পিছনে পৃথিবীর মানচিত্র। যা তাঁর সাধারণ পরিমণ্ডল। ডান হাতে কলম ও বাঁ হাতে সটকা নিয়ে শরৎচন্দ্র নত চোখে লেখবার ভঙ্গি করলেন। ভূপতির হাতে ক্যামেরা ক্লিক করে উঠল।
আজ সেই ছবিটির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছি। শরৎচন্দ্রের খুব বেশি ছবি আছে বলে মনে হয় না। কিন্তু কল্লোলের পৃষ্ঠায় এটি যা আছে, তার তুলনা নেই। পরবর্তী যুগের কজন প্রতিষ্ঠা প্রতিপত্তিহীন নতুন লেখকের সঙ্গে তিনি যে তার আত্মার নিবিড়নৈকট্য অনুভব করেছিলেন তারই স্বীকৃতি এ ছবিতে সুস্পষ্ট হয়ে আছে। কমনীয় মুখে কি সে কি করুণা! এ একজন দেশদিকপতির ছবি নয়, এ একজন ঘরোয়া আত্মীয়-অন্তরঙ্গের ছবি! নিজের হাতে ছবিতে দস্তখৎ করে সজ্ঞানে যোগস্থাপন করে দিলেন। বললেন, কিন্তু জেনো, সবাই আমরা সেই রবীন্দ্রনাথের। গঙ্গারই ঢেউ হয়, ঢেউয়ের কখনো গঙ্গা হয় না।
এমনি ধরনের কথা তিনি আরো বলেছেন। তারই একটা বিবরণ তেরোশ তেত্রিশের জ্যৈষ্ঠের কল্লোলে ছাপা আছে :
হাওড়া কি অন্য কোথায় ঠিক মনে নেই, একটা ছোট-মতন সাহিত্য সম্মিলনে আমাকে একজন বললেন, আপনি যা লেখেন তা বুঝতে আমাদের কোনো কষ্ট হয় না, আর বেশ ভালোও লাগে। কিন্তু রবিবাবুর লেখা মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারি না—কি যে তিনি লেখেন তা তিনিই জানেন। ভদ্রলোকটি ভেবেছিলেন তার এই কথা শুনে নিজেকে অহংকৃত মনে করে আমি খুব খুশি হব। আমি উত্তর দিলুম, রবিবাবুর লেখা তোমাদের তো বোঝবার কথা নয়। তিনি তো তোমাদের জন্যে লেখেন না। আমার মত যারা গ্রন্থকার তাদের জন্যে রবিবাবু লেখেন, তোমাদের মত যারা পাঠক তাদের জন্যে আমি লিখি।
