মা, আত্মীয়া, ঝি, নার্স, করুণাময়ী প্রতিবেশিনী, কাউকে না কাউকে চাই শিশুর, যতক্ষণ না সে শিশু পৃথিবীর মাটিতে পা দিয়ে দাঁড়াতে শেখে।
সুমনার ছেলে কতদিনে দাঁড়াতে শিখবে?
আর কতদিনে শিখবে সত্যিকার নিজের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতে?
তবে তো ছুটি সুমনার!
৩. উপযাচক হয়ে
কান্তিকুমার অঞ্জনাকে দিয়ে বলে পাঠান। নিজে আর উপযাচক হয়ে মেয়ের কাছে এসে বক্তব্য নিবেদনের ইচ্ছে নেই। এ পর্যন্ত ওর বুদ্ধিহীনতার জন্যে বিরক্ত হলেও কিছুটা সহানুভূতি পোষণ করতেন। ও যে ওর হৃদয়-ধর্মের কাছে নিরুপায় হয়ে আছে, এটা তিনি অনুভব করতে পারছিলেন। কিন্তু ক্রমশই যেন একটা মৌন কাঠিন্য ঘিরে ধরছে তাঁকে।
তাই নিজে আসেননি।
অঞ্জনাকে দিয়ে বলে পাঠিয়েছেন।
অঞ্জনা এসে দরজার কাছে দাঁড়ায়। কুণ্ঠিত মুখে বলে,দিদি, বাবা বললেন এগারোটার সময় তৈরি হয়ে থেকো, নিয়ে যাবেন।
কোথায় নিয়ে যাবেন, কোথায় যেতে হবে, সে কথা কি ভুলে গেছে সুমনা? তাই চমকে ওঠে, অবাক হয়ে যায়।
কোথায় নিয়ে যাবেন?
কোথায়! অঞ্জুও অবাক হয়ে যায়! কেন, ইউনিভার্সিটিতে যাবার কথা ছিল না?
ওঃ!
সুমনা একটু চুপ করে থেকে বলে, বাবাকে বলে দে অঞ্জু, দিদির ভুল হয়েছিল। দিদি এম. এ.তে ভর্তি হবে না।
ভর্তি হবে না?
নাঃ। সম্ভব নয়।
অঞ্জু একটা নিশ্বাস গোপন করে বলে,দিদি, মিথ্যে কেন এরকম করছ! বাড়ির মধ্যে তুমিই লেখাপড়ায় ভাল, তুমিই বাড়ির গৌরব, তুমি এরকম করলে বাবার কীরকম কষ্ট হয় বলো তো?
আমার ভাগ্য!
দিদি, আমি যদি ওকে রাখি?
কাতর বচনে বলে অঞ্জনা। দিদি বলে ডেকে কথা কইতে আজকাল আর তেমন পায় না বলেই হয়তো আজ মনের কথা বলে ফেলে।
হ্যাঁ, পায় না।
ঠাকুমার নিভৃত নির্দেশ, সবাই মিলে আদিখ্যেতা করতে হবে না। সবাই নিয়ে নাচানাচি করলে আরও পেয়ে বসবে। যাবি না, ঠুবি না।…আর ঠুবিই বা কেন? ডাস্টবিনের নোংরা।
কিন্তু সেই ঘৃণ্য বস্তুটার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে আর পলক পড়ে না অঞ্জনার।
চারখানা হাত পা ছুঁড়ে ঠুকে উছলে উছলে খেলা করছে। মুখে স্বর্গের দীপ্তি। শুধু শিশু নয়, সুন্দর শিশু, স্বাস্থ্যবান শিশু।
তাই হঠাৎ দানপত্রে স্বাক্ষর করে বসতে চায় অঞ্জু, দিদি, আমি ওকে রাখব।
দুঃখের মধ্যেও হেসে ফেলে সুমনা।
বলে, তোর লেখাপড়া সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে?
আমার লেখাপড়া।
অঞ্জনা অগ্রাহ্যভরে বলে, হলেই বা কী আর না হলেই বা কী! যা না ব্রেন! দুদুবার ক্লাসে ফেল। আমি পড়তে না পেলে পৃথিবীর কোনও লোকসান হবে না দিদি।
দুর পাগল। যা, পাগলামি করিস না।
দিদি, আমি বাবাকে ওকথা বলতে পারব না।
বলতে পারবি না?
না। আমার কষ্ট হয়।
ঠিক আছে। আমিই বলে আসছি। আমি তো নিষ্ঠুরের রাজা। তুই একটু থাকবি তো এখানে?
অঞ্জু একবার এদিক-ওদিক তাকিয়ে ঘাড় নাড়ে। থাকব। তুমি দেরি করবে না তো?
না দেরি করব কেন? দেরি করবার কী আছে?
দেরি করবে না।
ছেলেটা হঠাৎ দুদিন থেকে উপুড় হতে শিখে খাট থেকে নামবার সাধনা করছে। একদণ্ড নড়বার জো নেই। অঞ্জুর কি সে সতর্কতা আছে?
.
কিন্তু দেরি করব না বলেও কোথায় হারিয়ে গেল সুমনা?
অঞ্জুর কেয়ারে থাকতে থাকতে দুরন্ত খেলার ক্লান্তিতে ঘুমিয়েই পড়ল ছেলেটা। অঞ্জু বসে আছে।
বসে আছে, তাকিয়ে আছে।
সবাই চুপিচুপি বলাবলি করে, দিদির মতো মুখ! কই, অঞ্জু তো তা বুঝতে পারছে না। এতটুকু ছেলের আবার মুখ বোঝা যায়? তবে কেন বলে! দিদি মানুষ করছে বলে দিদির মতো মুখ হয়ে যাবে?
কিশোরী মনের অস্ফুট আলো-আঁধারিতে কত কী ভাবে, কিছু বোঝে না, ভয় ভয় করে।
তারপর ভাবে–দুর! যতসব বাজে কথা!
কিন্তু দিদি এত দেরি করছে কেন?
বাবা কি রাগ করছেন?
দিদিকে কি বকছেন?
দিদি কি বসে বসে কাঁদছে?
কিন্তু বাবা কি কখনও এত বকতে পারেন, যাতে মানুষ কাঁদবে?
তা অঞ্জনা তো আর হাত গুনতে জানে না যে, জানতে পারবে আসলে বাবার সঙ্গে দেখাই হয়নি সুমনার!
অঞ্জুকে আদেশ দিয়ে কোথায় যেন বেরিয়ে গিয়েছিলেন কান্তিকুমার। সুমনা জানে না। সুমনা সোজা চলে গিয়েছিল বাবার অফিস ঘরে।
সেখানে বাবার চেয়ারটা শূন্য।
কিন্তু ওদিকে বইয়ের আলমারির কাছে ইজি-চেয়ারে বসে কে!
ওখানে বসে কী করছে?
ও কি এখানে আসে?
যেমন ভাবে নিশ্চিন্ত আরামে আধশোয়া হয়ে বসে বইটা খুলে চোখের সামনে মেলে ধরেছে, তাতে মনে হচ্ছে না এটা দৈবাতের ঘটনা। দৈবাৎ একদিন একটা বই ভাল লেগে গেছে বলেই পড়ে শেষ করছে।
না। মনে হচ্ছে নিত্য অভ্যাসের ব্যাপার।
ও আবার ল বুক পড়ছে কেন!
সুমনা কি চলে যাবে?
চলে যাবে ভেবে ও হঠাৎ বলে উঠল, বাবা কই?
বলে উঠল না, কে যেন বলিয়ে দিল।
হাতের বইখানা মুড়ে অর্ধশায়িত মানুষটা সোজা হয়ে উঠে বসল।
বলে উঠল,আরে এসো এসো শ্রীমতী ম্যাডোনা। কী খবর?
বাবার শূন্য চেয়ারটায় বসে পড়ে সুমনা বলে, খবরটা তা হলে কানে উঠেছে?
কানে উঠেছে মানে? কানের পোকা বেরিয়ে যেতে বসেছে।
হাঁ! তা এতদিনের মধ্যে একদিন তোকই দেখা করতে এলে না?
দেখা করতে! ও বাবা! সাহস কোথা? সিদ্ধার্থ একটা বদ্ধগভীর দৃষ্টি ফেলে বলে,আর কি তুমি সেই সুমনা আছ? এখন যে ম্যাডোনা হয়ে গেছ।
ঠাট্টা করছ!
ঠাট্টা! অন্তত আমার পক্ষে ব্যাপারটা ঠিক ঠাট্টা নয়। লোকমুখে শুনছি, নির্জন আত্মকারাবাস, অহোরাত্র তোয়ালে কাঁথা ফিডিংবটলের মধ্যে নিমজ্জিত
