কল্লোলে এই দুইটি বিচ্ছিন্ন ধারা ছিল। এক দিকে রুক্ষ-শুষ্ক শহরে কৃত্রিমতা, অন্যদিকে অনাঢ্য গ্রাম্য জীবনের সারল্য। বস্তি বা ধাওড়া, কুঁড়েঘর বা কারখানা, ধানখেত বা ড্রয়িংরুম। সমস্ত দিক থেকে একটা নাড়া দেওয়ার উদ্যোগ। যতটা শক্তি-সাধ্য, শুধু ভবিষ্যতের ফটকের দিকে ঠেলে এগিয়ে দেওয়া। আর তা শুধু সাহিত্যে নয়, ছবিতে। তাই একদিন যামিনী রায়ের ডাক পড়ল কল্লোলে। তেরোশ বত্রিশের আশ্বিনে তার এক ছবি ছাপা হল—এক গ্রাম্য মা তার অনাবৃত বুকের কাছে তার শিশুসন্তানকে দুই নিবিড় হাতে চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
অপূর্ব সেই দাঁড়াবার ভঙ্গিটি। বহির্দৃষ্টিতে মার মুখটি শ্রীহীন কিন্তু একটি স্থিরলক্ষ্য স্নেহের চারুতায় অনির্বচনীয়। গ্রীবা, পিঠ ও স্তনাংশরেখার বঙ্কিমায় সেই স্নেহ দ্রবীভূত। অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দীন, হয়তো অশোভন, কিন্তু দুইটি কর্মকঠিন করতলের পর্যাপ্তিতে প্রকাণ্ড একটা প্রাপ্তি, আশ্চর্য একটা ঐশ্বর্য যেন সংক্ষিপ্ত হয়ে আছে। সেই তো তার শক্তি, সেই তো তার সৌন্দর্য—নিজের মাঝে এই অভাবনীয়ের আবিষ্কার। এই আবিষ্কারের বিষয় তার শিশু, তার বুকের অনাবরণ। যে শিশুর এক হাত তার আনন্দিত মুখের দিকে উৎক্ষিপ্ততার জন্মের আলোকিত আকাশপটের দিকে।
যামিনী রায় বন্ধু ছিলেন কল্লোলের। পরবর্তী যুগে তিনি যে লোকলক্ষ্মীর রূপ দিয়েছেন তারই অঙ্কুরাভাস যেন ছিল এই আশ্বিনের ছবিতে।
সে-সব দিনে যেতাম আমরা যামিনী রায়ের বাড়িতে, বাগবাজারে। অজ্ঞাত গলিতে অখ্যাত চিত্রকর-আমাদেরও তখন তাই অবাধ নিমন্ত্রণ। আত্মার আত্মায় যোগ ছিল কল্লোলের সঙ্গে। শুধু অকিঞ্চনতার দিক থেকে নয়, বিদ্রোহিতার দিক থেকে। ভাঁড়ের মধ্যে রং আর বাঁশের চোঙার মধ্যে তুলি আর পোড়ো বাড়িতে স্টুডিয়ো–মামিনী রায়কে মনে হতো রূপকথার সেই নায়ক যে অসম্ভবকে সত্যভূত করতে পারে। হাজার বছরের অন্ধকার ঘর আলো করে দিতে পারে এক মুহূর্তে।
সোনা গালাবার সময় বুঝি খুব উঠে-পড়ে লাগতে হয়। এক হাতে হাপর, এক হাতে পাখা-মুখে চোঙ–যতক্ষণ না সোনা গলে। গলার পর যেই গড়ানে ঢালা, অমনি নিশ্চিন্ত। অমনি স্বর্ণস্বপ্নময়।
পূর্বতনদের মধ্যে থেকে হঠাৎ সুরেন গাঙ্গুলি মশাই এসে কল্লোলে জুটলেন। চিরকাল প্রবাসে থাকেন, তাই শিল্পমানসে মেকি-মিশাল ছিল না। যেখানে প্রাণ দেখেছেন, সৃষ্টির উন্মাদনা দেখেছেন, চলে এসেছেন। অগ্রবর্তীদের মধ্য থেকে আরো কেউ-কেউ এসেছিলেন কল্লোলে–কিন্তু ততটা যেন মিশ খাওয়াতে পারেননি। সুরেনবাবু এগিয়ে থেকেও পিছিয়ে ছিলেন না, সমভাবে অনুপ্রেরিত হলেন। কল্লোলের জন্যে উপন্যাস তো লিখলেনই, লিখলেন শরৎচন্দ্রের ধারাবাহিক জীবনী। সুরেনবাবু শরৎচন্দ্রের শুধু আত্মীয় নন, আবাল্য সঙ্গী-সাথী—প্রায় ইয়াববক্সি বলা যেতে পারে। খুব একটা অন্তরঙ্গ ঘরোয়া কাহিনী, কিন্তু সাহিত্যরসে বিভাসিত।
শরৎচন্দ্রের জীবনী ছাপা হবে, কিন্তু তাঁর হালের ফটো কই? কি করে জোগাড় করা যায়? না, কি চেয়ে-চিন্তে কোথা থেকে একটা পুরোনো বয়সের ছবি এনেই চালিয়ে দেওয়া হবে? চেহারাটা যদি তরুণ-তরুণ দেখায়, বলা যাবে পাঠককে, কি করব মশাই, লেখকেই বয়স বাড়ে, ছবি অপরিবর্তনীয়!
গম্ভীর মুখে ভূপতি বললে, ভাবনা নেই, আমি আছি।
ভূপতি চৌধুরী কল্লোলের আদিভূত সভ্য, এবং অন্তকালীন। একাধারে গল্পলেখক, ইঞ্জিনিয়র, আবার আমাদের সকলকায় ফোটোগ্রাফার। প্রফুল্ল মনের সদালাপী বন্ধু। শত উল্লাস-উত্তালতার মধ্যেও ভদ্র মার্জিত রুচির অন্তঃশীল মাধুর্যটি যে আহত হতে দেয় না। সমস্ত বিষয়ের উপরেই দৃষ্টিভঙ্গি তার বৈজ্ঞানিক, তাই তার লেখায় ও ব্যবহারে সমান পরিচ্ছন্নতা। কিন্তু এই বৈজ্ঞানিক ভঙ্গির অন্তরালে একটি চিরজাগ্রত কবি ভাবাকুল হয়ে রয়েছে। কঠোরের গভীরে স্বাদু সৌন্দর্যের অবতারণা।
তেরোশ একত্রিশ সালের সেই নবীনব্রতী যুবকের চিঠির কটি টুকরো এখানে তুলে দিচ্ছি :
মানব সভ্যতাযন্ত্রের ধ্বকধ্বক ধ্বনির পীড়নে কান বধির হবার উপক্রম হয়েছে। ফানেসের লালচক্ষু, পিস্টনের প্রলয়দোলা, গভর্নরের ঘূর্নি, ফ্লাই-হুইলের টলে-পড়া, স্যাফটের আকুলিবিকুলি—প্রাণ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। খুব সকালে বাড়ি থেকে উঠে সোজা সাইক্লে করে কলেজে গিয়ে কলেজ-প্রাইম-মুভার্স ল্যাবরেটরিতে ওয়ারলেস রেডিও সেট তৈরি করাচ্ছি—আবার সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে আসছি।
সত্যি বলছি ভাই, যখন শান্তভাবে চুপ করে শুয়ে থাকি, হয়ত আকাশের ঘন নীলিমার দিকে নক্ষত্রপুঞ্জের দিকে চেয়ে কত কি ভেবে যাই, একটা শান্তি আর তৃপ্তি আর পূর্ণতা প্রাণের মধ্যে অনুভব করিমানুষের কর্মজীবনের কোলাহল তখন ভাবতেও ভাল লাগে না। কিন্তু সেই কোলাহলের মাঝে মানুষ যখন ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন সে তার কাজের আনন্দে কি মই না হয়ে ওঠে। এ মত্ততার ক্ষিপ্রতা আর ক্ষিপ্ততার মধ্যে প্রকাণ্ড একটা বেগ আছে, সে-বেগে মেঘে-মেঘে সংঘর্ষ হয়, বিদ্যুৎ ফেটে পড়ে। তারপর আবার অন্ধকারের করালী লীলা প্রকট হয়ে ওঠে। বুঝতে পারি না কি ভালো লাগে—এই উন্মত্ত দুৰ্দাম বেগ না শান্তির আত্মসমাধি? কলের বাঁশির তীব্র দৃঢ় আহ্বান, না, মনোবাশরীর রন্ধ্রে-রন্ধ্রে বেজে-ওঠা ব্যাকুল ক্রন্দন? লোকারণ্য, না নির্জনতা? বিদ্রোহ না স্বীকৃতি?
