কালিদাসবাবু ডক্টরেট নিয়ে ফিরলেন বিদেশ থেকে। গোকুল যেন হাতে সঁদ কপালে সুয্যি পেয়ে গেল। মা-বাপ হারা ভাইয়ে-ভাইয়ে জীবনের নানা সুখ-দুঃখ ও ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে অপূর্ব বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। বিদেশে দাদার জন্যে তার উদ্বেগের অন্ত ছিল না। যেমন ভালবাসত দাদাকে তেমনি নীরবে পূজা করত। দাদা ফিরে এলে যেন হাঁপ ছেড়ে বাচল। দাদাকে কুণ্ডু লেনের বাড়ি ছেড়ে দিয়ে সে দিদিমণি ও তার ছেলেদের নিয়ে চলে এল তাদের শিবপুরের বাড়িতে। সেই শিবপুরের বাড়িতে এসেই সে অসুখে পড়ল।
জরের সঙ্গে পিঠে প্রবল ব্যথা। সেই জ্বর ও ব্যথা নিয়েই সে পথিকের কিস্তি লিখেছে, করেছে জ। ক্রিফের অনুবাদ। কদিন পরেই রক্তবমি করলে, ডাক্তার পরীক্ষা করে বলে দিলে, যক্ষ্মা।
শিবপুরের বাড়িতে আমরা, কল্লোলের বন্ধুরা, প্রায় রোজই যেতাম গোকুলকে দেখতে, তাকে সঙ্গ দিতে, সাধ্যমত পরিচর্যা করতে। অনেক শোকশীতল বিষণ্ণ সন্ধ্যা আমরা কলহাস্যমুখর করে দিয়ে এসেছি। গোকুলকে এক মুহূর্তের জন্যেও আমরা বুঝতে দিই নাই যে আমরা তাকে ছেড়ে দেব। কতদিন দিদিমণির হাতের ডাল-ভাত খেয়ে এসেছি তৃপ্তি করে। দিদিমণি বুঝতে পেরেছেন ঐ একজনই তাঁর ভাই নয়।
একদিন গোকুল আমাকে বললে, আর সব যাক, আর কিছু হোক থোক, স্বাস্থ্যটাকে রেখো, স্বাস্থ্যটাকে ছেড়ে দিও না।
তার স্নেহকরুণ মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
যার স্বাস্থ্য আছে তার আশা আছে। নিশ্বাস ফেলল গোকুল : আর যার আশা আছে তার সব আছে।
১৩. নজরুলের কবিতা গোকুল নাগ
ডাক্তারের পরামর্শ দিলে দার্জিলিঙে নিয়ে যেতে।
স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে গোকুলকে বিদায় দেবার সেই ম্লানগম্ভীর সন্ধ্যাটি মনের মধ্যে এখনো লেগে আছে। তার পুনরাগমনের দিকে আমরা ব্যাকুল হয়ে তাকিয়ে থাকব এই প্রত্যাশাটি তাকে হাতে-হাতে পৌঁছে দেবার জন্যে অনেকেই সেদিন এসেছিলাম ইষ্টিশানে। কাঞ্চনজঙ্ঘার থেকে সে কাঞ্চনকান্তি নিয়ে ফিরে আসবে। বিশ্বভুবনের যিনি তমোহর তিনিই তার বোগহরণ করবেন।
সঙ্গে গেলেন দাদা কালিদাস নাগ। কিন্তু তিনি তো বেশি দিন থাকতে পারবেন না একটানা। তবে কে গোকুলকে পরিচর্যা করবে? কে থাকবে তার রোগশয্যায় পার্শ্বচর হয়ে? কে এমন আছে আমাদের মধ্যে?
আর কে! আছে সে ঐ একজন, অশরণের বন্ধু, অগতির গতি–পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়।
যখন ভাবি, তখন পবিত্রর প্রতি শ্রদ্ধায় মন ভরে ওঠে। শিবপুরে থাকতে রোজ সে রুগীর কাছে ঠিক সময়ে হাজিরা দিত, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকত তার পাশটিতে, তাকে শান্ত রাখত, প্রফুল্ল রাখত, নৈরাশ্যের বিরুদ্ধে মনের দরজায় বসে কড়া পাহারা দিত একমনে। কলকাতা থেকে হাওড়ার পোল পেরিয়ে রোজ শিবপুরে আসা, আর দিনের পর দিন এই আত্মহীন কঠিন শুশ্রূষা-এর তুলনা কোথায়! তারপর এ নিঃসহায় রুগীকে নিয়ে দার্জিলিঙে যাওয়া—অন্তত তিন মাসের কড়ারে—নিজের বাড়ি ঘর কাজকর্মের দিকে না তাকিয়ে, সুখসুবিধের কথা না ভেবে ভাবতে বিস্ময় লাগে! একটা প্রতিজ্ঞা যেন পেয়ে বসেছিল পবিত্রকে। অক্লান্ত সেবা দিয়ে গোকুলকে বাঁচিয়ে তোলবার প্রতিজ্ঞা।
যে স্যানিটোরিয়ামে গোকুল ছিল তার টি-বি ওয়ার্ড প্রায় পাতাল প্রদেশে নেমে চলেছে তো চলেইছে। নির্জন জঙ্গলে ঘেরা। চারদিকে ভয়গহন পরিবেশ। সব চেয়ে দুঃসহ, ওয়ার্ডে আর দ্বিতীয় রুগী নেই। সামান্য আলাপ করবার জন্যে সঙ্গী নেই ত্রিসীমায়। এক ঘরে রুগী আরেক ঘরে পবিত্র। রুগীরও কথা কওয়া বারণ, অতএব পবিত্র ও সে কি শব্দ-শ্রুতিহীন কঠিন সহিষ্ণুতা। এক ঘরে আশা, অন্য ঘরে চেষ্টা—দুজন দুজনকে বাঁচিয়ে রাখছে। উৎসাহ জোগাচ্ছে। আশা তবু কাঁপে, কিন্তু চেষ্টা টলে না।
এক-এক দিন বিকেলে গোকুল আর তাগিদ না দিয়ে পারত না। কি আশ্চর্য, চব্বিশ ঘণ্টা রুগীর কাছে বসে থেকে তুইও শেষ পর্যন্ত রুগী বনে যাবি নাকি? যা না, ঘন্টা দুই বেড়িয়ে আয়।
পবিত্র হাসত। হয়তো বা খইনি টিপত। কিন্তু বাইরে বেরুতে চাইত না।
দার্জিলিঙে এসে কেউ কি ঘরের মধ্যে বসে থাকে কখনো?
একজন থাকে। একজনের জন্যে একজন থাকে। আবার হাসত পবিত্র : সেই দুই একজন যখন দুইজন হবে তখন বেরুব একসঙ্গে।
গোকুল যেখানে ছিল, শুনেছি, সেখানে নাকি সুস্থ মানুষেরই দেহ রাখতে দেরি হয় না। সেইখানেও পবিত্রর আপ্রাণ যোগসাধন!
না, তুই যা। তুই ঘুরে এলে আমি ভাব কিছুটা মুক্ত হাওয়া আর মুক্ত মানুষের সঙ্গস্পর্শ নিয়ে এলি।
পবিত্র তাই একটু বেরুত বিকেলের দিকে, শুধু গোকুলকে শান্তি দেবার জন্যে। কিন্তু নিজের মনে শান্তি নেই।
গোকুলের চিঠি। তিরিশে জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩২ সালে লেখা। দার্জিলিঙের স্যানিটোরিয়াম থেকে :
অচিন্ত্য, তোমার চিঠি (নন্দনকানন থেকে লেখা!) আমি পেয়েছি। উত্তর দিতে পারিনি, তার কারণ নন্দনকাননের শোভায় তোমার কবিমন এমন মশগুল হয়ে ছিল যে ঠিকানা দিয়েছিলে কলকাতার। কিন্তু কলকাতায় যে কবে আসবে তা তোমার জানা ছিল না। যাই হোক, তুমি ফিরেছ জেনে সুখী হলাম।
পৃথিবীতে অমন শত-সহস্র নন্দন-অমরাবতী-অলকা আছে, কিন্তু সেটা তোমার-আমার জন্যে নয়—এ কথা কি তোমার আগে মনে হয়নি? তোমার কাজ আলাদ। : তুমি কবি, তুমি শিল্পী। ঐ অমরাবতী অলকার স্নিগ্ধমায়া তোমার প্রাণে দুর্জয় কামনার আগুন জেলে দেবে। কিন্তু তুমি দস্যু নও, লুট করে তা ভোগের পেয়ালায় ঢালবে না। কবি ভিখারী, কবি বিবাগী, কবি বাউল—চোখের জলে বুকের রক্ত দিয়ে ঐ নন্দন-অলকার গান গাইবে, ছবি আঁকবে। অলকার সৃষ্টি দেবতা যেদিন করেন সেদিন ঐ কবি-বিবাগকে ও তার মনে পড়েছিল। ঐ অলকার মতই কবি বিধাতার অপূৰ্ক সৃষ্টি। তার তৃপ্তি কিছুতে নাই, তাই সে ছন্নছাড়া বিবাগী পথিক, তাই সে বাউল।
