এবার সব দিককার দরজা-জানালা খুলে দিতে হবে, আলো ও হাওয়া আসুক। হয়ত চিরনিরুদ্ধ গৃহে বাস করায় অভ্যস্ত দুই একটা নোগা ছেলে এই আলো ও হাওয়া বরদাস্ত করতে পারবে না। কিন্তু স্বভাবটাকে গলা টিপে মারবার চেষ্টায় নিজেরা যে মরে যাব। না হয় মড়ার মতন হয়ে কয়েকটা দিন বেঁচে থাকব। এরূপ বাঁচার চেয়ে মরা ভাল।
যে সকল বীর আমাদের ঘর-দোর জোর করে খুলে দেওয়ার জন্যে লেখনী নিয়ে অগ্রসর হয়েছেন, তন্মধ্যে কল্লোলের লেখকেরা সর্বাপেক্ষা তরুণ ও শক্তিশালী। প্রাচীন সমাজের সহিত একটা সন্ধি স্থাপন করবার দৈন্য ইহাদের নাই। নিজেদের প্রগাঢ় অনুভূতি সত্যের প্রতি অনুরাগ প্রভৃতি গুণে একান্ত নির্ভীক, ইহারা মামুলী পথটাকে একেবারে পথ বলে স্বীকার করেন না, ইহারা যাহা সুন্দর যাহা স্বাভাবিক, যেখানে প্রকৃত মনুষ্যত্ব, তাহা প্রত্যক্ষ করেছেন, সেই আত্মার প্রকাশিত সত্যটাকে ইহারা বেদ কোরাণের চাইতে বড় মনে করেছেন। এই সকল বলদর্পিত মৰ্ম্মবান লেখকদের পদভরে প্রাচীন জরাজীর্ণ সমাজের অস্থিপঞ্জর কেঁপে উঠবে। কিন্তু আমি এদের লেখা পড়ে যে কত সুখী হয়েছি তা বলতে পারি না। আমাদের মনে হয় ডোবা ছেড়ে পদ্মার স্রোতে এসে পড়েছি—যেন কাগজ ও সোলার ফুল-লতার কৃত্রিম বাগান ছেড়ে নন্দনকাননে এসেছি।
গোকুল সম্বন্ধে আরো একটি কবিতা আসে: নাম, যৌবন-পথিক:
তুমি নব বসন্তের সুরভিত দক্ষিণ বাতাস
ক্ষণতরে বিকম্পিত করি গেলে বাণীর কানন—
লেখাটি এল মফঃস্বল থেকে, ঢাকা থেকে। লেখক অপরিচিত, কে-এক বুদ্ধদেব বসু। তখন কে জানত এই লেখকই একদিন কল্লোলে—তথা বাংলা সাহিত্যে গৌরবময় নতুন অধ্যায় যোজনা করবে।
————
[* এ দুটো লাইন মালের কাব্যগ্রন্থে নেই।]
১৪. জীবনানন্দ দাশগুপ্ত – অশ্লীলতার হাড়িকাঠে প্রথম বলি
ভবানীপুর মোহিনী মুখুজ্জে রোডে কে-একটি যুবক গল্প বলছে।
পৌষের সন্ধ্যা। কথককে ঘিরে শ্রোতা-শ্রোত্রীর ভিড়। শীতের সঙ্গে-সঙ্গে গল্পও জমে উঠেছে নিটোল হয়ে।
তীক্ষ্ণ একটি মুহূর্তের চুড়ায় গল্প কখন উঠে এসেছে অজান্তে। দোদুল্যমান মুহূর্ত। ঘরের বাতাস স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে।
হঠাৎ বন্ধ হল গল্প-বলা।
তারপর? তারপর কি হল? অস্থির আগ্রহে সবাই ছেকে ধরল কথককে।
তারপর? একটু হাসল নাকি যুবক? বললে, বাকিটা কাল শুনতে পাবে। সময় নেই, লাস্ট ট্রাম চলে গেল বোধ হয়।
পরদিন গল্পের বাকিটা আমরাও শুনতে পেলাম। ইডেন হিন্দু হসটেলের বাথরুমে দরজা বন্ধ করে কার্বলিক এসিড খেয়ে কথক বিজয় সেনগুপ্ত আত্মহত্যা করেছে।
দেখতে গিয়েছিলাম তাকে। দীর্ঘ দেহ সংকুচিত করে মেঝের উপর শুয়ে আছে বিজয়। ঠোঁট দুটি নীল।
চারদিকে গুঞ্জন উঠল যুবসমাজে, সাহিত্যিক সমাজে। কেউ সহানুভূতি দেখাল, কেউ করলে তিরস্কার। কেউ বললে, এম-এর পড়া-খরচ চলছিল না; কেউ টিপ্পনি কেটে বললে, এম-এর নয় হে, প্রেমের। কেউ বললে, বিকৃতমস্তিষ্ক; কেউ বললে, কাপুরুষ।
যে যাই বলুক, তার মৃত সুন্দর মুখে শুধু একটি গল্প-শেষ-করার শান্তি। আবার কোথায় আরেকটি গল্প আরম্ভ করার আয়োজন।
তারপর? এই মহাজিজ্ঞাসার কে উত্তর দেবে? শুধু প্রাণ থেকে প্রাণে অধ্যায় থেকে অধ্যায়ে, এই তারপরের ইসারা। শুধু একটি ক্রমায়ত উপন্যাস।
বিজয়ের বেলায় অনেকেই তো অনেক মন্তব্য করেছিলে, কিন্তু সুকুমারের বেলায় কি বললে? তাকে কে হত্যা করল? কে তাকে অকালে তাড়িয়ে দিলে সংসার থেকে?
এম-এস-সি আর ল পড়ত সুকুমার। খরচের দায়ে এম-এস-সি চালাতে পারল না—শুধু আইন নিয়ে থাকল। কিন্তু শুধু নিজের পড়া-খরচ চালালেই তো চলবে না-সংসার চালাতে হবে। দেশের বাড়িতে বিধবা মা আর দুটি বোন তার মুখের দিকে চেয়ে। বড় বোনটিকে পাত্রস্থ করা দরকার। কিন্তু ঘুরে ঘুরে সে হা-ক্লান্ত, বিনাপণে বর নেই বাংলা দেশে।
একমাত্র রোজগার ছাত্র-পড়ানো—আর কালে-ভদ্রে পূজার কাগজে গল্প লিখে দুপাঁচ টাকা দর্শনী। আর সে দু-পাচ টাকা আদায় করতে আড়াই মাস ধন্না দেওয়া। সকালে যাও, শুনবে কৈলাসবাবু তো তিনটের সময় আসেন; আর যদি তিনটের সময় যাও, শুনবে, কৈলাসবাবু তো ঘুরে গিয়েছেন সকালবেলা। সুতরাং যদি লিখে রোজগার করতে চাও তো সাহিত্যে নয়, মুহুরি হয়ে কোর্টের বারান্দায় বসে দরখাস্তের মুসাবিদা করো।
তাই একমাত্র উপায় টিউশানি। সকালে সন্ধ্যায় অলিতে গলিতে শুধু ছাত্রের অন্নছত্র। পাঁচ থেকে পনেরো—যেখানে যা পাওয়া যায়। তুচ্ছ উঞ্ছবৃত্তি। সে ক্লেশ কহতব্য নয়, মুদ্রার মানদণ্ডে মান নেই, শুধু দণ্ডটাই অখণ্ড। স্বাস্থ্য পড়ল ভেঙে, দিব্যবৰ্ণ পাংশুবর্ণ হয়ে গেল। সুকুমার অসুখে পড়ল।
শেষ দিকে প্রমথ চৌধুরীর বাড়িতে গৃহশিক্ষকের কাজ করত। নামে চাকরি, থাকত একেবারে ঘরের ছেলের মত। কিন্তু শুধু নিজে আরামে থেকে তার সুখ কই? স্নেহ-সেবার বিছানায় পড়ে থাকলে তার চলবে কেন? তার মা-বোনেরা কি ভাববে?
টাকার ধান্দায় ঘোরে সামর্থ্য কই শরীরে? ডাক্তার যা বললেন, রোগও রাজকীয়—সাধ্য হলে চেঞ্জে যাওয়া দরকার এখুনি। কিন্তু সুকুমারের মত ছেলের পক্ষে দেশের বাড়িতে ফিরে যাওয়া ছাড়া আর চেঞ্জ কোথায়? সেখানে মায়ের বুক ভরবে সত্যি, কিন্তু পেট ভরবে কি দিয়ে?
মাসখানেক কোন খবর নেই। বোধ হয় মঙ্গলময়ী মায়ের স্পর্শে নিরাময় হয়ে গেছে। কিন্তু হঠাৎ একদিন চিঠি এল কল্লোল-আপিসে, সে দুমকায় যাচ্ছে তার এক কাকার ওখানে। দেশের মাটিতে তার অসুখের কোনো সুরাহা হয়নি।
