এই যে এক্ষুনি দিচ্ছি—, উঠে যায় সুবর্ণ।
সুবালা বলে, সাধে বলেছি বাতিক! যাকে পাবেন তাকেই বলবেন, ছেঁড়া কাপড়ের পাড় আছে? তুমি ছেঁড়া পাড় কোথায় পাবে বল তো?
পাবো পাবো, এই যে আছে গো!
সুবৰ্ণ তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে যায়, ট্রাঙ্ক খুলে আস্ত আস্ত দুখানা শাড়ি বার করে ফ্যাসফ্যাস করে তার পাড় ছিঁড়ে স্তুপাকার করতে থাকে। পাড়ের রং একটু ম্যাড়মেড়ে, সেটাই রক্ষে।
১.১৭ বড় গলায় আশ্বাস দিয়েছিল সুবোধ
বড় গলায় আশ্বাস দিয়েছিল সুবোধ তার ভাদ্রবৌকে, বামুনের ছেলে, দুটো ভাত সেদ্ধ করে নিতে পারবো না?
কিন্তু কাৰ্যক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে ব্ৰাহ্মণ-সন্তানের গৌরব অক্ষুন্ন থাকছে না। জগতের সহজতম এবং ওচতম কাজ ওই ভাত সেদ্ধটাই চার চারটে জোয়ান পুরুষকে হিমসিম খাইয়ে ছাড়ছে।
হয় অতিসেদ্ধ হয়ে পিণ্ডি পাকিয়ে বসে থাকে, ফেন ঝরানোর অবস্থা থাকে না, নয়তো অতি সাবধানে প্ৰায় চালই থেকে যায়। অথবা হয়তো জলের অঙ্কে ঘাটতি ঘটে সহসা সুগন্ধে পাড়া আমোদিত করে তোলে। তা ছাড়া ফেন ঝরাতে আঙুলের ডগায় ছোটখাটো ফোস্কা চারজনেরই হয়েছে। কুর একজনের অপটুতায় ব্যঙ্গহাসি হেসে অপরজন হাত লাগাতে এসেছে কিনা!
আনুষঙ্গিক ব্যাপার উনুন ধরানোও সোজা কাজ নয়। হয়তো বা তুল্যমূল্য। উনুনের ভিতরদিকে যুঁটে পেতে পেতে আগুন জ্বেলে দিয়ে তার উপর কয়লা ঢেলে দিতে হয়, এ পদ্ধতিটা অবিদিত কারুরই নেই! গেরস্থের ছেলে, মা চিরকাল খেটেছে, ওরা আশেপাশে ঘুরেছে।
কিন্তু সেই জানা জগতের কাজটা যে হাতে-কলমে করতে গিয়ে এমন রহস্যময় হয়ে উঠবে এটা কে জানতো?
পদ্ধতিমত কাজ হয়, কিছুক্ষণের মত বাড়িটা ধূম্রলোকে পরিণত হয়, কিন্তু সেই ধূমজাল থেকে মুক্ত হয়েই দেখা যায় ধূমের পিছনে বহ্নি নেই। কেন যে এমনটা হয় সেটা দুর্বোধ্য! ওই একই পদ্ধতিতেই তো আবার জ্বলেও শেষ পর্যন্ত! বার তিন-চার ধোঁয়া খেয়ে খেয়ে শেষ অবধি আগুনের দেখা মেলে।
কাজ দুটো যে এমন গোলমেলে, তা তো কই মনে হতো না কোনোদিন? বরং চোখে একটু ধোঁয়া লাগলেই রাগারগি করা হয়েছে, এত ধোয়া কেন? রান্নাঘরের দরজা বন্ধ করে রাখা হচ্ছে না কেন?
মুখরা হরিদাসী বলতো, চুলোয় আগুন দিলে ধোঁয়া হবে না তো কি পুষ্পবৃষ্টি হবে দাদাবাবুরা? আপনারা বোঠকখানা ঘর থেকে তেরিমেরি করছে, অথচ বৌদিরা ওই ধোয়ার মধ্যে বসে কুটনোবাটনা করছে। কই তারা তো কিছু বলছে না!
হরিদাসীর এই দুঃসাহসিকতার উপর মুক্তকেশীর ধমক এসে পড়তে, তুই থাম তো হরিদাসী! কাদের সঙ্গে কাদের তুলনা? বৌদিরা ধোঁয়ায় বসে আছে বলে দাদাবাবুরাও থাকবে তাই? বলি পায়ে মাথায় এক হবে?
হরিদাসী মুক্তকেশীকেও ছেড়ে কথা কইত না, বেজার গলায় বলতো, জানি নে মা, কে পা, কে মাথা! আর মাথাটাই দামী, পা-টাই সস্তা, তাই বা কেন, তোমরাই জানো সে-কথা। পায়ের ওপরই তো দাঁড়ায় মাথাটা। আর আমরা তো পায়ের তলা, তবু তো আমাদের নইলে তোমাদের দিন চলে না দেখি। ভগবান সকল মনিষ্যির শরীল একই বস্তু দিয়ে তৈরি করেছে, সেই কথাই কইছি।
তা কইবি বৈকি, মেজবৌদির সাকরেদ যে! ব্রাতদিন তো ওই সব কথার চাষ করছেন মাজননী! বলে থামতেন মুক্তকেশী। কারণ জানেন। হরিদাসীর মতন পরিষ্কার কাজ শয়ে একটা মেলে কি না মেলে। ওকে বেশি চটানো চলবে না।
ওখানে চুপ করে এখানে ছেলেদের কাছে এসে অভিযোগ করতেন মুক্তকেশী, দেখছিস তো মাগীর চ্যাটাং চ্যাটাং কথা! মেজবৌমাই এইটি করছেন। অনবরত ওদের সামনে গাওয়া—গরীবরা কি মানুষ নয়?… ছোটলোক কথাটা কারুর গায়ে লেখা থাকে না, ব্যাভারেই ছোটলোক ভদরলোক! … মাইনে দিয়ে রাখা হয়েছে বলেই কি আমরা ওর মাথা কিনে নিয়েছি? ও কাজ দিচ্ছে। আমরা পয়সা দিচ্ছি, হয়ে গেল শোধবোধ।… এতে আর ছোটলোকের মাথা বিগড়োবে না?
ছেলেরা বলতো, বিদেয় করে দাও না মাগীকে। ঝি আর মিলবে না। কলকাতা শহরে?
মুক্তকেশী ভিতরের রহস্য ব্যক্ত করতেন না, বলতেন, না, অমনটি আর সহজে মিলবে না। বলতেন, যে আসবে লঙ্কায়, সেই হবে রাক্ষোস! মেজবৌমা হয়তো আবার তাকে নিয়ে পাঠশালা। খুলবে। এই তো শুনি নিত্যি বলছে, হরিদাসী, তোর ছেলেটাকে এই বয়সেই পানের দোকানে কাজ করতে দিয়েছিস? কেন, একটু লেখাপড়া শেখাতে হয় না? আমাদের এখানে আনিস না সন্ধ্যেবেলা ছেলে।পুলের কাছে বসে থাকবে, পড়া শুনে শুনেও শিখবে একটু!
এ কথা শুনে হেসে উঠেছে। ওরা হা হা করে। হরিদাসীর ছেলের লেখাপড়ার ভাবনায় মেজাগিনীর আমাদের ঘুম হচ্ছে না! ভাল ভাল। কী বলবো, ওই মেয়ে লেখাপড়া করলে নিৰ্ঘাত মামলা এঁটে কাছারি যেত।… তবে হরিদাসীর যে রকম বোলচাল ফুটছে, তাতে ওকে ছাড়িয়ে দেওয়াই দরকার। এর ওপর আবার নাকি স্বদেশীবাবু-দের চ্যােলা হচ্ছেন। বিদেয় কর, বিদেয় কর।
কিন্তু এখন মুক্তকেশীর ছেলেরা কাতর আক্ষেপে বলছে, হরিদাসীটা সুদ্ধ ভাগলো! ওটা থাকলে তো এমন ঝঞাটে পড়তে হত না!
প্রকাশ-ই বেশি খাপ্পা, কারণ ঐটা বাসন মাজার দায়টা পড়েছে সম্পূর্ণ তারই ঘাড়ে। সে ছোট, তারই এটা কর্তব্য। বড়রা তো আর ছোেটর এঁটো সাফ করবে না! আবার সুবোধ যে প্রস্তাবটা করেছিল, যে যার নিজ নিজ থালা সাফ করে নেবার, তাতে রাজী হতেও চক্ষুলজ্জায় বাধে।
অতএব প্ৰকাশের কষ্ট বেশি।
ভাত সেদ্ধ এবং চুলো ধরানো ব্যাপারে প্রত্যেকেই প্রত্যেককে নস্যাৎ করতে এসে নিজে নস্যাৎ হয়েছে। এখন সকলেই একযোগে রান্নাঘরে এসে হুটোেপাটি করে, প্ৰকাশকে আবার উঠোনেও নামতে হয়।
