পবিত্রর চেষ্টা ফলবতী না হলেও ফুল ধরল। গোকুল উঠে বসল বিছানায়। একটু একটু করে ছাড়া পেল ঘরের মধ্যে। ক্রমশ ঘর থেকে বাইরের বারান্দায়। আর এই বারান্দায় এসে একদিন সে কান দেখলে। মুখে-চোখে আনন্দ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল, দেহ-মন থেকে সরে গেল বোগচ্ছায়া। পবিত্রকে বললে, জানিস, কারু মরতে চাওয়া উচিত নয় পৃথিবীতে, তবু আজ যদি আমি মরি আমার কোনো ক্ষোভ থাকবে না।
সংসারের আনন্দ সব ক্ষীণশ্বাস, অল্পজীবী। কিন্তু এমন কতগুলি হয়তো আনন্দ আছে যা পরিণতি খুঁজতে চায় মৃত্যুতে, যাতে করে সেই আনন্দকে নিরবচ্ছিন্ন করে রাখা হবে, নিয়ে যাওয়া হবে কালাতীত নিত্যকায়। কাঞ্চনজঙ্ঘার ওপারে গোকুল দেখতে পেল ধ্রুব আর দৃঢ় স্থির অর স্থায়ী কোন এক আনন্দতীর্থের মুক্তদ্বার। পথিকের মন উন্মুখ হয়ে উঠল।
ভাদ্রের শেষের দিকে ডাক্তার কালিদাসবাবুকে লিখলেন, গোকুলের অসুখ বেড়েছে। চিঠি পেয়েই দীনেশদা দার্জিলিঙে ছুটলেন। তখন ঘোর দুরন্ত বর্ষা, রেলপথ বন্ধ, পাহাড় ভেঙে পথ ধ্বসে পড়েছে। কাশিয়াং পর্যন্ত এসে বসে থাকতে হল দুদিন। কদিনে রাস্তা খোলে তার ঠিক কি, অথচ যার ডাকে এল তার কাছে যাবার উপায় নেই। সে প্রতি মুহূর্তে এগিয়ে চলেছে অথচ দীনেশদা গতিশূন্য। এই বাধা কে আনে, কেন আনে, কিসের পরীক্ষায়? দীনেশদা কোমর বাঁধলেন। ঠিক করলেন পায়ে হেঁটেই চলে যাবেন দার্জিলিং! সেই ঝড়-জলের মধ্যে গহন-দুর্গম পথে রওনা হলেন দীনেশন। সেটাই কল্লোলের পথ, সেটাই কল্লোলের ডাক। বারো ঘণ্টা একটানা পায়ে হেঁটে দীনেশদা দার্জিলিং পৌঁছুলেন—জলকাদারক্ত-মাখা সে এক দুর্দম যোদ্ধার মূর্তিতে। চলতে-চলতে পড়ে গিয়েছেন কোথাও, তারই ক্ষতচিহ্ন সর্বদেহে ধারণ করে চলেছেন। আঘাতকে অস্বীকার করতে হবে, লঙ্ঘন করতে হবে বিপত্তি বিপর্যয়।
গোকুলের সঙ্গে দেখা হল। দেখা হতেই দীনেশদার হাত ধরল গোকুল। বললে, জীবনের এক দুর্দিনে তোমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। ভাবছিলাম, আজ আবার এই দুর্দিনে যদি তোমার সঙ্গে দেখা না হয়।
বন্ধুকে পেয়ে কথায় পেয়ে বসল গোকুলকে। দীনেশদা বাধা দিতে চেষ্টা করেন কিন্তু গোকুল শোনে না। বলে, বলতে দাও, আর যদি বলতে না পারি।
কথা শেষ করে দীনেশদার হাত তার কপালের উপর এনে রাখন; বললে, Peace, Peace। আমার এখন খুব শান্তি। বড্ড চাইছিলাম তুমি আস, বেশি করে লিখতে পারিনি, কিন্তু বড় ইচ্ছে করছিল তুমি আস। সব বন্ধু-বান্ধবের কথা খুঁটিনাটি করে জেনে নিলে। বললে, আমাকে রাখতে পারবে না, কিন্তু কল্লোলকে রেখো।
সে রাত্রে খুব ভালো ঘুমোল গোকুল। সকালে ঘুম ভাঙলে বললে, বড় তৃপ্তি হল ঘুমিয়ে।
কিন্তু দুপুর থেকেই ছটফট করতে শুরু করলে। দাদা এখন এলেন না?
আজ সন্ধেবেলা পৌঁছুবেন।
গভীর সমর্পণে চোখ বুজল গোকুল।
সন্ধেবেলা কালিদাসবাবু পৌঁছুলেন। দুই ভাইয়ে, সুখ-দুঃখের দুই সঙ্গীতে, শেষ দৃষ্টিবিনিময় হল। আবেগরুদ্ধকণ্ঠে গোকুল একবার ডাকলে, দাদা!
সব শেষ হয়ে গেল আস্তে আস্তে। কিন্তু কিছুই কি শেষ আছে?
গোকুলের তিরোধানে নজরুলের কবিতা গোকুল নাগ প্রকাশিত হয় অগ্রহায়ণের কল্লোলে, সেই বছরেই। এই কটা লাইনে কল্লোল সম্বন্ধে তার ইঙ্গিত উজ্জ্বল-স্পষ্ট হয়ে আছে :
সেই পথ, সেই পথ-চলা গাঢ় স্মৃতি,
সব আছে—নাই শুধু নিতি-নিতি
নব নব ভালোবাসা প্রতি দরশনে
আদি নাই অন্ত নাই ক্লান্তি তৃপ্তি নাই–
যত পাই তত চাই—আরো আরো চাই,–
সেই নেশা সেই মধু নাড়ী-ছেঁড়া টান
সেই কল্পলোকে নব-নব অভিযান–
সব নিয়ে গেছ বন্ধু! সে কল-কল্লোল
সে হাসি-হিল্লোল নাই চিত উতরোল।
* আজ সেই প্রাণঠাসা একমুঠো ঘরে
* শূন্যের শূন্যতা রাজে, বুক নাহি ভরে।….
সুন্দরের তপস্যায় ধ্যানে আত্মহারা
দারিদ্রের দর্পতেজ নিয়ে এল যারা,
যারা চির-সর্ব্বহারা করি আত্মদান
যাহারা সৃজন করে করে না নির্ম্মাণ,
সেই বাণীপুত্রদের আড়ম্বরহীন
এ সহজ আয়োজন এ স্মরণ দিন
স্বীকার করিও কবি, যেমন স্বীকার
করেছিলে তাহাদের জীবনে তোমার।
নহে এরা অভিনেতা দেশনেতা নহে
এদের সৃজনকুঞ্জ অভাবে বিরহে,
ইহাদের বিত্ত নাই, পুঁজি চিত্তদল,
নাই বড় আয়োজন নাই কোলাহল;
আছে অশ্রু আছে প্রীতি, আছে বক্ষক্ষত,
তাই নিয়ে সুখী হও, বন্ধু স্বর্গগত!
গড়ে যারা, যারা করে প্রাসাদনিৰ্ম্মাণ
শিরোপা তাদের তরে তাদের সম্মান।
দুদিনে ওদের গড়া পড়ে ভেঙে যায়,
কিন্তু স্রষ্টাসম যারা গোপনে কোথায়
সৃজন করিছে জাতি সৃজিছে মানুষ
রহিল অচেনা তারা।
অপ্রত্যাশিতভাবে আরেক জায়গা থেকে তপ্ত অভিনন্দন এল। অভিনন্দন পাঠালেন ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেন, বাগবাজার বিশ্বকোষ লেন থেকে।
…গোকুলের পথিক পড়া শেষ করেছি। বইখানিতে সব চাইতে আমার দৃষ্টি পড়েছে একটা কথার উপর। লেখক বাঙ্গালার ভাবী সমাজটার যে পরিকল্পনা করেছেন তা দেখে বুড়োদের চোখের তারা হয়ত কপালে উঠতে পারে, হয়ত অনেকে সামাজিক শুভচিন্তাটাকে বড় করে দেখে মনে করতে পারেন, এরূপ লেখায় প্রাচীন সমাজের ভিত ধসে পড়বে। আট বছরের গৌরীর দল এ সকল পুস্তক না পড়ে তজ্জন্য অভিভাবকেরা হয়ত খাড়া পাহারার ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু আমার মনে হয় আমরা যে দরজা শাশি ও জানালা একেবারে বন্ধ করে রেখেছি এ ত আর বেশী দিন পারব না–এতে করে যে কতকগুলি রোগা ছেলে নিয়ে আমরা শুধু প্রাচীন শ্লোক আওড়ে তাদের আধমরা করে রেখে দিয়েছি। বাঙালী জাতি একেবারে জগৎ থেকে চলে যাওয়া বরং ভাল কিন্তু সংস্কারের যাঁতায় ফেলে তাদের অসার করে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়োজন কি?
