গায়ে লম্বা কালো চাপিকান, গলায় পাকানো চাদর, পরনে ধুতি, পায়ে জুতো মোজা, যথারীতি উকিলবাবুর সাজে বাড়ি ফিরলো সাধন শেয়ারের ঘোড়ার গাড়ি করে। মোড়ের মাথায় নামে, গাড়ি অন্যদিকে ঘুরে চলে যায়।
নিত্য অভ্যাসমতই নেমে পড়েই বাড়ির দিকে তাকিয়ে নিল একবার, আর তাকিয়ে দেখার সঙ্গে সঙ্গে ভুরুটা কুঁচকে এল। তার।
ছাতে দাঁড়িয়ে কে??
আলসে থেকে অনেকটা উঁচু তে মুখ, ঘোমটা খোলা মাথা মনে হচ্ছে, এলো চুল!
সুধীরবালা?
সুধীরবালা কি অতটা লম্বা, অতটা ফর্সা?
তা ছাড়া সুধীরবালা এ সময় হাওয়া খেতে যাবে?
কেউ বেড়াতে এসেছে তা হলো!
কিন্তু কে?
বেজার মুখে বসে আছে।
অবাক হল সুবর্ণর দাদা সাধন।
কেউ যদি বেড়াতে আসবে, সুধীরবালা কেন এখানে এমন প্যাচামুখে?
বললো, ছাতে কে? আলসে ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে মনে হলো, মাথার ঘোমটা খোলা, চুল খোলা–
ঘোমটা খোলা!
চুল খোলা!
সুধীরবালার বুকটা কেঁপে ওঠে।
এ কী কথা!
পাগল নয় তো? নাকি হঠাৎ পাগল হয়ে গেছে? তাই! তাই হয়তো শ্বশুরবাড়ির লোক ফেলে দিয়ে পালিয়ে গেছে। কী হবে!
সাধন আর একবার প্রশ্ন করলো, বল, কি? কে এসেছে?
সুধীরবালা নিঃশ্বাস ফেলে মৃদু গলায় বলে, কে এসেছে পরে শুনো।
পরে শুনবো? তার মানে?
পরে শুনোটা তো ছিল! খবরটা স্বামীর কর্ণগোচর করবার জন্যে তো মরছিল! তবে লজ্জা?
তাই যেন না বললে নয়, এইভাবে বলে সুধীরবালা, এসেছে তোমাদের বোন।
বোন! বোন মানে? কোন বোন?
সাধন গলা থেকে চাদরটা নামিয়ে আলনায় রাখতে ভুলে গিয়ে হাতে করে ধরেই বলে, কোন বোন?
সাধনের কণ্ঠস্বর থেকে বিস্ময় যেন ঝরে ঝরে পড়ে—।
সুধীরবালাও চালাক মেয়ে, রয়ে-বসে পরিবেশন করে। বলে, বোন আর তোমাদের কটা আছে? একটাই তো বোন! সেই বোন।
সেই বোন! মানে সুবৰ্ণ?
হুঁ।
সাধনও বহুদিন অদেখা সেই বোনের আগমন-সংবাদে আনন্দিত না হয়ে ভীতই হয়। শঙ্কিত গলায় বলে, হঠাৎ এভাবে আসার কারণ?
কারণ! সুধীরবালা গলা খাটো করে বলে, কারণ কী করে জানবো? এসেই তো ঠরঠরিয়ে ছাতে উঠেছে!
বাবা নেই?
আছেন। মানে মেয়েকে দেখে তবে গেছেন!
দেখে তবে গেছেন? কোথায় গেছেন?
জানি না। বোধ হয় পিসিমার বাড়ি। দেখামাত্ৰই তো ছুটলেন।
সাধন বিরক্ত হলো।
বললো, বাবার তো কেবল ওই!
সাধন চিন্তিত হলো।
বললো, এলো কার সঙ্গে?
জানি না। চক্ষে দেখলাম না। তাকে। দরজা থেকে ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে।
হুঁ, গণ্ডগোল একটি বাধিয়েছেন আর কি! তা এসেই ছাতে উঠল যে?
ভগবান জানেন। সাতবার বলছি হাত-মুখ ধোও, তা নয়, ছাতে যাব!
অন্ন কোথায়? ডেকে আনতে বল—
অন্নও তো পিছু পিছু ছাতে উঠেছে। বললাম। কিনা, পিসি হয়।
ডাকো ডাকো! কি জানি মাথার দোষ হয়েছে কিনা!
কে ডাকবে?
তুমি চেঁচাও, আমি আর সিঁড়ি ভাঙতে পারব না।
পিসি! পিসির সঙ্গে কী এত কথা!
অপছন্দ ভাব দেখায় সাধন।
কিন্তু সাধনের মেয়ে হঠাৎ ভারি পছন্দ করে ফেললো পিসিকে।
আস্তে আস্তে গায়ে হাত দিয়ে বলেছে, তুমি পিসি?
তারপর কেমন করে না-জানি ভোব উঠেছে জমে। সুবৰ্ণকে সে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করছে আর সুবর্ণ উত্তর দিচ্ছে।
হয়তো এমনিই একটা কিছু চাইছিল সুবর্ণ। বলতে চাইছিল নিজের কথাগুলো।
এই শিশুচিত্তের কৌতূহলের সামনে সেই বক্তব্য সহজ হলো।
অন্ন বলছে, এই বাড়িতে যদি জনেছ তুমি তো এখানে থাক না কেন?
এরা তাড়িয়ে দিয়েছে। শ্বশুরবাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে।
আবার তবে এলে কেন?
আবার শ্বশুরবাড়িরাও তাড়িয়ে দিল।
তোমায় কেবল সবাই তাড়িয়ে দিল।
তাই তো দিচ্ছে।
কেন? তুমি তো খুব সুন্দর!
তাতে কি! সুন্দরের ওপরই তো পৃথিবীর রাগ!
য্যাঃ!
দেখিস বড় হয়ে!
অন্ন নিজের হাতটা পিসির হাতের উপর রেখে বলে, আমি কালো!
না না, তুমি ভালো।
ঠাকুরদা বলে, তুই বিচ্ছিরি, বোকা। তোর পিসি ছিল বুদ্ধির রাজা!
কে বলে এ কথা? কে বলে?
অন্ন পিসির এই আকস্মিক উত্তেজনায় থতমত খেয়ে বলে, ঠাকুরদা! তোমার বাবা!
তোর ঠাকুরদা আমার বাবা হয়, জানিস এ কথা?
ওমা— অন্ন গিন্নীর মত বলে, তা জানবো না! ও বাড়ির ঠাকুমা বলে দেয় নি বুঝি! আচ্ছা, তোমার বর নেই?
বর! আছে বৈকি—
নীচের তলায় তখন পিতাপুত্র গুপ্ত পরামর্শ চলছে।
না, সৌদামিনী তৎক্ষণাৎ আসতে পারেন নি, তার হঠাৎ বাত চেগেছে। কোমর নিয়ে উঠতে দেরি। বলেছেন, তুই যা আমি যাচ্ছি।
সাধন অবশ্য পিসির জন্যে অপেক্ষা করছিল না, অপেক্ষা করছিল বাপের জন্যে। বলল, তুমি কিছু জিজ্ঞেস না করেই চলে গেলে ওবাড়ি!
নবকুমার নিজেকে সমর্থন করেন, জিজ্ঞেস করবার আর কী আছে? বুঝতেই তো পারলাম ভুঞ্জ এসেছেন একটা কিছু। ঝাড়ের বাঁশের গুণ যাবে কোথায়? হয়ে উঠেছেন একখানি অনুমান করছি!
সুবৰ্ণ এ বাড়িতে দুর্লভ ছিল, সুবর্ণ যেন একটু বিষণ্ণতার আধারে ভরা একখণ্ড পরম মূল্যবান রত্ব ছিল, কিন্তু সহসা সুবৰ্ণর দাম কমে গেল।
বিতাড়িত হয়ে আশ্রয় নিতে এসে সুবৰ্ণ সব মূল্য হারালো।
সুবৰ্ণ বিপদের মূর্তি হলো।
সুবৰ্ণকে ছাত থেকে ডেকে পাঠিয়ে নবকুমার প্রশ্ন করলেন, হঠাৎ এরকম চলে এলি যে?
সুবৰ্ণ মুখ তুলে বাপের দিকে একবার তাকিয়ে শান্ত স্বরে বললো, চলে তো আসি নি, ওরা তাড়িয়ে দিয়েছে!
সাধন বিরক্তকণ্ঠে বলে, তাড়িয়ে আমনি দিলেই হলো?
সুবৰ্ণলতা স্থিরভাবে বলে, হলো তো দেখলাম। সহজেই হলো। বললো-ছেলেরা আমাদের বংশধর, ওরা আমাদের কাছে থাক, তুমি তোমার মেয়ে নিয়ে বাপের বাড়ি থাকো গে। আমি বললাম, সবাই থাক। মেয়েও তোমাদেরই।
