এত শুনছ কোথা থেকে? নোক-মুখটা কোন লোকের?
বাঃ, আজকাল আমার পিসি যে তোমার জেঠিমার গুরু-ভগ্নী হয়েছেন। জানো না?
না। এমন গুরুতর সংবাদটা আমার কান এড়িয়ে গেছে। তা শুধু ওইটুকুই শুনেছ?
হঠাৎ ঠোঁটের কোণটা বিদ্রুপে বেঁকে যায় সুমনার। চোখের তারাটা জ্বলে ওঠে, আর কিছু শোনোনি?
আর কী?
এই আমি কত বড় একটা গল্প বানানেওয়ালি, আমার মা-বাপ কী চতুর কৌশলী।
সিদ্ধার্থ মৃদু হেসে বলে, হ্যাঁ, ওরকম একটা কথাও কানে এসেছিল বটে। বিশ্বাস করিনি।
কেন? সুমনা আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে, সবাই তো বিশ্বাস করছে। মনে হচ্ছে ক্রমশ আমিও বিশ্বাস করতে শুরু করব, তুমি করোনি কেন?
কেন করিনি জানো? সিদ্ধার্থ তেমনি করে একবার সুমনার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, বিশ্বাস করতে অহমিকায় আঘাত লাগল। নিজের চেয়ে ভাগ্যবান আর কেউ আছে, এটা বড় মর্মবিদারী চিন্তা।
সুমনা কেঁপে ওঠে।
ওরা ভালবেসেছে, গল্প করেছে, হাসিগল্পে মশগুল হয়েছে, এবং অলিখিত চুক্তিপত্রে একরকম স্থির করে রেখেছে ওদের বিয়ে হবে। কিন্তু এমন খোলাখুলি এধরনের কথা কোনওদিন বলেনি সিদ্ধার্থ!
সুমনা তাই কেঁপে ওঠে।
কিন্তু কেঁপে উঠেও সামলে নেয় নিজেকে। বলে, শুধু ওই জন্যে? নইলে বিশ্বাস করতে বাধা ছিল?
সুমনা, পাগলামি কোরো না।
কিন্তু তুমি তো আসোওনি।
তা সত্যি! কিন্তু বিশ্বাস করো আসবার জন্যে অসম্ভব একটা ব্যাকুলতাকে রোধ করতে করতে, এই ক দিনে রোগা হয়ে গেলাম। মন একবার বলে যাই, একবার বলে থাক। একবার বলে দেখা হলেই সব সোজা হয়ে যাবে। একবার বলে,সোজা হলে আপনিই দেখা হবে। প্রায় মিছরির শরবতের মতো অবস্থা ঘটেছিল মনটার। এ গ্লাস থেকে ও গ্লাস। ইচ্ছের গ্লাস আর বিবেচনার গ্লাস। অতঃপর বিবেচনাই জয়ী হল।
বিবেচনা!
হ্যাঁ, বিবেচনা করে দেখলাম, তোমার এই অস্বাভাবিক মানসিকতার মাঝখানে আমার আবির্ভাবটা হয়তো আরও অস্বস্তিকর হবে। অপ্রীতিকরও হতে পারে। শুধু তুমি যদি কখনও শূন্যতা বোধ করে নিজেই
সুমনা নিজের মনকে তলিয়ে দেখে একবার। শূন্যতা বোধ কি হচ্ছিল? কই? কোনও বোধই বুঝি ছিল না সুমনার এতদিন। কিন্তু এখন! সিদ্ধার্থকে দেখে বুঝি বোধ ফিরছে। তাই প্রাণের মধ্যেটায় ভয়ানক একটা শূন্যতার হাহাকার অনুভব করে। ভুলে যায়, অঞ্জুকে বলে এসেছে এখনই আসছি। ভুলে যায়, কেন বাবার এই চেম্বারে এসেছিল সে।
শুধু অবাক হয়ে ভাবে, এতগুলো দিন সুমনা সিদ্ধার্থের কথা প্রায় ভুলে বসেছিল।
সিদ্ধার্থ মিনিটখানেক ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, বাস্তবকে স্বীকার করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ সুমনা। পৃথিবী ভাবপ্রবণতার মূল্য দেয় না।
আর পৃথিবীর কাছে যদি আমি মূল্যের জন্যে হাত না পাতি? যদি কেবলমাত্র আমার আমিটাকে নিয়ে পড়ে থাকতে চাই?
তাও দিতে চায় না পৃথিবী। তোমার সেই তুমিটাকে নিভৃত কোণ থেকে টেনে এনে প্রশ্নে প্রশ্নে ক্ষত-বিক্ষত করতে চাইবে তুই কেন এমন উলটোপালটা রে? আমাদের হিসেবের সঙ্গে তোর হিসেবটা যে মিলছে না।
মিলোতেই হবে হিসেব?
পাগলা গারদে বা পর্বতগুহায় থাকতে না চাইলেই মিলোতে হবে। সেটাই নিয়ম।
সুমনা আস্তে বলে, আমার বিপদে তোমার কষ্ট হচ্ছে না?
হচ্ছে, খুব কষ্ট হচ্ছে, তবে তোমার জন্যে নয়, আমার জন্যে। কারণ বিপদটা তোমার চাইতে অনেক বেশি আমার।
তোমার!
তবে না তো কী। ভেবে রেখেছিলাম তোমার রেজাল্টটা বেরোলেই এতদিনের সুখস্বপ্নের কথাটা সম্বন্ধে আর্জি তুলব।
যাক, তুলতে হল না। কম খাটুনি বাঁচিয়ে দিলাম তোমার?
সুমনা!
সহসা খুব কাছাকাছি সরে আসে সিদ্ধার্থ। বলে, এটা কথা বলার সময় নয়, জায়গাও নয়, কিন্তু উপযুক্ত স্থান কাল এবং পাত্র একত্রে পাওয়ার আশা এখন দুরাশা। তাই খুব তাড়াতাড়ি বলছি কী ছেলেমানুষী হচ্ছে? ওসব পাগলামি ছেড়ে দাও। আমাদের যে জীবনকে আমরা এতদিন ধরে স্বপ্নে গড়েছি, তাকে ধূলিসাৎ কোরো না।
সুমনাকে ঈষৎ কঠিন দেখায়, আমাকে কী করতে বলো?
আমি কিছুই করতে বলব না সুমনা। শুধু একটু ভাবতে বলব তোমায়। ভেবে দেখতে বলব, তুমি নিজেকে কোথায় তলিয়ে নিয়ে যাচ্ছ।
সুমনা স্পষ্ট কঠিন মুখে বলে,আচ্ছা তোমার অনুবোধ পালন করবার চেষ্টা করব। ভেবে দেখব।
সুমনা! কঠিন হোয়ো না। নির্বোধ হোয়ো না। একটা কানাকড়ির দামে জীবনটাকে বিকিয়ে দিও না।
সুমনা সেই কঠিন মুখেই একটু হেসে বলে, কোনটার কী দাম, সে কি চট করে অত সহজে কষে ঠিক করা যায় সিদ্ধার্থ? সময় লাগে।
ততদিনে যে সময় পার হয়ে যায় সুমনা। আমি বলছি, তুমি একটা তুচ্ছ সেন্টিমেন্টের বশে চলে নিজে কষ্ট পাচ্ছ, অন্য অনেককে কষ্ট দিচ্ছ। তোমার এই দুর্মতিতে তোমার বাবার কী অবস্থা হয়েছে দেখেছ?
সেটা আমার ভাগ্য সিদ্ধার্থ। ওঁরাও খুব একটা বুদ্ধির পরিচয় দিচ্ছেন না। ওঁরাও সেই নিতান্ত তুচ্ছ ব্যাপারকে ফেনিয়ে বাড়িয়ে নিজেদের জীবনকেও জটিল করে তুলেছেন।
তুচ্ছই বা ভাবছ কেন? কেউ যখন তা ভাবছে না?
সেইটাই তো আমার কাছে এক অদ্ভুত রহস্য সিদ্ধার্থ। কেন তা ভাবছে না?
তা হয় না! সংসারী লোকদের হিসেব আলাদা।
থাক, তবে আর কী করা। কেমন ছিলে এতদিনে শুনি।
খুব ভাল।
শুনে খুশি হলাম।
সুমনা!
কী!
বাজে কথা, বৃথা অভিমান, থাক ওসব। চলো একদিন আমাদের জায়গায়।
জায়গায় জায়গা অবশ্য আর কিছুই নয়, ওদেরই পাড়ার লাইব্রেরি। সুভাষ পাঠাগার।
