তবে?
তবে কেন প্ৰাণপাখীকে খাঁচার বাইরে বার করে বেড়াল-কুকুরের মুখে রেখে আসা?
ভগবান জানেন ইত্যবসরেই থাবা বসিয়েছে কি না!
মেয়েমানুষটির তো বুদ্ধি-সুদ্ধির বালাই নেই, স্বদেশী শুনেই গলেছেন। নিৰ্ঘাৎ এতদিনে দিব্য মাখামাখি চলছে!
নিশ্চয়।
তা। নইলে চিঠি দিল না একটা? অথচ নিজমুখে বলেছিল, চিঠি দিলে রাগটাগ করবে না তো?
হ্যাঁ, প্ৰবোধের ফেরার সময় সেই কাঠ-কাঠি ভাবটা বদলে গিয়েছিল যেন সুবৰ্ণলতার। অনেকদিন আগের মত নরম আর হাসি-খুশি দেখিয়েছিল। নিচু হয়ে নমস্কার করে পায়ের ধুলো নিয়ে হেসে বলেছিল, হঠাৎ যদি মরেটরে যাই, মাপ চেয়ে রেখে দিলাম।
প্ৰবোধের কি ইচ্ছে হচ্ছিল সেই বনবাদাড়ের মধ্যে ওই সুবৰ্ণলতাকে ফেলে রেখে চলে আসে। কিন্তু উপায় কি? না না, ফিরিয়ে নিয়ে চলে যাই বললে পাগল বলবে না লোকে?
তা ছাড়া বোন-ভগ্নীপতির পক্ষে রীতিমত অপমানও সেটা। অতএব প্ৰাণ রেখে দেহটা নিয়ে চলে আসা!
ইচ্ছে হচ্ছিল একবার সাপটে ধরে আদর করে নেয়। কিন্তু ছেলেগুলো আশেপাশে ঘুরছে। তাই চোখে দীনতা ফুটিয়েই মনোভাব প্ৰকাশ।.
চিঠি দিলে রাগ করবো?
তা কি জানি, তোমাদের বাড়িতে ও রেওয়াজ আছে কি না! বিয়ে হয়ে এস্তক তোমাদের গলাতেই তো পড়ে আছি, চিঠি লেখা কাকে বলে জানিই না।
এইবার জেনো।
বলে-চলে এসেছিল প্ৰবোধ, ফিরে ফিরে তাকাতে তাকাতে।
ঠিক যে অবিশ্বাসিনী হবে সে ভয় অবশ্য নেই। কিন্তু স্বভাবটাই যে পুরুষ-ঘেষা। যেখানে পরপুরুষ, সেখানেই চোখ কান খাঁড়া। আবার বলে কিনা, কান পেতে শুনি নতুন কথা কিছু বলছে কি না। … বলে, নাঃ, সই গঙ্গাজল পাতাবার শখ আমার নেই। কার সঙ্গে পাতাবো? কারুর সঙ্গে মনই মেলে না। রাতদিন আর ওই মেয়েলী গল্প শুনতে ইচ্ছে করে না।
তা হলেই বোঝো!
মেয়েমানুষ তুমি, তোমার মেয়েলী গল্পে অরুচি, কারো সঙ্গে তোমার মন মেলে না!
তবে আর কি, একটা ব্যাটাছেলে খুঁজেই তবে মনের মানুষ পাতাও! বলেছিল প্ৰবোধ কতকটা রাগে, কতকটা ব্যঙ্গে।
সই পাতানোর একটা ঢেউ এসেছিল তখন।
সই গঙ্গাজল বাদেও নতুন নতুন সব আঙ্গিকে।
সেজবৌ তার বাপের বাড়ির দিকের কার সঙ্গে ল্যাভেণ্ডার পাতিয়ে এল, ছোটবৌ এখানেরই পাশের বাড়ির বৌয়ের সঙ্গে পাতালো গোলাপপাতা!
বিরাজ তার জায়ের বোনের সঙ্গে পাতিয়ে নিল বেলফুল, এমন কি মুক্তকেশী পর্যন্ত এই বুড়ো বয়সে মকর সংক্রান্তিতে সাগরে গিয়ে দু-দুটো গিন্নীর সঙ্গে সাগর আর মকর পাতিয়ে এলেন।
বিধবার পাতাপাতিতে তো খরচ বেশি নেই।
মাছ নয়, মিষ্টি নয়, পান-সুপুরি নয়, শাড়ি নয়, শুধু পাঁচখানা বাতাসা আর কাঁচা সুপুরি হাতে দিয়ে সূর্য সাক্ষী করে চিরবন্ধনের প্রতিজ্ঞা!
সধবাদের খরচ বেশী।
তা সধবারা সাধ্যমত করেছে।
শাড়ি সিঁদুর, পান মিষ্টি!
কিন্তু সুবৰ্ণ কারুর সঙ্গে কিছুই পাতালো না। হেসে বললো, বন্ধুত্ব যদি হয়। কারো সঙ্গে এমনিই হবে। পূজো পাঠ করে না করলে হবে না! ওতে আমার রুচি নেই।
ওরা আড়ালে বলেছিল, তা নয়, কাউকে তুমি যুগ্য মনে কর না, তাই!
সুবৰ্ণর বরও রাগে ব্যঙ্গে বললো, তবে আর কি, মেয়েমানুষে যখন রুচি নেই, তখন একটা ব্যাটাছেলে খুঁজে মনের মানুষ পাতাও?
সুবৰ্ণর চোখে কৌতুক ঝিলিক দিয়ে উঠেছিল। সুবৰ্ণ মাথা দুলিয়ে প্ৰবোধের মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া একটি ভঙ্গী করে বলেছিল, তা বলেছ মন্দ নয়! তেমনি যদি কাউকে পাই তো বন্দেমাতরম পাতাই।
বন্দেমাতরম!
এতদিন পরে হঠাৎ সেই কথাটা মনে পড়ে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল প্ৰবোধের।
ঘটে যায় নি তো সেই ঘটনা?
পাতানো হয়ে যায় নি তো?
কে বলতে পারে মনের মানুষ জুটে বসে আছে কিনা?
নাঃ, রবিবার পর্যন্ত অপেক্ষা করার হেতু নেই। কাল-পরশুই চলে যাওয়া যাক। কাল হবে না, বেম্পতিবার। পরশু-পরশুই!
আর দ্বিধা নয়।
সুবৰ্ণর সেই কৌতুকের ভঙ্গীটা মনে পড়ে গেল।
সে ভঙ্গী যেন ভুলেই গেছে সুবৰ্ণর!
অথচ কী হাসিখুশিই ছিল আগে! সেই ছোটবেলায়!
মাঝে মাঝে ক্ষেপতো বটে, কিন্তু স্বভাবটা কৌতুকপ্ৰিয়ই তো ছিল। এবং অত হাসিখুশি অত রঙ্গরস দেখলে বিরক্তিই ধরতো প্ৰবোধের, মাঝে মাঝে তো রাগে মাথার রক্ত আগুন হয়ে উঠত। তার জন্যে শাসনও করেছে কত!
সেই একবার প্রকাশের ফুলশয্যায় আড়িপাতা নিয়ে? শাসনের মাত্রাটি বড় বেশিই হয়ে গিয়েছিল সেদিন! তা রাগটা যে প্ৰবোধের বেশি, সে তো প্ৰবোধ অস্বীকার করে না। মাপও তো চায় তারপর।
কিন্তু কাৰ্যক্ষেত্রে সামলাতে পারে না নিজেকে। বিশেষ করে ওকে পুরুষদের কাছাকাছি দেখলেই। বিরাজের ছোট দ্যাওরটা বুঝি প্রকাশের বন্ধু। সেটাও জুটেছিল সোহাগের মেজবৌদির সঙ্গে।
আর করেও ছিল তেমনি কাণ্ড!
রান্নাঘরের ছাতের আলসে ডিঙিয়ে কার্নিশ বেয়ে ঘুরে চলে গিয়েছিল। ফুলশয্যায় ঘরের জানলায়। তার সঙ্গে সেই ছোঁড়া। একটু ঠেলাঠেলি হলেই স্রেফ নিচের গলিতে।
আর সেই দৃশ্য চোখে পড়ে গেল ঠিক প্ৰবোধেরই। কোথা থেকে? না পাশের বাড়ির ছাত থেকে—যাদের ছাতে হোগলা দিয়ে লোকজন খাওয়ানো হয়েছে। অবশেষে প্ৰবোধ তদারক করছিল বাসনপত্র কিছু পড়ে আছে কি না। হঠাৎ গায়ে কাটা দিয়ে উঠল।
ওটা কী ব্যাপার?
ওরা কে ওখানে? সুবর্ণ? আর ও?
পরবর্তী ঘটনাটা একটু শোচনীয়ই।
প্ৰহারটা বড় বেশী হয়ে গিয়েছিল।
এতদিন পরে সেই কথাটা মনে পড়ে মনটা কেমন টনাটনিয়ে উঠল প্ৰবোধচন্দ্রের। অতটা না করলেও হত! ছোঁড়াটা তো সেই বোকা হাবা গদাই! গোঁফই বেরিয়েছিল, পুরুষ নামের অযোগ্য। আর তা নইলে প্রকাশটার বন্ধু হয়?
