হে প্রাণ-সাগর! তোমাতে সকল প্রাণের নদী
পেয়েছে বিরাম, পথের প্লাবন-বিবোধ রাধি!
হে মহামৌনি, গহন তোমার চেতনতলে
মহাবুভুক্ষাবারণ তৃপ্তি-মন্ত্র জ্বলে!
ধন্বন্তরি! মন্বন্তর-মন্থ-শেষ–
তব করে হেরি অমৃতভাণ্ড-অবিদ্বেষ?
কিংবা
পাপ কোথা নাই-গাহিয়াছে ঋষি, অমৃতের সন্তান–
গেয়েছিল আলো বায়ু নদীজল তরুলতা-মধুমান!
প্রেম দিয়ে হেথা শোধন-করা যে কামনার সোমরস,
সে রস বিরস হতে পারে কভু? হবে তার অপযশ?
ফুটপাতের উপর গ্যাসপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে তিনি যখন আমাদেরকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কবিতা পড়িয়ে শোনাতেন তখন আবৃত্তির বিহবলতায় তার দুই চোখ বুজে যেত। আমরা কে শুনছি বা না শুনছি, বুঝছি বা না বুঝছি, এটা রাস্তা না বাড়ি, সে-সব সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক ছিল, তিনি যে তদশতচিত্তে আবৃত্তি করতে পারছেন সেইটেই তার বড় কথা। কিন্তু যদি মুহূর্তমাত্র চোখ মেলে দেখতেন সামনে, দেখতে পেতেন আমাদের মুখে লেশমাত্র বিরক্তি নেই, বরং ভক্তির নম্রতায় সমস্ত মুখ-চোখ গদগদ হয়ে উঠেছে। স্থান ও সময়ের সীমাবোধ সম্বন্ধে তিনি কিঞ্চিৎ উদাসীন হলেও তার কবিতার চিত্তহারিতা সম্বন্ধে আমরা বিন্দুমাত্র সন্দিহান ছিলাম না।
তিনি নিজেও সেটা বুঝতেন নিশ্চয়। তাই একদিন পরমপ্রত্যাশিতের মত এলেন আমাদের আস্তানায়, শোপেনাওয়ার-এর উদ্দেশে লেখা তার বিখ্যাত কবিতা পান্থ সঙ্গে নিয়ে। সেই কবিতা আধুনিকতায় দেদীপ্যমান। কল্লোলে বেরিয়েছিল তেরোশ বত্রিশের ভাদ্র সংখ্যায়। আর এ কবিতা বের করতে পারে কল্লোল ছাড়া আর কোনো কাগজ তখন ছিল না বাংলাদেশে।
সুন্দরী সে প্রকৃতিরে জানি আমি মিথ্যা সনাতনী!
সত্যেরে চাহি না তবু, সুন্দরের করি আরাধনা–
কটাক্ষ-ঈক্ষণ তার–হৃদয়ের বিশল্যকরণী। স্ব
স্বপনের মণিহারে হেরি তার সীমন্ত-রচনা!
নিপুণা নটিনী নাচে, অঙ্গে অঙ্গে অপূর্ব লাবণি!
স্বর্ণপাত্রে সুধারস, না সে বিষ?—কে করে শোচনা!
পান করি সুনির্ভয়ে, মুচকি হাসে যবে ললিত-লোচনা!
জানিতে চাহি না আমি কামনার শেষ কোথা আছে,
ব্যথায় বিবশ, তবু হোম কবি জালি কামানল!–
এ দেহ ইন্ধন তায়—সেই সুখ! নেত্রে মোর নাচে
উলঙ্গিনী ছিন্নমস্তা! পাত্রে ঢালি লোহিত গরল!
মৃত্যু ভৃত্যরূপে আসি ভয়ে-ভয়ে পরসাদ যাচে!
মুহূর্তের মধু লুটি—ছিন্ন করি হৃদ্পদ্মদল!
যামিনীর ডাকিনীরা তাই হেরি একসাথে হাসে খলখল!
চিনি বটে যৌবনের পুরোহিত প্ৰেম-দেবতারে,–
নারীরূপা প্রকৃতিরে ভালোবেসে বক্ষে লই টানি;
অনন্তরহস্যময়ী স্বপ্নসখী চির-অচেনারে
মনে হয় চিনি যেন-এ বিশ্বের সেই ঠাকুরানী।
নেত্র তার মৃত্যু-নীল।—অধরের হাসির বিথারে
বিস্মরণী রশ্মিরাগ! কটিতলে জন্ম-রাজধানী।
উরসের অগ্নিগিরি সৃষ্টির উত্তাপ-উৎস!–জানি তাহা জানি।
অবিস্মরণীয় কবিতা। বাংলা সাহিত্যের অপূর্ব ঐশ্বর্য। তারপর তার প্রেতপুরী বেয়োয় অগ্রহায়ণের কল্লোলে।
হেরি উরসের যুগ্ম যৌবনমঞ্জরী
যে-অনল সর্ব-অঙ্গে শিরায় সঞ্চরি
মৰ্ম্ম গ্রন্থি মোর
দাহ করি গড়ে পুনঃ সোহাগের স্নেহ-হেম ডোর–
সে-অনল পরশের আশে
মোর মত দেথি তারা ঘুরে ঘুবে আশে তব পাশে।
বিলোল কবরী আর নীবিবন্ধু মাঝে
পেলব বঙ্কিম ঠাঁই যেথা যত রাজে–
খুঁজিয়া লয়েছে তারা সর্ব-অগ্রে ব্যগ্র জনে-জনে,
অতনুর তনু-তীর্থে–লাবণ্যের লীলা নিকেতনে।
যত কিছু আদর-সোহাগ
শেষ করে গেছে তার! মোর অনুরাগ,
চুম্বন আশ্লেষ—সে যে তাহাদেরি পুরাতন রীতি,
বহুকৃত প্রণয়ের হীন অনুকৃতি…
আজি এ নিশায়—
মনে হয়, তারা সব রহিয়াছে ঘেরিয়া তোমায়!
তোমার প্রণয়ী, মোর সতীর্থ যে তারা!
যত কিছু পান করি রূপরসধারা–
তারা পান করিয়াছে আগে।
সর্বশেষ ভাগে
তাদেরি প্রসাদ যেন ভুঞ্জিতেছি হায়!
নাহি হেন ফুল-ফল কামনার কল্প-লতিকায়,
যার পরে পড়ে নাই আর কারো দর্শনের দাগ,
—আর কেহ হরে নাই যাহার পরাগ।
ওগো কাম-বধূ!
বল, বল, অনুচ্ছিষ্ট আছে আর এতটুকু মধু?
রেখেছ কি আমার লাগিয়া সযতনে
মনোমঞ্জুষায় তব পীরিতির অরূপরতনে?
আমারো মিটেছে সাধ
চিত্তে মোর নামিছে বহুজনতৃপ্তি-অবসাদ।
তাই যবে চাই তোমাপানে–
দেখি ওই অনাবৃত দেহের শ্মশানে।
প্রতি ঠাঁই আছে কোনো কামনার সদ্য বলিদান!
চুম্বনের চিতাভস্ম, অনজের অঙ্গার-নিশান!
বাঁধিবারে যাই বাহুপাশে
অমনি নয়নে মোর কত মৌনী ছায়ামূর্তি ভাসে।
দিকে দিকে প্রেতের প্রহরা!
ওগো নারী, অনিন্দিত কান্তি তব!–মরি মরি রূপের পসরা!
তবু মনে হয়
ও সুন্দর স্বর্গখানি প্রেতের আলয়!
কামনা-অঙ্কুশ-ঘাতে যেই পুনঃ হইনু বিকল
অমনি বাহুতে কারা পরায় শিকল!
তীব্র সুখ-শিহরণে ফুকারিয়া উঠি যবে মৃদু আর্তনাদে–
নীরব নিশীথে কারা হাহারে উচ্চকণ্ঠে কাঁদে।
মোহিতলালও এলেন উত্তরায়—এলেন আমাদের পুনরাবর্তী হয়ে। কল্লোলের সঙ্গে সঙ্গে উত্তরাও সরগরম হয়ে উঠল। কিন্তু কত দিন যেতে-না-যেতে কেমন বৈসুর ধরল বাজনায়! মতে বা মনে কোন অমিল নেই, তবু কেন কে জানে, মোহিতলাল বেঁকে দাঁড়ালেনকল্লোলের দল ছেড়ে চলে গেলেন পলের দলে। শুনেছি, সুরেশকে লিখে পাঠালেন, কল্লোলের দলের যে সব লেখক তোমার কাগজে লেখে তাদের সংব যদি না ত্যাগ করে তবে আমি আর উত্তরা। লিখব না! সুরেশ মেনে নিতে চাইল না এ সর্ত। ফলে, মোহিতলাল বর্জন করলেন উত্তরা। সুরেশ আরো দুর্দম হয়ে উঠল। এত প্রখ্য যেন সইল না অতুলপ্রসাদের। তিনি সরে দাঁড়ালেন। তবু সুরেশ অবিচ্যুত। রাধাকমল আছেন, যিনি সাহিত্যে অশ্লীলতা নামক প্রবন্ধে রায় দিয়েছেন আধুনিকতার স্বপক্ষে। কিন্তু অবশেষে রাধাকমলও বিযুক্ত হলেন। সুরেশ, একা পড়ল। তবু সে দমল না, পিছু হটল না। প্রতিজ্ঞার পতাকা খাড়া করে রাখল।
