এড়ানোই ভাল। ওদের যা অবস্থা, ওরা খেতে পারবেও না।
কিন্তু এড়াবো বললেই কি এড়ানো যায়? শেষ পর্যন্ত কেউটের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায় না। কারণ সুজাতা আজ বদ্ধপরিকর হয়ে বসে আছে, আজকের ব্যাপার বলবে বলে। অথচ ব্যাপারের কারণটা নিতান্তই তুচ্ছ। পিঠোপিঠি দুই ভাই সাধারণ রীতিতেই কিছু একটা নিয়ে ঝগড়া শুরু করেছিল, এবং যথানিয়মেই সেটা ক্রমশ মারামারির উচ্চগ্রামে উঠেছিল। কিন্তু অহরহ দেখা এই দৃশ্য দেখে সহসাই নাকি আজ যোগমায়া মন্তব্য করে বসেন, এমন অসভ্য ছেলে নাকি তিনি ভূভারতে দেখেননি, মা বাপের প্রশ্রয়েই নাকি মেজবউয়ের ছেলেমেয়েরা পাজির পা ঝাড়া হয়ে হয়ে তৈরি হচ্ছে। যোগমায়ার নিজের যদি এক্তার থাকত এইসব ব্যাদড়া পাজি ছেলেদের মেরে তুলো ধুনে শায়েস্তা করতেন।
এরপরেও ছেলেদের না মেরে চুপ করে থাকতে পারবে, এত ঠাণ্ডা রক্ত সুজাতার নয়। মেরেছিল, বেদমই মেরেছিল। আর তখন সুজাতার গুণের ধ্বজা মেয়ে দোতলা থেকে নেমে এসেছিলেন মাকে শাসন করতে! যে মেয়ের জন্যেই এত অপমান।
হ্যাঁ, মেয়েকে রেয়াত করেনি সুজাতা। সুমনা যখন তীব্র তিরস্কার করেছিল, মা, কী হচ্ছে কি? বাড়িটা যে ক্রমশ নরক করে তুলছ তোমরা!
তখন সুজাতা বলেছিল, সুমনার লজ্জা করে না একথা বলতে? নরকের পাপ ঘরে তুলে এনে সুমনাই তো সংসারকে ছারখার করল। সুজাতাদের এত অপমানিত অপদস্থ হয়ে থাকার কারণ কে? ইত্যাদি
সুমনা চুপ করে গিয়েছিল।
তারপর আস্তে আস্তে চলে যাবার সময় বলে গিয়েছিল,আচ্ছা, শিগগিরই তোমাদের মুক্তি দিয়ে যাব।
এখন সংসারের সবাই বলছে, সুমনা হয় বিষ খেয়ে, নয় গলায় দড়ি দিয়ে কেলেঙ্কারির চরম করবে, এবং তার জন্যে দায়ী সুজাতাই। বাড়ির ছোট ছেলেরা দুষ্টুমি করলে বড়রা বকেই থাকে, সেই রাগে সুজাতা যদি ছেলেদের খুন করতে বসে, আর অতবড় তেজি মেয়েকে গালমন্দ করে, তা হলে সংসার আলাদা করা ছাড়া পথ নেই। এবং বোঝা যাচ্ছে, সেটাই সুজাতার অভিপ্রেত।
তবে?
বলুন কান্তিকুমার সুজাতার করণীয় কী?
কান্তিকুমার গম্ভীর কণ্ঠে বলেন, কথা বস্তুটাকে একটু ঝেড়ে ফেলতে শিখলেই সব জিনিসটা সহজ হয়ে যায়।
ঝেড়ে ফেলতে! তুমি পারো ওইরকম সব কথা ঝেড়ে ফেলতে?
কান্তিকুমার এক মিনিট তাকিয়ে থেকে বলেন, তবে কি তোমার ধারণা, কথার জ্বালায় অস্থির হয়ে ওই বাচ্চা দুটোকে পিটোতে বসতাম?
পুরুষের কানে সংসারের নীচ কথাগুলো তো সব ওঠে না—
কেন ওঠে না সেটাই বরং নির্ণয় করো।
তা হলে তুমি কোনও কিছুর প্রতিকার করবে না?
কীসের প্রতিকার?
সুমি এইভাবেই চালিয়ে যাবে?
উপায় কী? যদি কখনও ওর নিজের দিক থেকে সহজ হবার প্রেরণা আসে, যদি
আর যদি ও আত্মহত্যা করে বসে-বলেই হঠাৎ সুজাতা হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলে।
কান্তিকুমার ওর কান্নাকে একটু থামতে দিতে সময় দেন। তারপর ক্ষীণ একটু হেসে বলেন,সে ভয় কোরো না সুজাতা। যে বন্ধনের পাকে নিজেকে জড়িয়েছে ও, সে পাক থেকে মুক্ত হয়ে মরবারও ক্ষমতা নেই ওর।
.
না, কান্তিকুমারের হিসেবে ভুল নেই।
মরে অপমানের জ্বালা জুড়োবে, সে ক্ষমতা হয় না সুমনার। যদিও সেদিন রাগের মাথায় মনে হয়েছিল তার, মরে এদের জব্দ করতে পারি! ঠিক হয়।
কিন্তু ওই ছেলেটাকে ঠিক কোন অবস্থায় রেখে মরা চলে, সেটা ভাবতে ভাবতে মরার ইচ্ছেটা জুড়িয়ে গেল। এখন শুধু চিন্তা, কী করে সংসারকে মুক্তি দিয়ে চলে যাওয়া যায়।
তা সে চিন্তাই কি দানা বাঁধতে পারে? যতক্ষণ না ও একটু বড় হচ্ছে–
তাই মরাও হয় না, চলে যাওয়াও হয় না। শুধু আরও একটু গম্ভীর হয়ে ওঠে সুমনা, আরও মৌনী। আর সংসার থেকে আরও বিচ্ছিন্ন।
এমনি করে দিন যায়।
আর সংসারে এক-একদিন এক-একটা ঘটনা ঘটতে থাকে, যেটা ইচ্ছাকৃত।
আর দিনে দিনে
প্রতি মুহূর্তে মুহূর্তে প্রতি পলে পলে অনুভব করতে পারছে সুমনা কোন প্রাণে মা ফেলে দিয়ে যায় শিশুকে।
শুধু একটু মমতার দায়েই যদি জীবন এমন বিড়ম্বিত হয়ে ওঠে, মস্ত একটা ভুলের দায়ে কলঙ্কিত জীবনে তবে কত বিড়ম্বনা এসে জোটে।
একটা শিশু!
কতটুকু বা ওজন।
কিন্তু কী ভয়ানক তার ভার।
সে ভার কেবলমাত্র একা বহন করব, এ প্রতিজ্ঞা অবাস্তব।
তার খাওয়া চাই, পরা চাই, আশ্রয় চাই, আগলাবার লোক চাই।
সুমনা যদি নিজেকে ফসিল করে ফেলেও ওকে আগলে বসে থাকে, বাকি জিনিসগুলোর জন্যে তো মুখাপেক্ষী হতে হবে ওর প্রতি নিষ্করুণ এই সংসারের কাছে।
হচ্ছেই তো।
ওর যা প্রয়োজন তা নিয়মিত এসে পৌঁছয় সুমনার ঘরে।
ভালবাসার উপহার হিসেবে নয়।
হয়তো দয়ার দান হিসেবে, হয়তো দায়ের ঋণ শোধ হিসেবে। কান্তিকুমারের হুঁশ আছে।
অঞ্জনা অভীক অজীন কেউ না কেউ রেখে যায় ঘরে, কান্তিকুমারের হুঁশের পরিচয়।
সুমনা যদি ওই দয়ার দান না চায়, সুমনা যদি উপার্জন করতে নামে, কে একে আগলাবে? কী করে রেখে যাবে একে এই বিমুখ সংসারের কাছে?
আর যদি সুমনা এ আশ্রয় ত্যাগ করে?
ভেবে পায় না, ঠিক তার পরমুহূর্তটা কী হবে? কোথায় গিয়ে প্রথম দাঁড়াবে একটা বসতে পর্যন্ত না শেখা ছেলেকে নিয়ে?
আশ্রয় ত্যাগ করা সোজা নয়।
বহু লাঞ্ছনা সহ্য করে আশ্রয়টাকে আঁকড়ে থাকে মানুষ।
বিশেষ করে মেয়েমানুষ।
জগতের কোটি কোটি শিশুর রক্ষয়িত্ৰী আর পালয়িত্রী!
