তবু, কেন জানি না–কল্লোলের সঙ্গে শুধু কালি কলমের নামটাই লোকে জুড়ে দেয়-উত্তরার কথা দিব্যি ভুলে থাকে। এ বোধ হয় শুধু অনুপ্রাসের খাতিরে। নইলে, একই লেখকদল এই তিন কাগজে সমানে লিখেছে—সমান স্বাধীনতায়। কালি-কলমের মত উত্তরাও এই আধুনিক ভাবের তলধারক ছিল। বরং কালি-কলমের আগে আবির্ভাব হয়েছিল উত্তরা। কালি-কলমের জন্মের পিছনে হয়তো খানিকটা বিক্ষোভ ছিল, কিন্তু উত্তরায় শুধু সৃজন-সুখের মহোল্লাস। কল্লোল–কালি-কলমের বহু অসম্পূর্ণ কাজ উত্তরা করে দিয়েছে। যেমন আবো বহু পরে করেছে পূর্বাশা।
নিজে লেখেনি, অকণ্টক সূযোগ থাকলেও কোনদিন প্রতিষ্ঠা করতে চায়নি নিজের সাহিত্যিক অহমিকা, অবিচল নিষ্ঠায় সাহিত্যের তোপন করেছে, প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে শুধু সাহিত্যিকের কীর্তি। এ চিরসংগ্রামশীল দুর্জয় ব্যক্তিত্বকে কি বলে অভিহিত করব? সুরেশকে নিশ্চয় সাহিত্যিক বলব না, বলব সাহিত্যের শক্তিপ্ত ভাস্কর। রূপদক্ষ কারুকার।
মোহিতলালের মত যতীন্দ্রনাথ সেন গুপ্তও আমাদের আরাধনীর ছিলেন—ভাবের আধুনিকতার দিক থেকে যতীন্দ্রনাথের দুঃখবাদ বাংলাসাহিত্যে এক অভিনব অভিমত। আমারে তদানীন্তন মনোভাবের সঙ্গে চমৎকার মিলে গিয়েছিল। দুঃখের মধ্যে কাব্যের যে বিলাস আছে সেই বিলাসে আমরা মশগুল ছিলাম। তাই নৈরাশ্যের দিনে ক্ষণে-ক্ষণে আবৃত্তি করতাম মরীচিক। এমনি টুকরো-টুকরো লাইন :
চেরাপুঞ্জির থেকে
একখানি মেঘ ধার দিতে পার গোবি-সাহারার বুকে?
তুমি শালগ্রাম শিলা
শোয়া-বসা যার সকলি সমান, তারে নিয়ে রাসলীলা!
মরণে কে হবে সাথী,
প্রেম ও ধর্ম জাগিতে পারে না বারোটার বেশী রাতি!
মিছে দিন যায় বয়ে
উপরে ও নীচে ঘুমের তুলসী—এই শালগ্রাম হয়ে।
চারিদিক দেখে চারিদিক ঠেকে বুঝিয়াছি আমি ভাই,
নাকে শাঁক বেঁধে ঘুম দেওয়া ছাড়া অন্য উপায় নাই।
ঝিম ঝিম নিশ্চিন্ত–
নাকের ডগায় মশাটা মশাই আস্তে উড়িয়ে দিন ত।
যতীন্দ্রনাথও নিমন্ত্রণ নিয়েছিলেন কল্লোলের। যতদূর মনে পড়ে তার প্রথম কবিতা বেরোয় কল্লোলের দ্বিতীয় বছরে মাঘমাসে। কবিতার নাম অন্ধকার:
নিদ্রিতা জননীবক্ষে সুপ্তোখিত শিশু
খেলা করে লয়ে কণ্ঠহার।
কোন মহাশিশু ক্রীড়ামুখে
তব বুকে
ঘুরাইছে জ্যোতিৰ্ম্মালা বিশ্ব শৃঙ্খলার?
অন্ধকার, মহা অন্ধকার!
এর পরে আরো কয়েকটি কবিতা তিনি লিখেছিলেন-তার মধ্যে তার রেল-ঘুমটা উল্লেখযোগ্য। চলন্ত ট্রেনের অনুসরণ করে কবিতার ছন্দ বাঁধা হয়েছিল। সত্যেন দত্তের পালকি বা চরকার কবিতার মত। আমাদের কাছে কেমন কৃত্রিম মনে হয়েছিল, কেমন আন্তরিকতাবজিত। মনে আছে, প্রমথ চৌধুরীকে পড়িয়ে শোনানো হয়েছিল কবিতাটা। তিনি বলেছিলেন, মরীচিকার কবির কোনো কবিতাই অপাঙক্তেয় হতে পারে না! এর মোটে বছর খানেক আগে মরীচিকা বেরিযেছে। একখানা ছোট কবিতার বইয়ে এরি মধ্যে যতীন্দ্রনাথ বিদগ্ধজনমনে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন।
যতীন্দ্রনাথের মিতা যতীন্দ্রমোহন বাগচিও কি তাই না এসে পারেন কল্লোলে? আর তিনি এলেন, ভাবতে অদ্ভুত লাগছে, একেবারে মদিরযৌবনের বেশে, কবিতার নামও যৌবন-চাঞ্চল্য।
সহজ স্বচ্ছন্দ মনোরথ–
ভুটিয়া যুবতী চলে পথ।
টসেটসে রস-ভরপুর
আপেলের মত মুখ
আপেলের মত বুক
পরিপূর্ণ প্রবল প্রচুর
যৌবনের রসে ভরপুর।
মেঘ ডাকে কড় কড়
বুঝিবা আসিবে ঝড়,
তিলেক নাহিক ভর তাতে।
উঘারি বুকের বাস
পূরায় মনের আশ
উরস পরশ করি হাতে,
অজানা ব্যথায় সুমধুর
সেথা বুঝি করে গুরগুর।
যুবতী একেলা পথ চলে
পাশের পলাশ বনে
কেন চায় ক্ষণে-ক্ষণে
আবেশে চরণ যেন টলে
পায়ে-পায়ে বাধিয়া উপলে।
আপনার মনে যায়
আপনার মনে গায়
তবু কেন আন-পানে টান!
করিতে রসের সৃষ্টি
চাই কি দশের দৃষ্টি?
স্বরূপ জানেন ভগবান!
কল্লোলের যৌবন-চাঞ্চল্য তা হলে খালি কল্লোলেরই একচেটে নয়!
না, কি কল্লোলের সুর আরো উচ্চরোলে বাধা? তার চাঞ্চল্য আরো বেগবান? তার যাত্রা আরো দুরান্বেষী?
বৃন্তবন্ধহারা
যাব উদ্দামের পথে, যাব আনন্দিত সর্বনাশে,
বিবৃষ্টি মেঘসাথে, সৃষ্টিছড়া ঝড়ের বাতাসে,
যাব, যেথা শঙ্করের টলমল চরণ-পাতনে
জাহ্নবী তরঙ্গমমুখরিত তাণ্ডব-মাতনে
গেছে উড়ে জটাভ্রষ্ট ধুতুরার ছিন্নভিন্ন দল,
কক্ষচ্যুত ধূমকেতু লক্ষ্যহারা প্রলয়-উজ্জল
আত্মঘাতমদমত্ত আপনারে দীর্ণ কীর্ণ করে
নির্মম উল্লাসবেগে, খণ্ড খণ্ড উল্কাপিণ্ড ঝরে,
কণ্টকিয়া তোলে ছায়াপথ—
তাই কি চলেছি আমরা?
১২. রবীন্দ্রনাথকে প্রথম কবে দেখি?
রবীন্দ্রনাথকে প্রথম কবে দেখি?
প্রথম দেখি আঠারোই ফান, শনিবার, ১৩৩০ সাল। সেবার বি-এর বছর, ঢুকিনি তখন কল্লোলে। রবীন্দ্রনাথ সেনেট হলে কমলা-লেকচার্স দিচ্ছেন। ভবানীপুরের ছেলে, কলকাতার কলেজে গতিবিধি নেই, কোণঠাসা হয়ে থাকবার কথা। কিন্তু গুরুবলে ভিড় ঠেলে একেবারে মঞ্চের উপর এসে বসেছি।
সেদিনকার সেই দৈবত আবির্ভাব যেন চোখের সামনে আজও স্পষ্ট ধরা আছে। সুষুপ্তিগত অন্ধকারে সহসোখিত দিবাকরের মত! ধ্যানে সে-মূর্তি ধারণ করলে দেহ-মন রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে। বাঙ্মমনশ্চশ্রোত্রঘ্রাণপ্রাণ নতুন করে প্রাণ পায়। সে কি রূপ, কি বিভা, কি ঐশ্বর্য! মানুষ এত সুন্দর হতে পারে, বিশেষত বাংলা দেশের মানুষ, কল্পনাও করতে পারতুম না। রূপকথার রাজপুত্রের চেয়েও সুন্দর। সুন্দর হয়ত দুর্লভদৰ্শন দেবতার চেয়েও।
