বকুলের বুড়ো মাস্টার মশাইয়ের সঙ্গে তো দিব্বি কথাবার্তা শুরু করে দিয়ে মেয়ের পড়ার তত্ত্ববার্তা নিচ্ছিল, আবার তাকে ধরেই আলাদা এক অঙ্কর মাস্টার রাখিয়েছে, বছরের মধ্যেই মেয়েকে এস্ট্রেস একজামিন দেওয়াবে বলে।
ভানু আর ভানুর বৌ হাসে আড়ালে।
বলে, মা তার ছোট কন্যাটিকে গাগী মৈত্ৰেয়ী লীলাবতী না করে ছাড়বেন না!
কানু আর কানুর বৌ হাসে আর বলে, এ হচ্ছে সেই দাদার বন্ধুর বোনের ওপর আক্রোশ!
আর কানুর বৌ আর ভানুর বৌ বলে, মার দেখছি মন্ত্রের সাধন শরীর পাতন। মেয়েকে জলপানি না নিইয়ে ছাড়বেন না। তবে কিনা কথায় আছে, হিংসেয় সব করতে পারে— বাঁজা পুত বিয়োতে নারে। মগজে ঘি থাকলে তবে তো জলপানি!
ধরে নেয় নেই ঘি।
কিন্তু ওরাই কি পরম পাপে পাপী? সংসার তো এই নিয়মেই চলে।
বহির্দৃশ্য নিয়েই তো তার কারবার। কে কি করছে, সেটাই দেখে লোকে। কেন করছে তা কি অত দেখতে যায়? দেখতে যায় না, তাই নিজেদের হিসেব অনুযায়ী একটা কারণ নির্ণয় করে নিয়ে সমালোচনার স্রোত বহায়!
সুবৰ্ণর এই ব্যবহারটা হিংসুটে মনের আক্রোশের মতই তো দেখাচ্ছিল।
আবার মানুর বিয়েতে বেশি উৎসাহ দেখলেও নিৰ্ঘাত লোকে বলবে, বেশি রোজগেরে আর দূরে-থাকা ছেলে কিনা! জগতের রীতিই তো বাইরের জামাই মধুসূদন ঘরের জামাই মোধো।
এ ছেলে বাইরে আছে, নগদ টাকা পাঠাচ্ছে, অতএব মানু দামী ছেলে।
তবে দামী বৌ হচ্ছে না। এই যা।
এ কথা জনে জনে বলছে।
চাঁপা তো গাড়িভাড়া করে এসে বলে গেল, রূপ নিয়ে কি ধুয়ে জল খাবে মা? মেয়ে তো শুনছি ডোমের চুপড়ি-ধোয়া! মানুর মতন দামী ছেলেকে তুমি কানাকড়িতে বিকিয়ে দেবে? অথচ আমার পিসশ্বশুর অত সাধ্যসাধনা করলেন, তখন গা করলে না তুমি। উনি মেয়েকে মেয়ের ওজনে সোনা দিতেন, তার ওপর খাট-বিছানা, আশি, আলনা, ছেলের সোনার ঘড়ি, ঘড়ির চেন, হীরের আংটি, সোনার বোতাম–
সুবৰ্ণ হঠাৎ খুব জোরে হেসে উঠেছিল।
বলেছিল, তা হলে তো স্যাকরার দোকানের সঙ্গে বিয়ে দিলে আরো ভালো হয় রে চাপা!
চাঁপার ওই জমিদার পিসশ্বশুর সম্পর্কে সমীহর শেষ নেই, তাই চাপা রাগ করে উঠে যায়।
সুবৰ্ণ ভাবে, জঞ্জালের বোঝাকে এত বেশি মূল্য দেয় কেন মানুষ? সুবর্ণ ভাবে চাপাটা চিরকেলে মুখু!
তা হয়তো সত্যি। মুখ্যু চাপা মুখ্যুর মত কথা বলেছে।
কিন্তু মানু?
মানু তো মুখ্যু নয়?
মানু তো বিদ্যের জোরেই তিন-তিনশো টাকা মাইনের চাকরি করছে।
সে তবে এমন চিঠি লেখে কেন?
মানুর চিঠির ভাষা কৌতুকের। তবে বক্তব্যটা অভিন্ন। সেও বলেছে, এযুগে রূপের চেয়ে রূপোর আদর বেশি। তা ছাড়া হাড়দুঃখী বিধবার মেয়ে বিয়ে করে চিরকাল যে তাদের টানতে হবে। তাতে সন্দেহ নাস্তি। কাজ কি বাবা অন্ত ঝামেলায়। বরং নিজেরই এখন নগদ কিছু টাকা হাতে পেলে ভাল হয় তার। একটা ভাল চাকরির সন্ধান পেয়েছে, দিল্লী-সিমলের কাজ–ভবিষ্যতের আশা আছে, তবে নগদ পাঁচটি হাজাবি জমা দিতে হবে।
অতএব এই বিয়েটাকেই তাক করে আছে মানু ওই টাকার সুরাহার ব্যাপারে। তা সে সুরাহার মুখও একটু দেখা যাচ্ছে। বর্তমান অফিসের বড়কর্তার নাকি তাকে জামাই করে ফেলবার দারুণ ইচ্ছে এবং সেই ইচ্ছের খাতে ওই টাকাটি দিতে পারেন। অবশ্য বিয়ের আনুষঙ্গিক দান-সামগ্ৰী, বরাভরণ, মেয়ের গহনা ইত্যাদিতে কিছু ঘাটতি হতে পারে, কিন্তু কি লাভ কতগুলো জঞ্জালের স্তূপে?
জঞ্জালের স্তপ!
তো বলেছে তার ছেলে, তবে আর আমন সাপে-খাওয়ার মত স্তব্ধ হবার কি আছে সুবৰ্ণলতার?
ছুটি নিয়ে এল মানু বিয়ে করতে। বড়কর্তার স্ত্রীপুত্র পরিবার সবই কলকাতায়। সত্যিই তাঁয়া জঞ্জালটা বেশি দিলেন না। তবে ঘটা-পটার ত্রুটি হলো না। এ পক্ষেও হলো না। বড়লোকের বাড়ি বিয়ে হচ্ছে বলে মানরক্ষার ব্যাপারে তৎপর হলো মানুর বাপ-ভাই।
সানাই বাজলো তিন দিন ধরে, আলো জ্বললো অনেক, অ্যাসিটিলিন গ্যাসের লাইন চললো বরের সঙ্গে সঙ্গে, এদিকে ছাদ জুড়ে হোগলা ছাওয়া হলো, এটো গেলাস কলাপাতায় ফুটপাথ ভর্তি হয়ে গেল, কাকেরা আর কুকুরেরা সমারোহের ভোজ খেয়ে নিশ্চয় শতমুখে আশীৰ্বাদ করলো।
চাঁপা-চন্নন তো কাছের মেয়ে এলোই, দূরের মেয়ে পারুলও এলো।
আর মায়ের সঙ্গে প্রথম দেখা হতেই চমকে উঠলো। সে, এ কী চেহারা হয়েছে মা তোমার?
তারপর গল্পপ্রসঙ্গে বললো, বেশ করছে। ওকে লেখাপড়ায় এগোচ্ছে। বিদ্যোটা করে ফেলতে পারলে তবে তো এ প্রশ্ন তোলা যাবে–মেয়েমানুষই বা চাকরি করবে না কেন? মেয়েমানুষেরই বা চিরকুমারী থাকতে ইচ্ছে করলে সে ইচ্ছে পূরণ হবে না কেন? বলা যাবে–মেয়েদেরই বিয়ে না। হলে জাত যায়, পুরুষের যায় না, এ শাস্ত্ৰটা গড়লো কে?
তারপর বকুলের সঙ্গে একান্তে দেখা হলে হেসে বললে, প্রেমের ব্যাপারে কতদূর এগোলি?
বকুল বললো, আঃ সেজদি!
আঃ কেন বাবু! তবু একজনেরও যদি জীবনে কোন নতুন ঘটনা ঘটে, দেখে বাঁচি।
খুব কবিতা লিখছিস বুঝি আজকাল? বকুল অনেক দিন পরে সেজদিকে পেয়ে মনের দরজা খুলে যায় যেন তার। কতদিন একটু সরস কথার মুখ দেখে নি। তাই হেসে হেসে বলে, প্রেমের কবিতা? তাই এত ইয়ে—
পারুল একটু চুপ করে থাকে, তারপরে বলে, নাঃ, কবিতা আর লিখি না।
লিখিস না? মূর্তিমান কাব্যতেই একেবারে নিমগ্ন হয়ে আছিস?
তাই আছি।
পারুলের মুখে কৃষ্ণপক্ষের জ্যোৎস্নার মত একটা স্নান হাসির আভা।
