সিদ্ধার্থ যার প্রতিষ্ঠাতাদের একজন।
অলকও অবশ্য।
আর সুমনা লাইফ-মেম্বার।
ওইখানেই প্রায় রোজ একবার করে দেখা হয় ওদের।
সুমনার চোখে ভেসে ওঠে পাঠাগারের সেই দোতলার ঘরের সামনের বারান্দাটি। যেখানে তারা শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করে কাটিয়ে দেয়।
মানে কাটিয়ে দিত।
.
সুমনাদের পরিবার রক্ষণশীল।
মেয়েকে এম. এ., বি. এ. পড়তে দিলেও যথেচ্ছ গতিবিধির সুবিধে দিতে নারাজ তাঁরা। কলেজে যাচ্ছে যাক, তা বলে একা একা অর্থাৎ বাড়ির লোকেদের সঙ্গে ভিন্ন যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়াবে, এত আহ্লাদ দেবার কিছু নেই। পড়তে দেওয়া হচ্ছে, এই ঢের।
কান্তিকুমার অবশ্য ঠিক এ মতাবলম্বী নন, কিন্তু পরিবার সম্পর্কে নিতান্ত মমতাশীল তিনি। যে কাজে মায়ের অসন্তোষ, দাদা বউদির বিরক্তি, ছোটভাইয়ের বিরুদ্ধতা, তেমন কাজ তিনি জোর করে করতে কুণ্ঠিত হন। তাই সুমনা স্কুলের গণ্ডি পার হলে বলেছিলেন, বেশ তো পড়ুক না, প্রাইভেট পড়ুক। মার যখন অমত–
সুজাতাই চারদিক থেকে বাঁধ দিয়ে দিয়ে ঠেকিয়েছে। কান্তিকুমারকে বুঝিয়েছে মার তো অন্য অমত কিছু নেই, শুধু বলছিলেন এবার বিয়ের চেষ্টা করতে। তা যতদিন না বিয়ের কিছু ঠিক হচ্ছে শুধু শুধু বসে থাকবে কেন? যেমন স্কুলে যাচ্ছিল তেমনি যাবে। বাড়ির গাড়িতে যাবে-আসবে–
আর শাশুড়ি-জা এবং তাঁদের মারফত ভাশুর দেওরকে বুঝিয়েছে, মেয়েটার একান্ত ঝোঁক, আর তার বাপেরও বড্ড ইচ্ছে যে, পড়াটা চালিয়ে যায়। শুধু বলতে সাহস পাচ্ছে না
শুধু বলতে সাহস পাচ্ছে না!
কান্তিকুমারের মতন মানী মানুষটা সংসারের এই লোকগুলোর কাছে নিজের ইচ্ছেটা প্রকাশ করতে পারছে না! এটা বড় সন্তোষজন। এর জন্যে কিছুটা নরম হওয়া যায়।
অতএব ব্যবস্থা হয়ে গেল একরকম করে।
অবিশ্যি কলেজে পড়তে পড়তে নিয়মের কড়াকড়ি কিছুটা শিথিল হয়ে এসেছিল। প্রফেসরের বাড়ি, সহপাঠিনীর বাড়ি, কি বইয়ের দোকানে আর পাড়ার লাইব্রেরিতে একা যাবার ছাড়পত্র মিলত, কিন্তু পাড়ার ছেলের সঙ্গে অবাধ মেলামেশার সুযোগ পাওয়া কঠিন ছিল।
তাই একত্রিত হবার জায়গা ছিল ওই লাইব্রেরিটাই। এক ভদ্রলোক তাঁর বিরাট বাড়ির একাংশে দোতলার দুখানি ঘর ও একটু বারান্দা উৎসর্গ করেছিলেন পাঠাগারকে। ঘরে সকলের পা পড়ত, পিছনের বারান্দাটা থাকত নিরালা।
সুমনার জেঠি কণ্ঠে মধু ঢেলে বলতেন, সন্ধেভর কোথায় ছিলি সুমু? তোর ঠাকুমা কত ডাকাডাকি করছিলেন।
সুমনা হেসে উঠে বলত,কেন, দিদার আবার এ দুর্মতি কেন? ভগবানকে না ডেকে আমায় ডাকাডাকি!
জেঠি বলতেন, তুই নইলে এই কুচো কাঁচাগুলোর দস্যিবৃত্তি যে কেউ থামাতে পারে না বাছা। তাই ডাকাডাকি। তা ছিলি কোথায়?
সুমনা পাশ কাটাত। বলত, কোথায় আর, লাইব্রেরিতে তো। মাকে বলে গেলাম যে।
সুজাতা বলতো, বই কি ওখানে বসে বসে পড়িস, কেন, নিয়ে এসে পড়তে পারিস না?
সুমনা মিছিমিছি একটা ঝংকার দিয়ে বলত, আর বোলো না। যা না সব ছিরি! খোলবার কথা বিকেল পাঁচটায়, বাবুরা খোলেন গিয়ে ছটা সাতটা যখন খুশি। কী করব, তোমাদের যে আবার কড়া কানুন, নইলে ওই অখাদ্য পাড়ার লাইব্রেরিতে যায় কে? কলকাতা শহরে কত লাইব্রেরি। তা–সে তো–
সে তো যে কী, তা আর বলে শেষ করত না সুমনা, অন্য একটা কিছু নিয়ে ব্যস্ত হত।
ছোটকাকার চোখ পড়লে বলে উঠতেন, লাইব্রেরিতে গিয়ে আড্ডা দিয়ে সময় নষ্ট না করে, সন্ধ্যাবেলাটা পড়াশুনো করলেই ভাল হয় না?
সুমনা আদরে গলে গিয়ে বলত, পড়াই তো করি ছোটকাকা। বাড়িতে নন্দি-সৃজিদের জ্বালায় মনই বসেনা। এ তবু সন্ধ্যাবেলা নিয়ম করে ঘন্টাখানেক কি ঘন্টা দেড়েক
ওঃ! তা পাঠ্যপুস্তক সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া হয় বুঝি?
আহা পুস্তক আবার কী! এই নোটের খাতা-টাতা–
আমাদের সুভাষ লাইব্রেরিতে আবার কাজের বই কিছু আছে নাকি? থাকবার মধ্যে তো দেখি চারটি বাজে নভেল আর
কী যে বলো ছোটকাকা! সব তুমি দেখেছ বুঝি?
এইভাবেই চালানো।
তবু চালিয়ে চলেছিল।
যে দিন দেরি হত, সিদ্ধার্থ বলত, মনে হচ্ছে লাঙ্গুলটি বড্ড বেশি স্ফীত হয়ে উঠছে দিনদিন।
সুমনা বলত, হওয়াই স্বাভাবিক। যেখানে এত বেশি স্বাগত, সেখানে অহংকার না এসে পারে?
ভাবছি এবার সন্ধ্যায় একটা টিউশনি ধরব।
আঃ কবে এ সুমতি ঘটবে তোমার? হলে আমি হরির লুট দেব।
হরির লুট দেবে?
না তো কী? রোজ এই যন্ত্রণার দায় থেকে রেহাই পাব, হাড় জুড়োবে।
সিদ্ধার্থ ভয়ংকরের ভূমিকা অভিনয় করে বলত, বটে নাকি? তা হলে তো নেওয়া হবে না।
নেওয়া হবে না!
উঁহু! শত্রুপক্ষকে কদাচ স্বস্তি দিতে নেই। শাস্ত্রে নিষেধ আছে।
আমি তোমার শত্রুপক্ষ?
আমি তো তাই মনে করি।
আবার দৈবাৎ কোনওদিন সিদ্ধার্থই হয়ত আটকা পড়ে যেত অন্য কাজে, দেরি হয়ে যেত তার। সেদিন সুমনা ছটফট করত, যাই যাই করত, এসেছিলাম। চলে যাচ্ছি। বলে চিরকুট লিখত অথচ চলে যেত না। আর সিদ্ধার্থ এলে একেবারে তাকে দেখতে না পাওয়ার ভান করে বইয়ের মধ্যে নিমগ্ন হয়ে যেত।
তারপর পুড়ত অনেক কাঠখড়।
.
আমাদের জায়গা শুনেই সেই দিনগুলো চোখের উপর ভেসে ওঠে।
ব্যাকুল হয়ে ওঠে মন, তবু অভিমান বড় দুর্ভেদ্য বর্ম।
তাই মুখে সে ব্যাকুলতা ফোটে না।
মুখে যা ফোটে তা এই: আমার সময় নেই।
