জানি। কিন্তু তোমার সময় যে হরণ করে নিয়েছে, তাকে আমি অভিসম্পাত দিই এই কি তুমি চাও সুমনা?
সুমনা আবার কেঁপে ওঠে। কিন্তু সে মুহূর্তের জন্যে। তারপর পাথুরে মুখে একটু আগুনের হাসি হেসে বলে, অভিসম্পাত এত বেশি পাচ্ছে সে যে, তোমার টুকুতে আর বিশেষ কিছু হবে না। বোঝার ওপর শাকের আঁটি।
সুমনা! আমায় মাপ করো। আমি শুধু তোমায় রাগিয়ে দিতে চাইছিলাম, তাতিয়ে তুলতে চাইছিলাম। শোনো, তোমার পায়ে পড়ি, এসো আজ সন্ধ্যাবেলা।
বলেছি তো আমার সময় হবে না। সিদ্ধার্থ, তুমি আমার কথা ভুলে যাও।
চমৎকার! প্রায় একটি নাটকের নায়িকার উক্তি!
ব্যঙ্গ করে তুমি আমায় টলাতে পারবে না।
হাত জোড় করে?
তার উত্তরে হাত জোড় করব।
সুমনা, আমি বলছি তুমি সারাদিন ধরে ভাবো। আমি লাইব্রেরির বারান্দায় আছি। সমস্ত সন্ধ্যা।
দরজার কাছে কান্তিকুমার এসে দাঁড়ান।
বুঝি সুমনাকে সিদ্ধার্থের কাছে এসে কথা বলতে দেখে একটু প্রীত হন, প্রসন্ন হন। শান্ত গলায় বলেন, এই যে সুমি, তুই এখানেই রয়েছিস! অঞ্জু কি তোকে বলেছে, এগারোটার মধ্যেই বেরোব আমরা–
সুমনা মাথা নিচু করে বলে, হ্যাঁ বাবা, বলেছে। আমিও তাই নিজেই বলতে এলাম, আমার একটু ভুলই বলা হয়েছিল। এম. এ.-তে ভর্তি হওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়!
.
আশা ছিল না।
তবু সমস্ত সন্ধ্যাটা লাইব্রেরির দোতলার সেই বারান্দাটায় দাঁড়িয়ে থাকে সিদ্ধার্থ।
পাঠাগারের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। চাকরটা সিঁড়ির দরজা বন্ধ করে সরে পড়ার তালে খানিকক্ষণ ঘুরঘুর করে কাছে এসে বলে,দাদাবাবু এখন থাকবেন নাকি?
সিদ্ধার্থ সচকিত হয়ে হাত তুলে ঘড়িটার দিকে তাকায়। লজ্জিত হয়ে বলে, না, তুমি দরজা বন্ধ করো।
আরও একটা জায়গায়ও তবে দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। হয়তো চিরকালের মতো গেছে।
অনুভব করতে পারছে সিদ্ধার্থ। কিন্তু বন্ধ হয়ে গেছে বলেই হতাশ নিশ্বাস ফেলে চলে আসবে? দেখবে না যে তালাটা কতখানি মজবুত? আদৌ মজবুতই কিনা?
তালা যে লাগিয়েছে সে কি নিজেই জানে সে কথা?
সকালে দেখা কান্তিকুমারের মুখটা মনে পড়ে সিদ্ধার্থর। মনে পড়ে বাবাকে সুমনা কী ভালবাসত!
বাবা তো ভালবাসারই জিনিস, তবু সকলের ভাগ্যে কি জোটে অমন বন্ধুর মতো, গুরুর মতো, শ্রদ্ধা করবার মতো বাবা?
সুমনা অনুভব করত তার ভাগ্যের সেই পরম দান।
সুমনা সে কথা ভুলে গেল কী করে?
হঠাৎ মনে হল সিদ্ধার্থের, আগেকার আমলে বোধ করি একেই বলত ভূতে পাওয়া। জঙ্গলের ভূত এসে ঘাড়ে চেপেছে শিশুর মূর্তি ধরে! সেই হতভাগা ছেলেটা না জানি কেমন। না জানি বা কাদের।
.
কান্তিকুমারদের বাড়ি থেকে মিনিট কয়েকের রাস্তায় সিদ্ধার্থদের বাড়ি। তিন ভাইয়ের মধ্যে সিদ্ধার্থই ছোট, তাই মা বাপের কাছে তার কিছুটা প্রশ্রয় আছে। আর একটু বিশেষ প্রশ্রয় আছে বড়বউদি রমলার কাছে। কলকাতার এই বাড়িতে অবশ্য তিনিই একমেবাদ্বিতীয়াং। কারণ মেজদা মেজোবউদি থাকে রাজধানীতে। আসেন কদাচ।
সিদ্ধার্থ আর সুমনার হৃদয়ঘটিত ব্যাপারটির রমলাই পৃষ্ঠপোষিকা। রমলা দেওরকে আশ্বাস দিয়ে রেখেছে, নিশ্চিন্তে নির্ভয়ে প্রেমবৃক্ষে জলসিঞ্চন করে যাও, অতঃপর আমি আছি।
সিদ্ধার্থ বলত, তুমি তো আছ তোমার শ্বশুরকুলের কর্ণধার হিসেবে। কিন্তু ও কুল যদি সহসা অকূলে ভাসায়?
ইস, ভাসালেই হল অমনি। নিরুপায়া বালিকার অশ্রু বিসর্জনের দিন এখনও আছে যে! বলি মশাই, তোমার প্রেয়সীর প্রেম কি এমনি অমজবুত যে অভিভাবকের একটু চোখ রাঙানির ধাক্কা খেলেই ধসে পড়বে?
বলা কি যায়? মেয়েদের ব্যাপার!
হু, ইতিমধ্যেই মেয়েদের যে বেশ চিনে নিয়েছ দেখছি! সুমনার ভালবাসার প্রতি আস্থাটা তা হলে জোরালো নয়?
আহা আমি আস্থা রাখলেও
থামো থামো! আর ন্যাকামি করতে হবে না। পৃথিবী উলটে গেলেও সুমনা বদলাবে না।
এত দুঃসাহসিক ভবিষ্যৎদ্বাণী?
নিশ্চয়। মেয়েদের তোমরা ভাবো কী? সুমনাকে আমি স্কুলে-পড়া মেয়ে থেকে দেখছি না?
তা সিদ্ধার্থই কি আর দেখছে না? না সিদ্ধার্থের আস্থা আর নিশ্চিন্ততায় কোনও ভেজাল আছে। ও শুধু বউদির সঙ্গে চালাকি করে। বলে, আমি এই একটা সস্তা মাল। আমি কি আর অ্যাডভোকেট কান্তিকুমারের ওই রূপে গুণে আলো করা মেয়ের উপযুক্ত? এ প্রস্তাব তুললে ভদ্রলোক আমায় কবিরাজি চিকিৎসার পরামর্শ দেবেন।
ভারী সাধ্যি! তবে তুমি যদি ভয় পেয়ে সরে আসো আলাদা কথা।
সিদ্ধার্থ হাসত।
ওদের দুজনের বিয়েটাকে চন্দ্ৰসূর্যের নিয়মের মতো নিশ্চিত ভেবে নিশ্চিন্ত আছে সে।
মাঝে মাঝে পিসির প্ররোচনায় মা একটু একটু টোকা দিয়ে দেখেছেন, বলেছেন, যতদূর দেখছি, তুই তো ওই কান্তি উকিলের মেয়ের পিত্যেশে হাঁ করে বসে আছিস। আর ও যদি ঝপ করে মেয়ের জন্যে মগডালের ফুল জোগাড় করে বসে?
সিদ্ধার্থ মাকে রাগাবার জন্যে বলত, কী আর করা যাবে! ভাবব ওই আমার বিধিলিপি। সংসার করা আমার কপালে নেই।
ঘেন্নার কথা বলিসনি সিধু। ওর বাপ ওর অন্য পাত্রে বিয়ে দেবে, আর তুই বৈরাগ্য নিবি?
সিদ্ধার্থ আরও হাসত।
বলত, তাতে যদি মান খাটোই হয়, না হয় দেখেশুনে অন্য একটা বিয়েই করে ফেলা যাবে। কিন্তু বাতাসের সঙ্গে লড়াই কেন? যদি নিয়ে দুশ্চিন্তা কেন?
পিসি বলে উঠতেন, মাঝে মাঝে ওই সুমনার জেঠি যা লম্বা-চওড়া কথা কয়! বলে, ওদের ওই মেয়ে নাকি রাজপুত্তুরের যুগ্যি। আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলে। শুনলে গা জ্বলে যায়।
