ছেলে দল শুদ্ধু হেসে উঠল। বিশুদার ধোপে কোথাও যায় এতটুকু ঝগড়াঝাটি রইল না।
বিশ্বপতি আর শিবরাম কল্লোলে হয়তো কোনোদিন লেখেনি কিন্তু দু জনেই কল্লোলের বন্ধু ছিল নিঃসংশয়। মনোভঙ্গির দিক থেকে শিবরাম তো বিশেষ সমগোত্র। কিন্তু এমন একজন লোক আছে যে আপাতদৃশ্যে কল্লোলের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েও প্রকৃতপক্ষে কল্লোলের স্বজনসুহৃদ। সে কাশীর সুরেশ চক্রবর্তী—উত্তরার উত্তরসাধক।
আমরা তার নাম রেখেছিলাম চটপটি। ছোছাটখাটো মানুষটি, মুখে অনর্গল কথা, যেন তপ্ত খোলায় চড়বড় করে খই ফুটছে—একদও এক জায়গায় স্থির হয়ে বসতে নারাজ, হাতে-পায়ে অসামান্য কাজকে সংক্ষিপ্ত করার অসম্ভব ক্ষিপ্রতা। এক কথায় অদম্য কর্মশক্তির অন্য প্রতিমান। একদিন কল্লোলের কনওয়ালিশ স্ট্রিটের দোকানে এসে উপস্থিত—সেই সর্বত্রগামী পবিত্রর সঙ্গে। কি ব্যাপার? প্রবাসী বাঙালিদের তরফ থেকে দুর লক্ষ্ণৌ থেকে মাসিকপত্রিকা বের করা হয়েছে—চাই কল্লোলের সহযোগ। সম্পাদক কে? সম্পাদক লক্ষৌর সার্থকনামা ব্যারিস্টার-এ পি সেন-মানে, অতুলপ্রসাদ সেন আর প্রথিতযশা প্রফেসর রাধাকমল মুখোপাধ্যায়। তবে তো এ মশাই প্রৌঢ়পন্থী কাগজ, এর সঙ্গে আমাদের মিশ খাবে কি করে? আমরা যে আধুনিক, অমল হোমের প্রশস্তি-অনুসারে অতি-আধুনিক। আমরা যে উগ্বজ্বলন্ত নবীন।
কোনো দ্বিধা নেই। উত্তরা নিরুত্তর থাকবে না তোমাদের তারুণ্যের বাণীতে। যেমন আমি, সুরেশ চক্রবর্তী, ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের বন্ধুর ডাকে নিমেষেই সাড়া দিয়ে উঠেছি। কে তোমাদের পথ আটকাবে, কে মুখ ফিরিয়ে নেবে অস্বীকারে? আর যা আন্দাজ করেছ তা নয়। অতুলপ্রসাদ অবিশ্যি ভালোমানুষ, বাংলা সাহিত্যের হালচাল সম্বন্ধে বিশেষ ওয়াকিবহাল নন। মোটা আয়ের এ্যাকটিস, তাই নিয়ে মেতে থাকেন। যখন এক-আধটু সময় পান, হালকা গান বাঁধেন। (হালকা মানে গড়ন-পিটনটা হালকা, কিন্তু সে গভীরসঞ্চারী। সে সোজা হৃদয়ের থেকে উঠেছে বলেই বোঝা যায় তার হৃদয়ও কত গভীর আর কত গাঢ়।) তিনি শুধু নাম দিয়েই খালাস। প্রবাসী বাঙালির উন্নতি চান, আর তার মতে উন্নতির প্রথম সোপানেই মাতৃভাষায় একখানি পত্রিকা দরকার। তাকে তোমরা বিশেষ ধোবো না। আর রাধাকমল? বয়সে তিনি প্রবীণ হলেও জেনে রাখখ, তিনি সাহিত্য-প্রগতিতে বিশ্বাসী, নতুন লেখকদের সমর্থনে উদ্যতা। তাকে আপন লোক মনে কোনো। আর অত উচ্চদৃষ্টি কেন? সামনে এই বেঞ্চিতে যে সশরীরে বসে আছি আমি, তাকে দেখ। যে আসল কর্ণধার, যে মূলকারক।
সুরেশ চক্রবর্তী কি করে এল সাহিত্যে, কবে কখন কি লিখল, বা আদৌ কিছু লিখেছে কিনা, প্রশ্ন করার কথাই কারু মনে হল না। সাহিত্যে তার আবির্ভাবটা এত স্বভাবসিদ্ধ। সাহিত্য তার প্রাণ, আর সাহিত্যিকরা তার প্রাণের প্রাণ। সব সাহিত্য আর সাহিত্যিকের খবর-অখবর তার নখদর্পণে। সে যে বিশেষ করে অতি-আধুনিকদের নিমন্ত্রণ করেছে এতেই তো প্রমাণ হচ্ছে তার উদার ও অগ্রসর সাহিত্যবুদ্ধির। যদিও কাশীতে সে থাকে, আসল কাশীবাস তো সৎসঙ্গে। আমাদের যখন ডাকছে, বললাম সুরেশকে, তার কাশীবাস এতদিনে সফল হল।
শেষকালে কাশীপ্রাপ্তি না ঘটে। আমাদের মধ্যে থেকে কে টিপ্পনি কাটলে।
না, তেরোশ বত্রিশে যে উত্তরা বেরিয়েছিল তা এখনো টিকে আছে। কল্লোলে-কালিকলম-প্রগতি আর নেই, কিন্তু উত্তরা এখনো চলছে। এ শুধু একটা আশ্চর্য অনুষ্ঠান নয়, সুরেশ চক্রবর্তীই একটা আশ্চর্য প্রতিষ্ঠান। মুহিত্যের কত হাওয়া-বদল হল, কত উত্থান-পতন, কল্লোল যুগ কিন্তু সুরেশের নড়চড় নেই, বিচ্ছেদ-বিরাম নেই। ঝড়ের রাতেও নির্ভীক দীপস্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে উপেক্ষিত নিঃসঙ্গতায়।
উত্তরার দুজন নিজস্ব লেখক ছিল; যদিও তারা মার্কামারা নন, মননে-চিন্তনে তারা তর্কাতীত আধুনিক, আর আধুনিক মানেই প্রগতিপন্থী। প্রগতি মানে প্রচলিত মতানুগত না হওয়া। দুজনেই পণ্ডিত, শিক্ষাদাতা; কিন্তু শুনতে যেমন জবড়জং শোনাচ্ছে, তাদের মনে ও কলমে কিন্তু একটুকুও জং ধরেনি। রূপালি রোদে ঝিলিক-মারা ইস্পাতের মত তাতে যেমন বুদ্ধির ধার তেমনি ভাবের জেল্লা। এক হচ্ছেন লক্ষ্ণৌর ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, আর হচ্ছেন কাশীর মহেন্দ্র রায। একজন বাক্যকুশল, আরেকজন সুমিতাক্ষর। কিন্তু দুজনেই আসর-জমানো মজলিসী লোক—আধুনিকতার পৃষ্ঠপোষক। একে একে সবাই তাই ভিড়ে গেলাম সে-আসরে। নজরুল, জগদীশ গুপ্ত, শৈলজা, প্রেমেন, প্রবোধ, বুদ্ধদেব, অজিত। ঝকঝকে কাগজে ঝরঝরে ছাপা-উত্তর। সাজসজ্জায়ও উত্তমা। সবাইরই মন টানল।
সব চেয়ে বড় ঘটনা, সাহিত্যের এই আধুনিকতা প্রথম প্রকাশ্য অভিনন্দন পায় এই প্রবাসী উত্তরায়। সেই উদ্যোগ-উদ্ভবের গোড়াতেই। আর, স্বয়ং রাধাকমলের লেখনীতে। দুঃসাহসিক আন্তরিকতায় তার সমস্ত প্রবন্ধটা অত্যন্ত স্পষ্ট ও সত্য শোনাল। শুধু ভাবের নবীনতাই নয়, ভাষার সজীবতাকেও তিনি প্রশংসা করলেন। চারিদিকে হৈ-চৈ পড়ে গেল। আমরা মেতে উঠলাম আর আমাদের বিরুদ্ধ দল তেতে উঠল। যার শক্তি আছে তার শক্তও আছে। শত্রুতাটা হচ্ছে শক্তিপূজার নৈবেদ্য। আমাদের নিন্দা করার মানেই হচ্ছে আমাদের বন্দনা করা।
মোহিতলালকে আমরা আধুনিকতার পুরোধা মনে করতাম। এক কথায়, তিনিই ছিলেন আধুনিকোত্তম। মনে হয়, যজন-যাজনের পাঠ আমরা তার কাছে থেকেই প্রথম নিয়েছিলাম। আধুনিকতা যে অর্থে বলিষ্ঠতা, সত্যভাষিতা বা সংস্কাররাহিত্য তা আমরা খুঁজে পেয়েছিলাম তার কবিতায়। তিনি জানতেন না আমরা তাঁর কবিতার কত বড় ভক্ত ছিলাম, তার কত কবিতার লাইন আমাদের মুখস্ত ছিল।
