অরুণা ভাইকে আর কথা কইতে না দিয়ে তাড়াতাড়ি বলে, কী অসভ্য তুই। আঃ। না না, কিছু না। এমনি দুষ্টুমি করছিল তাই
কিন্তু কথা বলবার সুযোগ যে পেয়েছে সে কি আর ছাড়ে? তাই দিদিকে থামিয়ে বলে,দিদা যে বললে, মেরে তুলো ধুনে দাও অমন ছেলেদের। তুলো ধোনা মানে কী জানো মেজজেই? মানে হচ্ছে
.
কিন্তু মেজজেঠু ততক্ষণে চলে গিয়েছেন, সরে গিয়েছেন।
.
কিন্তু কোথায় সরবেন কান্তিকুমার?
কোথায় চলে যাবেন?
ছেলেদের গায়ে হাত তোলা কান্তিকুমারের চিরদিনের বিরক্তিকর। বাড়ির সকলেই মেনে চলত এ নির্দেশ। সুজাতা তো নিশ্চয়ই। কিন্তু আজ পালা বদলেছে। আজ সংসারে কান্তিকুমারের সেই গৌরবের আসন আর নেই। আজ তাঁর বিরক্তিকে কেউ ভয় করছেনা। আজ কান্তিকুমারের মা অনায়াসেই বলতে পারেন, ওদের মেরে তুলো ধুনে দে–আর কান্তিকুমারের স্ত্রী নির্ভয়ে তা করতে পারে।
ওরা বুঝে ফেলেছে কান্তিকুমারকে ভয় না করলেও চলে।
হয়তো এও এক সাংসারিক নিয়ম। হঠাৎ যদি কারও চোখে পড়ে যায়, অকারণ একটা ভয়ের কাছে কাঁটা হয়ে ছিলাম, অর্থহীন একটা আশঙ্কায় জড়সড় হয়ে থাকতাম, ওটা নিষ্প্রয়োজন, তা হলে ভয় ভাঙার নিষ্ঠুর খেলায় সবাই মেতে ওঠে।
সুজাতা বুঝে নিয়েছে কান্তিকুমার এই ছেলে মারা নিয়ে তীব্র তিরস্কার করতে পারবেন না সুজাতাকে। যদি করতে আসেন, সুজাতা মুখর হয়ে উঠবে। তার কত জ্বালা কত যন্ত্রণা শতমুখে তার ব্যাখ্যা করতে বসবে। সুজাতার সেই সাহস জোগান দিচ্ছে কান্তিকুমারের অবাধ্য মেয়ে।
যে কান্তিকুমার নিজের একটা অবাধ্য মেয়েকে শাসন করতে পারেন না, তিনি আবার অন্যকে শাসন করতে আসেন কোন মুখে? এই অভিযোগ লেখা রয়েছে সংসারের প্রত্যেকটি সদস্যের মুখের রেখায়। সুজাতাও তাদের ছাড়া নয়।
.
দুঃসহ একটা পাষাণভার নিয়ে নিজের ঘরের দিকে অগ্রসর হলেন কান্তিকুমার। যে ঘরটা দালানের একেবারে শেষ প্রান্তে। এই ঘরটাই নাকি বাড়ির মধ্যে সবচেয়ে ওঁচা, অন্তত সুজাতার তাই ধারণা; তবু একদা কান্তিকুমার এই ঘরটাই বেছে নিয়েছিলেন কোণের দিকে বলে। চলাচলের পথ নয় বলে।
ঘরের মধ্যে দিয়েই আর একটা ছোট ঘর। সেই ঘরে কান্তিকুমারের একক শয্যা। বড় ঘরটায় জোড়া খাটে সুজাতা শোয় দু ছেলে নিয়ে। মেয়েরা শোয় অন্যত্র। কান্তিকুমার দেখলেন সেই খাটের উপর সুজাতা বসে আছে একটা বই হাতে নিয়ে। আর ছেলে দুটো বিছানায় পড়ে আছে বালিশে মুখ গুঁজে উপুড় হয়ে।
দুরন্ত ছেলে দুটোর এই দৃশ্য যেমন বিস্ময়কর তেমনি বিস্ময়কর সুজাতার হাতে বই। কান্তিকুমার একবার দুটো দৃশ্যের প্রতিই দৃষ্টিপাত করলেন। তারপর নিঃশব্দে নিজের ঘরে ঢুকে গেলেন।
কিন্তু সুজাতা এই নিঃশব্দ বেদনাকে সমীহ করবে না। সুজাতা প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছে। তাই পরমুহূর্তেই বইটা ফেলে রেখে ও-ঘরের দরজায় গিয়ে বলে ওঠে, তুমি কী ঠিক করেছ? একটা কিছু বিহিত করবে, না আমি গলায় দড়ি দেব?
কান্তিকুমার ঈষৎ বিদ্রুপের স্বরে বলেন, ওকাজটা কি কেউ কারও অনুমতি নিয়ে করে?
তবু জানিয়ে রাখলাম। সংসারের এই অবস্থা চলতে থাকলে গলায় দড়িই দিতে হবে আমায়।
কান্তিকুমার আরও বিদ্রুপের সঙ্গে বলে ওঠেন,কেন, ছেলে ঠেঙিয়ে গায়ের জ্বালা কমিয়ে ফেলা যাচ্ছে না? জ্বালা কমাবার ওইটাই তো শ্রেষ্ঠ পন্থা তোমাদের।
ওঃ, সেটি ইতিমধ্যেই টের পাওয়া হয়েছে। শুধু টের পাও না রাতদিন কী অশান্তিতে আমি কাটাচ্ছি। ছেলে ঠেঙানোটাই দেখলে, কেন ঠেঙালাম সেটা একবার বুঝতে চাইছ?
ওটা বোঝবার ক্ষমতা আমার নেই।
তা থাকবে কোথা থেকে? নিজের সংসারটি কেমন তা তো আর জানলে না কোনওদিন।
জানাবার সাহসই যে এযাবৎ কোনওদিন হয়নি সুজাতার, সে কথা মনে পড়ল না তার। তার মনে হচ্ছে কান্তিকুমার একটু জোর করলেই সুমনা-ঘটিত ব্যাপারটার হেস্তনেস্ত একটা হত, ইচ্ছে করেই সে জোর-টুকু করছেন না কান্তিকুমার। তলে তলে মেয়ের প্রতি তাঁর প্রশ্রয় আছে।
মেয়েরা যখন সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে থাকে, ভাবে আমার ভাগ্য। আমার প্রাপ্য পাওনা পাচ্ছি। যখন অসুবিধেয় পড়ে তখন স্বামী নামক জীবটাকে সমস্ত যন্ত্রণার কারণস্বরূপ ধরে নিয়ে তাকে ছোবল হেনে হেনে যন্ত্রণা লাঘবের চেষ্টা করে।
সুজাতাও মেয়ে।
কিন্তু আশ্চর্য!
সহসা সংসারটা এমন নিরাবরণ হয়ে গেল কী করে? কান্তিকুমার বলেন, এযাবৎ একান্নবর্তী পরিবারের যে মধুর স্বপ্ন দেখে এসেছেন তিনি, আর যার একটি সুষ্ঠু রূপ দিতে সমস্ত অর্থ আর সামর্থ্য ব্যয় করেছেন, সেটা তা হলে কিছুই না? এই নিরাবরণ নির্লজ্জতার জন্যেই উদগ্রীব হয়ে ছিল সবাই? একটা উপলক্ষ পেয়ে বেঁচে গেছে? সভ্য থাকবার দায়টা ঘুচিয়ে ফেলে উল্লসিত হয়ে উঠছে।
বন্য আদিবাসীদের থেকে সভ্যসমাজ নাকি অনেক দূরে সরে এসেছে। কান্তিকুমারের হঠাৎ মনে হল কথাটা। আর মনে হল, না। একতিলও সরে আসিনি। বন্যতা বর্বরতাই আমাদের মূল কাঠামো। তাই নগ্ননৃত্যেই আমাদের আনন্দ। উপরের খোলসটা খুলে ফেলবার সুযোগ এলেই তাই এমন খুশিতে উন্মাদ হয়ে উঠি।
ভাবলেন, কথায় কথা বাড়বে।
তাই সুজাতাকে আর কিছু না বলে ছেলেদের প্রশ্ন করলেন,অজি অভি, খাওয়া হয়েছে তোমাদের?১৯০
বলা বাহুল্য, উত্তর মিলল না।
শুধু উঠল একটা ক্রন্দনোচ্ছ্বাস। বুঝলেন খাওয়া হয়নি। কিন্তু এ নিয়ে আলোচনার সাহসও হচ্ছে না। কে জানে কোন কেঁচোর নীচে কোন কেউটে ছোবল দেবার জন্যে অপেক্ষা করছে।
