শিশিরকুমার যে কত বড় অভিনেতা, কত বড় অসাধ্যসাধক, আমার জানা-মত ছোটখাট একটি দৃষ্টান্ত আছে। সেটা আরো অনেক পরের কথা, যে বছর শিশিরবাবু তার দলবল নিয়ে আমেরিকা যাচ্ছেন। আমেরিকা থেকে একটি বিদুষী মহিলা এসেছেন ভারতবর্ষে, দৈবক্রমে তার সৌহার্দ লাভ করার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। তার খুব ইচ্ছ, বাংলাদেশ থেকে যে অভিনেতা আমেরিকা যাবার সাহস করেছেন তার সঙ্গে তিনি আলাপ করবেন। শিশিরকুমার তখন নয়নচাঁদ দত্ত স্ট্রিটে তেতলার ফ্ল্যাটে থাকেন। তাঁর কাছে গিয়ে প্রস্তাব পেশ করলাম। তিনি আনন্দিত মনে নিমন্ত্রণ করলেন সেই বিদেশিনীকে। দিন-ক্ষণ ঠিক করে দিলেন।
নির্ধারিত দিনে বিদেশিনী মহিলাকে সঙ্গে করে উঠে গেলাম তেতলায়। সম্পূর্ণ নিঃসংশয় ছিলাম না, তাই তাকে বললাম, তুমি এই বারান্দায় একটু দাঁড়াও, আমি ভিতরে খোঁজ নিই।
ভিতরের খোঁজ নিতে গিয়ে হকচকিয়ে গেলাম। দেখি ঘরের মেঝের উপর ফরাস পাতা—আর তার উপরে এমন সব লোকজন জমায়েত হয়েছেন যাদের অন্তত দিনে-দুপুরে দেখা যাবে বলে আশা করা যায় না। হামোনিয়ম, ঘুঙুর, আরে এটা-ওটা জিনিস এখানেওখানে পড়ে আছে। বোধ হয় কোনো নাটকের কোনো জরুরী দৃশ্যের মহড়া চলছিল। কিন্তু তাতে আমার মাথাব্যথা কি? শিশিরবাবু কোথায়? এই কোথা নিয়ে এসেছি বিদেশিনীকে? আবার আরেকজন মিস মেয়ো না হয়!
জিগগেস করলাম, শিশিরবাবু কোথায়?
খবর যা পেলাম তা মোটেই আশাবর্ধক নয়। শিশিরবাবু অসুস্থ, পাশের ঘরে নিদ্রাগত।
কঙ্কাবতী ছিলেন সেখানে। তাঁকে বললাম আমার বিপদের কথা। তিনি বললেন, বসুন, আমি দেখছি। তুলে দিচ্ছি তাঁকে।
সমস্ত ফরাসটাই তুলে দিলেন একটানে। ঘুঙুর, হার্মোনিয়ম, এটা-সেটা, সাঙ্গ আর উপাঙ্গের দল সব পিটটান দিলে। কোন জাদুকরের হাত পড়ল—চকিতে শ্রীমন্ত হয়ে উঠল ঘর-দোর। কোত্থেকে খানকয়েক চেয়ারও এসে হাজির হল।ক্সচ বিদেশিনীকে এনে বসালাম।
তবু ভয়, আমাদের দেশের শ্রেষ্ঠ যে অভিনেতা তার স্পর্শ পেতে না তার ভুল হয়।
গায়ে একটা ড্রেসিং-গাউন চাপিয়ে প্রবেশ করলেন শিশিরকুমার। প্রতিভাদীপ্ত সৌম্য মুখে অনিদ্রার ক্লেশক্লান্তিও সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়ে উঠেছে। মিগ্ধ সৌজন্যে অভিবাদন করলেন সেই বিদেশিনীকে।
তারপর সুরু করলেন কথা। যেমন তার জ্যোতি তেমনি তার অজস্রতা। আমেরিকার সাহিত্যের খুঁটিনাটি—তার জীবন ও জীবনাদর্শ। আর থেকে-থেকে ভাব-সহায়ক কবিতার আবৃত্তি। সর্বোপরি এক সৃজনপিপাসু শিল্পীমনের দুর্বার। বিদেশিনী মহিলা অভিভূত হয়ে রইলেন।
চলে আসবার পর জিগগেস করলাম মহিলাকে কেমন দেখলে?
চমৎকার। মহৎ প্রতিভাবান—নিঃসন্দেহ।
ভাবি, এত মহৎ যাঁর প্রতিভা তিনি সাহিত্যের জন্যে কি করলেন? অনেক অভিনেতা তৈরি করেছেন বটে, কিন্তু একজন নাট্যকার তৈরি করতে পারলেন না কেন?
শিশিরকুমারের সান্নিধ্যে আবার একবার আসি ঢাকার দল এসে কল্লোলে মিশলে পরে। আগে এখন ঢাকার দল তো আসুক।
তার আগে দুজন আসে ফরিদপুর থেকে। এক জসীম উদ্দীন, আর হুমায়ুন কবির।
একেবারে সাদামাটা আত্মভোলা ছেলে এই জসীম উদ্দীন। চুলে চিরুনি নেই, জামায় বোতাম নেই, বেশবাসে বিন্যাস নেই। হয়তো বা অভাবের চেয়েও ঔদাসীন্যই বেশি। সরলশ্যামলের প্রতিমূর্তি যে গ্রাম তারই পরিবেশ তার ব্যক্তিত্বে, তার উপস্থিতিতে। কবিতায় জসীমউদ্দীনই প্রথম গ্রামের দিকে সঙ্কেত, তার চাষাভুষো, তার খেতখামার, তার নদী-নালার দিকে। তার অসাধারণ সাধারণতার দিকে। যে দুঃখ সর্বহারার হয়েও সর্বময়। যে দৃশ্য অপজাত হয়েও উঁচু জাতের। কোনো কারুকলার কৃত্রিমতা নেই, নেই কোনো প্রসাধনের পারিপাট্য। একেবারে সোজাসুজি মর্মস্পর্শ করবার আকুলতা। কোনো ইজমের ছাঁচে ঢালাই করা নয় বলে তার কবিতা হয়ত জনতোষিণী নয়, কিন্তু মনোতোষিণী।
এমনি একটি কবিতা পেঁয়ো মাঠের সজল-শীতল বাতাসে উড়ে আসে কল্লোলে।
তোমার বাপের লাঙল-জোয়াল দুহাতে জড়ায়ে ধরি
তোমার মায়ে যে কতই কাঁদিত সারা দিনমান ভরি;
গাছের পাতারা সেই বেদনায় বুনো পথে যেত ঝরে।
ফানী হাওয়া কাঁদিয়া উঠিত শুনো মাঠখানি ভরে।
পথ দিয়া যেতে পেঁয়ো পথিকেরা মুছিয়া যাইত চোখ
চরণে তাদের কাঁদিয়া উঠিত গাছের পাতার শোক।
আথালে দুইটি জোয়ান বলদ সারা মাঠপানে চাহি।
হাম্বারবেতে বুক ফাটাইত নয়নের জলে নাহি।
গলাটি তাঁদের জড়ায়ে ধরিয়া কাঁদত তোমার মা
চোখের জলের গোরস্থানেতে ব্যথিয়ে সকল গাঁ—
কবিতাটির নাম কবর। বাংলা কবিতার নতুন দিগদর্শন। কল্লোলের পৃষ্ঠা থেকে সেই কবিতা কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষার বাংলা পাঠ-সংগ্রহে উদ্ধত হল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় সম্ভ্রম বাঁচাতে গিয়ে অনভিজাত কল্লোলের নামটা বেমালুম চেপে গেলেন।
হুমায়ুন কবির কখনো-সখনো আসত কল্লোলে, কিন্তু কায়েমী হয়ে স্থান পাকাতে পারেনি। নম্র, মুখচোরা—কি সমস্ত মুখ নিয়ত-হাসিতে সমুজ্জল। তমোঘ্ন বুদ্ধির তীক্ষ্ণতায় দুই চক্ষু দূরান্বেষী। কথার অন্তে এত হাসে না যত তার আদিতে হাসে; তার মানে, তার প্রথম সংস্পর্শটুকু প্রতি মুহূর্তেই আনন্দময়। কবিরের তখন নবীন নীরদের বর্ষা, কবিতায় প্রেমের বিচিত্রবর্ণ কলাপ বিস্তার করছে। কিন্তু মাধ্যন্দিন গাম্ভীর্ষে সেই নবানুরাগের মাধুর্য কই? বয়সের ক্ষেত্রে প্রবীণ্য আসুক, কিন্তু প্রেমের ক্ষেত্রে যেন পরিপূর্ণতা না আসে।
