সুবোধ হাসে, অতি মানে? ভগবান ক ঘণ্টা দিবালোক দিয়েছে, আর ক ঘণ্টা অন্ধকার সে হিসেব করা?
তুমি কর! বলে প্ৰভাস।
প্রভাসের কথাবার্তার ধরনই ওই।
গুরুজনের সঙ্গে বাক্যালাপে যে নম্রতার নীতি বলবৎ আছে, প্ৰভাস সেটা কদাচিৎ মানে। প্ৰভাসকেই সকলে সমীহ করবে। এই নীতিই চালু হয়ে গেছে সংসারে।
এমন কি মুক্তকেশীও তার উকিল-ছেলেকে রীতিমত সমীহ করছেন, ওর বৌয়ের দোষের দিকে দৃষ্টিক্ষেপটা কম করছেন, এবং ছেলেকে প্রায়শই তুমি করে কথা বলছেন।
প্রভাস যদি তাস খেলার বিরোধী হতো, নিৰ্ঘাত বাড়িতে তাসের আড্ডা বসবার স্বপ্ন কেউ দেখত না। কিন্তু প্ৰভাসই এ যজ্ঞের হোতা! অতএব আড্ডা ক্রমশই আয়তনে বাড়ছে, দর্শক-বন্ধুর সংখ্যা বৃদ্ধি হচ্ছে।
ছুটির দিনে পূর্ণিমার জোয়ার।
তবে অন্য দিনেও কম নয়।
প্ৰবোধ যখন ঘোড়ার গাড়ি করে মেজবৌকে নির্বাসন দিতে গেল, তখন প্ৰভাস বন্ধুদের মধ্যে থেকে খেলোয়াড় নির্বাচন করে বাজার বজায় রেখেছিল। তার মধ্যে যথারীতি পান দু ডাবর শেষ হয়েছে। রাতও প্রহর হয় হয়।
প্ৰবোধ বৌকে পৌঁছে দিয়ে এসে মার কাছ থেকে ঘুরে সবে জুৎ করে বসেছে।
এমন সময় দরজায় গাড়ি থামার শব্দ। বিতাড়িত হয়ে তাড়িত আবার ফিরে এসেছে।
কিন্তু দর্জিপাড়ার গলির মধ্যেকার এই রুদ্ধ কপাটের ভিতর পিঠে প্ৰবেশ-অধিকার কি সহজে মেলেছিল সুবৰ্ণর?
মেলে নি।
মাতৃভক্ত ছেলে প্ৰবোধ সদ্য জমে-ওঠা খেলায় জল ঢেলে শ্বশুরের সামনে এসে দরজা আটকে দাঁড়িয়ে ঘাড় গুঁজে ঘোৎ ঘোৎ করে বলেছিল, না, এমনি ঢুকে পড়া চলবে না, আমার সাফ কথা, আমার মায়ের পায়ে ধরে মাপ চাইতে হবে।
খেলা ফেলে প্ৰভাসও উঠে এসে বলেছিল, তালুইমশাই কি মেয়েকে এক সন্ধ্যেও দুটি খেতে দিতে পারলেন না?
পারলাম নাই বলতে হবে–, বলে গাড়িতে গিয়ে উঠেছিলেন নবকুমার।
ক্ষুব্ধ ক্ৰন্দন-বিজড়িত সেই কণ্ঠস্বর ভিতরের ইতিহাসের আভাস প্রকাশ করল।
সুবৰ্ণ খায় নি। জলটুকু পর্যন্ত না।
গাড়িতে ওঠার সময়ে বলেছিল, কী দরকার বাবা? দর্জিপাড়ার সেই গলিটাতে যদি আবার গিয়ে ঢুকতেই হয়, তাদের হাঁড়ির অন্ন খেতেই হয়, তবে আর একবেলার জন্যে জাত নষ্ট করি কেন?
সৌদামিনী গালে হাত দিয়ে বলেছিলেন, তুই যে দেখি তোর মায়ের ওপর গেছিস সুবৰ্ণ, বাপের ঘরে খেলে তোর জাত যাবে?
সময় বিশেষে তাও যায় বৈকি পিসিমা।… যাক গে বাবা, গাড়ি একখানা ডাকো, বেশি রাত হবার আগেই পৌঁছে দিয়ে এসো। অনেক কষ্ট তোমাকে পেতে হল। এই যা!
তা দরজা আটকানোর নাটকটা পাড়ার লোকে দেখেছিল বৈকি।
যারা তাস খেলছিল তারা, যারা আশেপাশের জানলায় মুখ দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল তারা। আর নিজ নিজ বাড়ির সামনের রোয়াকে যারা বসে ছিল গা খুলে, বাড়ির বাচ্চা মেয়েদের একটা পাঁচ–ছ হাতি শাড়ি পর, তারা তো বটেই।
শেষ পর্যন্ত সে নাটকে যবনিকাঁপাত করলেন স্বয়ং মুক্তকেশীর তো আর এখন আব্রুর বালাই নেই, তাই দরজার কাছে এসে বলেছিলেন, দোর ছাড় পেবো, লোক হাসাস নে। মেজবৌমা, যাও বাছা বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়ো, আর কেলেঙ্কারী বাড়িও না।
না, সেদিন আর মুখে মুখে চোপা করে নি। সুবর্ণ। বলে নি, কেলেঙ্কারিটি তো ঘটালেন আপনিই!
সুবৰ্ণ শুধু ভিতরে ঢুকে গিয়েছিল।
বাবার দিকে আর তাকায় নি।
মুক্তকেশী উদাত্ত গলায় বলেছিলেন, কত ভাগ্যে বেয়াইয়ের পায়ের ধুলো পড়ল, দোর থেকে ফিরে যাবেন বেয়াইমশাই? একটু জল খেয়ে যেতে হবে—।
আজ থাক, আজ থাক। বলে বোধ করি চোখের জল চাপতে চাপতেই গাড়িকে চালাতে বলেছিলেন নবকুমার।
খেলাটাই মাটি হল আজ, যত সব ঝামেলা— বলে প্ৰভাস ফের গিয়ে তাস ভাঁজতে বসলো, চক্ষুলজার দায়ে অগত্যা প্ৰবোধও।
মনের মধ্যে একটা আহ্লাদের ঢেউ বইছিল বৈকি।
ঝোঁকের মাথায়, আর স্ত্ৰৈণ অপবাদ ঘোচাতে, করে বসেছিল কাজটা, মনের মধ্যে তো বিছে কামডাচ্ছিল!
ԳO
যে সাংঘাতিক সিংহরাশি মেয়েমানুষ, কে বলতে পারে এ বিচ্ছেদ সত্যিই চিরবিচ্ছেদ হল। কিনা! তেমন কাণ্ড ঘটলে কতদূর জল গড়াতো কে জানে? দ্বিতীয় পক্ষ এসে কি আর ভানুকানুকে দেখতো? না চাঁপার সঙ্গে বনিয়ে থাকতো?
সে দুর্ভাবনা গেল।
এখন মান-ভাঙানোর খাটুনি।
রাতটা ওতেই যাবে আর কি!
কিন্তু সে রাতটা কি ওতেই গিয়েছিল প্ৰবোধের?
সেই রাত্রের মধ্যভাগে ভয়ানক একটা শোরগোল ওঠে নি বাড়িতে?
হ্যাঁ, ভয়ানক শোরগোলই উঠেছিল সুবর্ণর শাশুড়ীর আফিমের কৌটো চুরি করে মুক্তি পাবার হাস্যকর প্রচেষ্টায়।
হলো না কিছুই, হলো শুধু ধাষ্টিামো। তবুও কেলেঙ্কারিটা তো হলো। ডাক্তার আনতে হলো সেই মাঝরাত্তিরে, আর থানা-পুলিশের ভয়ে ডাক্তারকে দর্শনীর ওপর আবার ঘুষ দিতে হলো। যদিও গেলাস গেলাস নুনজল খাওয়ানো ছাড়া আর কিছুই করলো না ডাক্তার।
সে নির্লজ্জ খৃষ্টতার প্রসঙ্গে জীবনভোর অনেক লাঞ্ছনা-গঞ্জনা খেতে হয়েছে সুবৰ্ণাকে।
এমন কি যে ভাসুর কখনো কিছু বলে না, সে পর্যন্ত বলেছে, বস্তা বস্তা নাটক নভেল পড়ে এইটি হয়েছে আর কি!
তা সত্যিই হয়তো পড়েছে সুবর্ণ, বস্তা বস্তাই পড়েছে। সেই বস্তা বস্তার কল্যাণে বস্তা বস্তা কথাও হয়তো শিখেছে, কিন্তু আফিমের মাত্ৰাটা কতখানি হলে সেটা ধাষ্টামো না হয়ে মুক্তিফলপ্ৰসূ হয়, সে কথা শেখে নি!
তা যদি শিখতে পারতো, তা হলে সুবৰ্ণলতার জীবন-নাট্যে সেখানেই যবনিকা পড়ে যেত।
বিয়ের মাত্রা সম্পর্কে কোনো দিন কোনো জ্ঞানই যদি থাকতো সুবৰ্ণলতার! কিন্তু ওকথা থাক। এখন প্ৰবোধচন্দ্র আর সুবৰ্ণলতার যে বৃহৎ ফটোগ্রাফ দুখানা মুখোমুখি টাঙানো রয়েছে ওদের বড় ছেলের ঘরে, তাদের বেষ্টন করে ফুলের মালা দুলছে।
