তখন!
তখন চোখের জলে পৃথিবী ঝাঁপসা হয়ে গেল সুবর্ণর।
সুবৰ্ণর মুখ দিয়ে কথা বেরোল না, সুবৰ্ণ শুধু সেই অমূল্য উপহারখানি হাতে নিয়ে মাথায় ঠেকালো।…
সুবৰ্ণর চোখে এত জল!
সুবৰ্ণর আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মত যাত্রাকালে কেঁদে ভাসাচ্ছে!
একটু যেন অপ্রতিভ হলো প্ৰবোধ, একটু যেন বিস্মিত। যাত্রাকালে তাই বেশি শোরগোল তুলল না, আর গরুর গাড়িতে ওঠার পর অমূল্য যখন বিরাট একটা বোঝা এনে চাপিয়ে দিল গাড়িতে, তখনও বিনা প্ৰতিবাদে নিল সেই ভার।
আরও একবার চোখের জল!
সুবৰ্ণ সেই বোঝাটার দিকে তাকালো। সুবর্ণ মুহূর্তখানেক স্তব্ধ হয়ে রইল। সুবর্ণর চোখ দিয়ে আস্তে আস্তে বড় বড় মুক্তোর মত কয়েকটি ফোঁটা গড়িয়ে পড়লো।
ধূলো মাখা মলাট ছেঁড়া দড়ি দিয়ে থাক করে করে বাধা একবোঝা পুরনো মাসিকপত্র।
নিয়ে এল অমূল্য।
ব্যস্ত ভঙ্গীতে বললো, মেজদা, যদি একটা উপকার কর! বইগুলো কলকাতায় একজনকে দেবার কথা, তো এই সুযোগে তোমার গলায় চাপাচ্ছি, যদি নিয়ে যাও-
প্ৰবোধ আমার দ্বারা হবে না বলে চেঁচিয়ে উঠল না। নিমরাজির সুরে বললো, তা আমি কাকে দিতে যাবো–
আরে না না, তোমায় দিতে যেতে হবে না, সে যখন কলকাতায় যাওয়াটাওয়া হবে, দেখা যাবে। তুমি শুধু সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে তোমার ঘরে রেখ দিও।
এত জায়গা কোথায়? ঘর তো বোঝাই-
এইটুকু বলে প্ৰবোধ।
অমূল্য আরো ব্যস্ততার ভাবে বলে, চৌকির তলায়টলায় যে করে হোক! দেখতেই তো পোচ্ছ দামের জিনিস নয়, তবে জহুরীর কাছে জহরের আদর! জায়গা একটু দিও দাদা—
চোখের জল পড়ে পড়ে এক সময় শুকিয়ে যায়, সুবর্ণ। তবু নির্নিমেষে সেই জহরগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে।
আর এক সময় খেয়াল হয় তার, অম্বিকা নামের সেই উদোমান্দা ছেলেটা সরল বটে, কিন্তু নির্বোধ নয়!
কিন্তু এই নির্মল ভালবাসার উপহারগুলির পরিবর্তে একটু নির্মল প্রীতির কৃতজ্ঞ হাসি হাসবার অবকাশও পেল না। সুবর্ণ। হয়তো জীবনেও পাবে না।
আগে ইচ্ছে হয়েছিল, ওদের গ্রামের আওতা থেকে বেরিয়ে একবার রেলগাড়িতে উঠতে পারলে হয়, সুবৰ্ণকে বুঝিয়ে ছাড়বে মেয়েমানুষের বাড়ি বাড়লে তার কি দশা হয়। কিন্তু করায়ত্ত করে ফেলার পর সে দুরন্ত দুৰ্দমনীয় ইচ্ছেটা কেমন যেন মিইয়ে গেল। আর বোধ করি ওই মিইয়ে যাবার দরুনই হঠাৎ প্ৰবোধচন্দ্রের একটু বিচক্ষণতা এল।
ছেলেমেয়েরা বড় হয়েছে, ওদের সামনে ওদের মাকে বেশি লাঞ্ছনা না করাই ভালো।
তবে?
কাঁহাতক আর চুপ করে বসে থাকা যায় অপ্রতিভের চেহারা নিয়ে!
হয়তো প্ৰবোধের ওই উগ্ৰ মেজাজের গভীরতম মূল শিকড়ের কারণটা এই। চুপ করে থাকলেই নিজেকে ওর কেমন অপ্ৰতিভ আর অবান্তর লাগে, তাই হয়তো সর্বদাই ওই হাকডাকের ঢাকঢোল!
যাতে নিজের কাছেও না নিজে খেলো হয়ে যায়। যাতে নিজের ওই অবান্তর মূর্তিটা কারোর চোখে ধরা না পড়ে।
অতএব চুপ করে বসে থাকা যায় না।
ছেলেদের সঙ্গেই কথা পাড়ে প্ৰবোধ। গুচ্ছির আকোচু-খাকোচু নিয়ে এলি যে? গিলবি ওইগুলো?
আহা তা না হোক, কিছুও যাবে তো! পেটে গেলে রক্ষে থাকবে? ফেলে দে, ফেলে দে—
বাঃ রে-
চন্ননের স্বর অনুনাসিক হয়ে ওঠে, কত ব-ষ্টে গাছ ঠেঙিয়ে নিয়ে এলাম—
আহা কী অমূল্য নিধি! প্ৰবোধ আবার কৌতুকরসও পরিবেশন করে, অমূল্য পিসের দেশের
বস্তু! তারপর ভানু-কানুকেও কিছু উপদেশ দেয়, কিছু জেরা করে। এবং একটু পরেই গলাটা ঝেড়ে নেয়।
সুবৰ্ণলতা কি বোঝে না কিছু?
বোঝে না, ছেলেদের সঙ্গে ওই বৃথা বাক্যব্যয়টা আসলে গৌরচন্দ্ৰকা! এই বার আসল পালা ধরবে!
কম দিন তো দেখছে না লোকটাকে।
তা অনুমান মিথ্যা হয় না।
গৌরচন্দ্রিকা শেষ করে মূল পালায় আসে প্ৰবোধ।
হাসির মত সুরে বলে, বাবাঃ, এমন কান্না জুড়লে তুমি, মনে হচ্ছিল যেন বাপের বাড়ির মেয়ে শ্বশুর বাড়িতে যাচ্ছে!
বলা বাহুল্য উত্তর জুটল না।
শুধু নিরুত্তর কথাটা আর চেষ্টাকৃত হাসিটা যেন বাতাসে মাথা কুটলো।
একটু অপেক্ষা করে আবার বলে ওঠে, কি করবো, কাজ বলে কথা! মেয়েমানুষের বোঝবার ক্ষমতাই নাই। তবে এও বলি, বাড়াবাড়িটা কিছুই ভাল নয়। জামাই, বেয়াই, ননদাই, এই সব হলো গিয়ে তোমার আসল কুটুম্ব, তাদের বাড়ি থেকে আসছে। যেন সমুদ্দুর বহাচ্ছে!
তবুও নিরুত্তর থাকে সুবৰ্ণ।
চুপচাপ বসেই থাকে ছাঁইয়ের মধ্যে আকাশের দিকে চেয়ে।
প্ৰবোধ আবার বলে, যাই বল, আমি একেবারে তাজ্জব বনে গেছি! কখনো যার চক্ষে জল
সুবৰ্ণ তবু তেমনি নির্বিকার চিত্তে বসেই থাকে।
প্ৰবোধ এবার একটা নিঃশ্বাস ফেলে।
আপন মনে বলে, উঃ, খাটুনি যে কী জিনিষ! তা এই শালাই হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে!
তবু সুবর্ণ নীরব।
প্ৰবোধ এবার আর একটা নিঃশ্বাস ফেলে। ক্লিষ্ট-ক্লান্তর ভূমিকা নেয়। বলে, কথায় বলে ব্যথার ব্যাখী! তা বিয়ে করা স্ত্রীই যার ব্যথার ব্যাখী নয়, তার আবার কিসের ভরসা! এ কথা কারুর একবার মনে এল না যে,–তাই তো! লোকটা বিনা নোটিসে এমন হুট্ করে এল কেন? দোষটাই দেখে জগৎ, কারণটা দেখে না!
তথাপি সুবর্ণর ঘাড় ফেরে না।
এইবার অতএব শেষ চাল চালে প্ৰবোধ।
মাথাটা যা টিপটিপ করছে, হাড়ের জ্বর টেনে না বার করে!
এইবার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়। সুবর্ণ এই ডাহা মিথ্যেটা বরদাস্ত করতে পারে না। বলে ওঠে, শুধু জ্বর? জ্বরবিকার নয়?
হয়তো প্ৰবোধের সন্ধির মনোভাব দেখে ঘেন্নাতেই বলে।
রাগ করবার কথা।
রাগ করে চেঁচিয়ে ওঠবার কথা।
