এ যদি না হত, অলকা-অমরাবতীকে মানুষ জানত না, বিধাতার অভিপ্রায় বৃথা হত। তিনি স্বর্গের সৌন্দর্য সুখশান্তি দিয়ে পূর্ণ করে কবির হাতে ছেড়ে দিলেন। কবি সেখানে দুঃখের বীজ বুনল, বিরহের বেদনা দিল উজার করে ঢেলে–
মাটির মানুষ ভুখা। তৃষ্ণায় তার বুক শুকিয়ে উঠেছে, ব্যথা-বেদনা সে আর বুঝতে পারে না, চোখে তার জল আসে না, জ্বালা করে। কদবার শক্তি তার নেই, তাই সে মাঝে-মাঝে কবির সৃষ্টি ঐ নন্দনঅলকা-অমরাবতীর দিকে তাকিয়ে বুক হালকা করে নেয়। বিধাতা বিপুল আনন্দে বিভোর হয়ে কবিকে আশীর্বাদ করেন-যে কবি, তোমার শূন্যতা তোমার ক্ষুধা মরুভূমির চেয়ে নিদারুণ হোক।
যাক, অনেক বাজে বকা গেল। তোমার শরীর আছে কেমন? পড়াশোনা ভালই চলছে আশা করি। নতুন আর কি লিখলে? ভালই আছি। আজ আসি।
কদিন পরেই চৌঠা আষাঢ় আবার সে আমাকে একটা চিঠি লেখে। এ চিঠিতে আমার একটা কবিতা সম্বন্ধে কিছু উল্লেখ আছে, সেটা দ্রষ্টব্য। নয়। দ্রষ্টব্য হচ্ছে তার নিজের কবিত্ব। তার বসবোধের প্রসন্নতা।
অচিন্ত্য, এ ভারি চমৎকার হল। সেদিন তোমাকে আমি যে চিঠি লিখেছি তার উত্তর পেলাম তোমার বিরহ কবিতায়। অপূৰ্ব! বিস্ময়, কামনা, বুভুক্ষা, অতৃপ্তি, প্রেম আর শ্রদ্ধা যেন ফুলের মত ফুটে উঠেছে।
বিস্ময় বলছে :
মরি মরি
অপরূপ আকাশেরে কি বিস্ময়ে রাখিয়াছ ধরি।
নয়নের অন্তরমণিতে। নীলের নিতল পারাবার!
বাঁধিয়াছ কি অপূর্ব লীলাছন্দ জ্যোতি-মূর্চ্ছনার
সুকোমল স্নেহে!
কামনা বলছে :
যৌবনের প্রচণ্ড শিখায়
দেহের প্রদীপখানি আনন্দেতে প্রজ্বালিয়া
সৌরভে সৌরভে,
এলে প্রিয়া
লীলামত্ত নির্ঝরেব ভঙ্গিমাগৌরবে–
বুভুক্ষা বলেছে :
আজ যদি প্রচণ্ড উৎসুকে
সৃষ্টির উন্মত্ত সুখে
তোমার ঐ বক্ষপানি দ্রাক্ষাসম নিষ্পেষিয়া লই মম বুকে
কানে-কানে মিলনের কথা কই—
অতৃপ্তি বলছে :
এই মোর জীবনের সর্বোত্তম সর্বনাশী ক্ষুধা
মিটাইতে পারে হেন নাহি কোনো সুধা
দেহে প্রাণে ওষ্ঠে প্রিয়া তব–
প্রেম বলছে :
জ্যোৎস্নার চন্দনে স্নিগ্ধ যে আঁকিল টিকা
আকাশের ভালে।
ফাল্গুনের স্পর্শ-লাগা মুঞ্জরিত নব ডালে-ডালে
সদ্যফুল্প কিশলয় হয়ে
যে হাসে শিশুর হাসি…
যে তটিনী কলকণ্ঠে উঠিছে উচ্ছ্বাসি
বক্ষে নিয়া দুরন্ত-পিপাসা
সে আজি বেঁধেছে বাসা
হে প্রিয়া তোমার মাঝে!…
মরি মরি
তোমারে হয় না পাওয়া তাই শেষ করি।
চেয়ে দেখি অনিমিখ
তুমি মোর অসীমের সসীম প্রতীক।
শ্রদ্ধা বলছে :
হে প্রিয়া তোমারে তাই
বারে বারে চাই
খুঁজিতে সে ভগবানে,
তাই প্রাণে-প্রাণে
বিরহের দগ্ধ কান্না ফুকারিয়া ওঠে অবিরাম
তাই মোর সব প্রেম হইল প্রণাম।
তোমার কথা তোমায় শোনালাম। এ সমালোচনা নয়। আমি দু-একজনের কবিতা ছাড়া বাংলার প্রায় সব কবির লেখাই বুঝতে পারি না। যাদের লেখা আমি বুঝতে পারি, পড়ে মনে আনন্দ পাই, তৃপ্তি পাই, উপভোগ করি, তোমাকে আজ তাদের পাশে এনে বসালাম। আমার মনে যাদের আসন পাতা হয়েছে তারা কেউ আমায় নিরাশ করেনি। তোমাকে এই কঠিন জায়গায় এনে ভয় আর আনন্দ সমান ভাবে আমায় উতলা করে তুলছে। কিন্তু খুব আশা হচ্ছে কবিত। লেখা তোমার সার্থক হবে। তোমার আগেকার লেখার ভিতর এমন সহজ ভাবে প্রকাশ করবার ক্ষমতাকে দেখতে পাই নি। সূৰ্য্য কবিতা কতকটা সফল হয়েছিলে কিন্তু বিরহে তুমি পূর্ণতা লাভ করেছ।
গতবারের চিঠিতে যে আশীৰ্বাদ পাঠিয়েছিলাম সেটাই আবার তোমায় বলছি। তোমার শূন্যতা তোমার অন্তরের ক্ষুধা মরুভূমির চেয়ে নিদারুণ হোক। শরীরের যত্ন নিও। কাজটা খুব শক্ত নয়। ইতি–
আমাকে লেখা গোকুলের শেষ চিঠি। এগারোই আষাঢ়, ১৩৩২ সাল।
অচিন্ত্য, তোমার চিঠি পেয়েছি। কিন্তু আমার দুটো চিঠির উত্তর একটাতে সারলে ফল বিশেষ ভাল হবে না। আর একটা বিষয়ে একটু তোমাদের সাবধান করে দিই—আমাকে magnifying glass চোখে দিয়ে দেখোনা কোন দিন। এটা আমার ভাল লাগে না। আমি কোন বিষয়েই তোমাদের বড় নই। আমি তোমাদের বন্ধুভাবে নিয়েছি বলে তোমরা সকলে হাতে চাঁদ আর কপালে সুয্যি পেয়েছ এ কথা কেন মনে আসে? এতে তোমরা নিজের শক্তিকে পঙ্গু করে ফেলবে। আমাকে ভালবাস শ্রদ্ধা কর সে আলাদা কথা, কিন্তু একটা হবু-গবু কিছু প্রমাণ কোরো না।
আমি আজও পথিকের চেহারা দেখতে পেলাম না। জন্মদাতার chance কি সবার শেষে? মনটা একটু অস্থির আছে। আসি।
গোকুলের পথিক ছাপা হচ্ছিল কাশীতে, ইণ্ডিয়ান প্রেসে। ডাকে প্রুফ আসত, আর সে-প্রুফ আগাগোড়া দেখে দিত পবিত্র। পড়ে যেত গোকুলের সামনে, আর অদল-বদল যদি দরকার হত, গোক বলে দিত মুখে-মুখে। গোকুলের ইচ্ছে ছিল পথিকের মুখবন্ধে রবীন্দ্রনাথের পথিক কথিকাটি কবির হাতের লেখায় ব্লক করে ছাপবে, কিন্তু তার সে ইচ্ছে পূর্ণ হয়নি।
তেরোশ বত্রিশের বৈশাখে কল্লোলে রবীন্দ্রনাথের মুক্তি কবিতাটি ছাপা হয়। কল্লোলের সামান্য পুঁজি থেকে তার জন্যে দক্ষিণা দেওয়া হয় বিশ্বভারতীকে।
যেদিন বিশ্বের তৃণ মোর অঙ্গে হবে রোমাঞ্চিত
আমার পরান হবে কিংশুকের রক্তিম-লাঞ্ছিত
সেদিন আমার মুক্তি, যেই দিন হে চির-বাঞ্ছিত
তোমার লীলায় মোর লীলা
যেদিন তোমার সঙ্গে গীতরঙ্গে তালে-তালে মিলা।
দাজিলিং থেকে দুজন নতুন বন্ধুসংগ্রহ হল কল্লোলের–এক অচ্যুত চট্টোপাধ্যায়, আর সুরেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, এক কথায় আমাদের দা-গোঁসাই। প্রথমোক্তর সম্পর্কটা কিছুটা ভাসা-ভাসা ছিল, কিন্তু দা-গোঁসাই কল্লোলের একটা কায়েমী ও দৃঢ়কায় খুঁটি হয়ে দাঁড়াল। পলিমাটির পাশে সে যেন পাথুরে মাটি। সেই শক্তি আর দৃঢ় শুধু তার ব্যায়ামবলিষ্ঠ শরীরে নয়, তার কলমে, মোহলেশহীন নির্মম কলমে উপচে পড়ত। বত্রিশের প্রাবণে দা-গোঁসাই নামে সে একটা আশ্চর্যরকম ভাল গল্প লেখে, আর সেই থেকে তার নাম হয়ে যায় দা-গোঁসাই। গল্পটার সব চেয়ে বড় বিশেষত্ব ছিল যে সেটা প্রেম নিয়ে লেখা নয়, আর লেখার মধ্যে কোথাও এতটুকু সঙ্গলকোমল মেঘোদয় নেই, সর্বত্রই একটা খটখটে রোদ্দরের কঠিন পরিচ্ছন্নতা। এ যে অন্তর্নিহিত ব্যঙ্গটুকুর জন্যে সমস্ত সৃষ্টি অর্থান্বিত, সেই মধুর ব্যঙ্গটুকু অপরিহার্যরূপে উপস্থিত। লোকটিও তেমনি। একেবারে সাদাসিধা, কাঠখোট্টা, স্পষ্টবক্তা। কথাবার্তাও কাট-কাট, হাড়-কাপানো। ঠাট্টাগুলোও গাট্টা-মারা। ভিজে হাওয়ার দেশে এক ঝাপটা তপ্ত লু। তপ্ত কিন্তু চারদিকে স্বাস্থ্য আর শক্তির আবেগ নিয়ে আসত। ঢাকের যেমন কাঠি, তেমনি তার সঙ্গে সাইকেল। পো ছাড়া যেমন সানাই নেই, তেমনি সাইকেল ছাড়া দা-গোঁসাই নেই। এই দোচাকা চড়ে সে অষ্ট দিক (উর্ধ্ব-অধঃ ছাড়া) প্রদক্ষিণ করছে অষ্টপ্রহর। সন্দেহ হয়েছে সে সাইকেলেই বোধ হয় ঘুমোয়, সাইকেলেই খায়-দায়। বেমাইকেল মধুসূদন দেখেছি কিন্তু বেসাইকেল সুরেশ মুখুজ্জে দেখেছি বলে মনে পড়েনা।
