ঘর, দালান, সিঁড়ি সাফ করার প্রশ্ন অবশ্য ওঠে না, মেয়েরা যাওয়া পর্যন্তই ও কাজটা বাদ। হরিদাসী তো আগেই গেছে। এঁটো থালাটা যে অমোঘ, অনিবাৰ্য! তাই চৌবাচ্চার পাড়ের উপর থালাটা বসিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাজাপর্ব সারতে সারতে প্ৰকাশ খিঁচিয়ে ওঠে, আমার হাতে যদি সংসারের ভার থাকতো, মাগীকে কেমন যেতে দিতাম দেখতে! উনি সুদ্ধ ছুটলেন মড়ক থেকে প্ৰাণ বাঁচাতে! বন্ড দামী প্ৰাণ! লোকসান গেলে পৃথিবী একেবারে অন্ধকার হয়ে যাবে!
কথাটা সুবোধের কানে যেতে প্রতিবাদ করে উঠল সে, তা পৃথিবীর লোকসান না হোক, তার তো লোকসান রে বাপু। নিজের প্রাণ সকলেরই নিজের কাছে দামী। মড়কের ভয়ে কে না পালাচ্ছে!
ও বাবা! দাদাও যে দেখছি ভাদরবৌয়ের চ্যােলা হচ্ছে। প্ৰকাশ হেসে ওঠে, বলি এই আমরা তো রয়েছি। দিব্যি জলজ্যান্ত বেঁচেও রয়েছি। হরিদাসীর চাইতেও কিছু আর অধম নই আমরা!
আহা তা কেন? আমাদের যে প্রাণের মায়ার থেকে চাকরির মায়া অধিক, ওদের তা নয়। ওরা বলবে, আগে তো বাঁচি, তারপর দেখা যাবে কাজ! –
আচ্ছা দেখে যেন। এলে কিন্তু আমার হাতে ওর শাস্তির ভার দিতে হবে তা বলে রাখছি। দেখি কেমন করে আবার ও এ বাড়ির চৌকাঠ ডিঙোয়!
সহসা কথায় ছেদ পড়াতে হয়।
একটি বাজখাই গলা কৰ্ণ বিদারণ করে চেঁচিয়ে ওঠে, কার চৌকাঠ ডিঙানো বন্ধন হুকুম হচ্ছে রে? আমি তো এই ডিঙোলাম!
আরো জগুদা নাকি?
এরা বেরিয়ে আসে রান্নাঘর থেকে।
জগু সবিস্ময়ে বলে ওঠে, আরে, তিনটে মদতে মিলে রান্নাশালে কী করা হচ্ছে?
কী আবার করা হবে! প্ৰবোধ বীরত্বের গলায় বলে, রান্না করা হচ্ছে!
রান্না! তোরা আবার রান্না শিখলি কবে রে?
জগু হা-হা করে হেসে ওঠে আকাশ-ফাটানো গলায়, দেখি নি তো কখনো অন্দরমহলের ধারেকাছে! হ্যাঁ, সে বটে। আমি। রোধে রোধে হাড়পাকা। স্বৰ্গদপি গরীয়সীর অসুখ করলেই তো এই হতভাগার প্রমোশন! ওই ভয়ে জননী আমার রোগ অসুখ লুকিয়ে লুকিয়ে বেড়ান। আমিও তেমনি ঘুঘু, মুখচোখের বেভাব দেখলেই তেড়ে আসি। নাড়ি দেখি, জিভ দেখি, দিব্যি দিই। শেষ অবধি গাল পাড়তে পাড়তে গিয়ে কথা মুড়ি দিয়ে শোয়।
প্রভাস সকৌতুকে বলে, তা বেশ! রান্নায় ওস্তাদ তো—এখন তো স্বপাক চলছে? আচ্ছা! একদিন খেয়ে আসা যাবে তোমার হাতে।
জগু চোখ কুঁচকে বলে, কেন, এখন স্বপাক কেন? বলতে নেই। ষষ্ঠীর কৃপায় বাছা এখন আছেন ভাল।
আছেন!
অর্থাৎ শ্যামাসুন্দরী এখনো এই মড়কের কলকাতায় বিরাজমান?
এরা হৈ-চৈ করে ওঠে, মামী। এখেনেই আছেন নাকি? দেশের বাড়িতে চলে যান নি?
দেশের বাড়িতে!
জগু আর একবার আকাশ ফাটায়।
দেশের জ্ঞাতিদের সঙ্গে যে মায়ের আমার একেবারে গলায় গলায়! বলেছিল একবার মানদা পিসি, আমি যাচ্ছি। বড়বৌ, যাবি তো চ। আমি সাফ বলে দিলাম, কেন? এই হতভাগা গরীবটাকে মাতৃহীন করতে সাধা? হাতে পেলে শ্যামাসুন্দরীকে জ্যান্ত রাখবে তোমরা? মেরে পুকুরপাড়ে গুঁজে রাখবে কিনা বিশ্বাস কি?
সুবোধ আক্ষেপের গলায় বলে, ইস, তা তো জানি না। ওই মানদা মাসীই মাকে বলেছিল, আমি যাচ্ছি, বড় বৌকে সঙ্গে নিয়ে যাব। তাই জানি। ইস, এমন জানলে মামীকে তো মায়ের সঙ্গে নবদ্বীপে পাঠিয়ে দেবার ব্যবস্থা করতাম। তখন একেবারে ছুটোছুটি, হুড়োহুড়ি—
জগু হেসে ওঠে, হ্যাঁ, যমের বাড়িকে ফাঁকি দেবার তালে কত লোক কত শালার বাড়িতেই ঠেলে উঠলো। শালার বাড়ি, বোনাইয়ের বাড়ি, মামার বাড়ি, পিসির বাড়ি, গুরু-বাড়ি, বলি যমের বাড়িটা কোন বাড়িটায় নেই বল দিকি? পালিয়ে প্ৰাণ বাঁচিয়ে যমের হাত এড়াবি? সে ব্যাটা পেয়াদা
তা হলেও, এটা তোমার উচিত হয় নি জগুদা! বিপদ মেয়েছেলেকে নিয়েই! প্ৰভাস বলে, আমার এক মক্কেল নবদ্বীপেই যাচ্ছে কাল, মামীকে বরং তার সঙ্গে—
ক্ষেপেছিস? জগু সতেজে বলে, যেখানে মা, সেখানে ছা, আমার হচ্ছে এই সাদা বাংলা। দুজনে দু ঠাঁই হই, আর যম ব্যাটা দূত পাঠক, তখন? হয় মা বেটি ছেলের হাতের আগুন পাবে না, নয় ছেলে ব্যাটা মরণকালে মায়ের পায়ের ধুলো পাবে না। রক্ষে করো। জগু শৰ্মা ওসব গোলমেলে কাণ্ডর মধ্যে নেই! মা আবার মেয়েছেলে। কী রে? জগজননীর অংশ না?
তা বটে!
পাগলা জগার কথায় চিরকালই সবাই হাসে। এখনও হাসলো। বলল, তা বটে!
জগু এবার এগিয়ে এসে বলে, পাকশালের ভার তাহলে এখন তোদের ঘাড়ে? দেখি তো তিন মদীয় কী পঞ্চও-ব্যঞ্জন রোধেছিস!
দুম দুম করে রান্নাঘরে ঢুকে আসে জণ্ড, এদের একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও। রান্নার পদ যা হচ্ছে কদিন, সে তো কহন্তব্য নয়। যা কিছু আনাজ-তরকারি সবই তো সেই ভাতসেদ্ধর সঙ্গে সেদ্ধ। তাতেই তেল, নুন, কাঁচালঙ্কা মেখে যায় হয়!
আজ আবার ভাতের ফেন পড়ে রান্নাঘরের এক কিভূতকিমাকার অবস্থা। অন্যদিন তো খানিকটা জল ঢেলে দিয়ে ঘর ধোওয়া হয়। আজ যে কী হবে!
সারা ঘরেও যেন ভাত ছড়াছড়ি।
জণ্ড এসেই হৈ-হৈ করে ওঠে, কী ব্যাপার! এ যে একেবারে অন্নের বৃন্দাবন, শ্ৰীক্ষেত্রের মেলা! এত ভাত ছড়াছড়ি কেন?
ও কিছু না, ওই ফেনটা ঝরাতে গিয়েই—
হুঁ, তা তো দেখছি-ই-, জগু বলে, দৃশ্য দেখেই মালুম হচ্ছে সব। পিসি ঠাকুরুণটি যে আমার সভ্য করে ছেলে মানুষ করেছেন! আরে বাবা অনুচিন্তা সর্বত্ৰ! কখন কোথায় কী অবস্থায় পড়তে হয়! সঙ্গে স্ত্রীলোক না গেলে খেতে পাবি না?
পাব না মানে? প্ৰভাস বীরদৰ্পে বলে, এই তো আজ সাতদিন ওরা কেউ নেই, খাচ্ছি না দুবেলা?
