কিন্তু কই? কোথায় আবহাওয়ার উজ্জ্বলতা?
বাড়ির সর্বত্র জ্বলছে বটে চড়া পাওয়ারের আলো, কারণ কান্তিকুমার দেখতে পারেন না মিটমিটে ঘোলাটে আলো, তাই বাড়ির ভাঁড়ার ঘর পুজোর ঘর থেকে শুরু করে সিঁড়ির তলাটিতে পর্যন্ত চড়া পাওয়ারের বাল্ব লাগানো। তবু ভেতর দালানে পা দিয়েই মনে হল কান্তিকুমারের, সমস্ত আলোগুলো যেন ঔজ্জ্বল্য হারিয়েছে। আর সমস্ত সংসারটা যেন ভয়ানক কোনও একটা আঘাতে স্তব্ধ হয়ে গেছে।
এ আঘাত কার হাত থেকে এল?
কান্তিকুমার পরিবেশটার দিকে তাকিয়ে দেখলেন। কর্তাপুরুষ বাইরে থেকে বাড়িতে ফিরলে যে চাঞ্চল্য বা স্বীকৃতি স্বাভাবিক নিয়মেই দেখা যায়, তার কোনও লক্ষণ দেখা গেল না।
অবশ্য আগে কান্তিকুমারকে দেখলেই সকলের মধ্যে যে একটা তটস্থ ভাব দেখা যেত, সেটা কান্তিকুমারের মেয়ের অপরাধেই যেন ক্রমশ হারাচ্ছিলেন কান্তিকুমার, কিন্তু আজকের ধরনটা আরও শোচনীয়।
দালানের ও-কোণে ঠাকুরঘরের সামনে যোগমায়া হরিনামের মালাগাছটা হাতে করে বসে ছিলেন, যেমন ছিলেন তেমনিই রইলেন, শুধুমাত্র একটা উদাসীন দৃষ্টিপাত করলেন ছেলের দিকে।
স্বর্ণপ্রভা উজ্জ্বল আলোর নীচে বসে বইয়ের লেখা লাইনের তলায় আঙুল রেখে রেখে তাঁর গুরুগ্রন্থজীবে দয়া ও ঈশ্বরপ্রেম পাঠ করছিলেন, তিনি উদাসীন দৃষ্টিপাতটুকুও করলেন না। যেন দেখতেই পেলেন না দেবরকে। মালবিকা মাথা নিচু করে পান সাজছিল, পানই সাজতে লাগল। কান্তিকুমারের যে বিধবা ভাগ্নীটি বিধবা হয়ে ইস্তক এ বাড়িতে রয়েছে সে একখানা চটের আসনে ফুল তুলছিল, তুলতেই লাগল, শুধু ঘাড়টা আরও নিচু করল।
সাধারণত এই সান্ধ্য আসরে সুজাতা থাকেই। হয় বসে সুপুরি কুচোয়, নয় একতাল মাখা ময়দা নিয়ে লেচি কাটে বসে বসে, নিদেনপক্ষে পরদিন সকালের জন্যে কুটনো কোটে। কিন্তু আজ সুজাতা অনুপস্থিত।
বুড়ি ঝিটা পর্যন্ত নিশ্চুপ।
কই গো দাদাবাবু মেয়ের পাসের সন্দেশ কই? বলে ছুটে এল না। একপাশে পা ছড়িয়ে বসে নিজের পায়ে নিজেই তেল ডলছিল, শুধু পা-টা একটু গুটিয়ে বসল।
কান্তিকুমারের মেয়ের যে আজ মস্ত একটা সাফল্যের খবর ওরা জেনেছে, এটা ওদের মুখ দেখে বোঝা গেল না।
কিন্তু এত থমথমে অবস্থা অকারণও নয়। কান্তিকুমার এক মিনিট দাঁড়ালেন, তারপর আস্তে আস্তে সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেলেন।
দেখলেন, দোতলার সামনেই মেয়েদের পড়ার ঘরে অঞ্জু অরুণা, জয়ন্তীকুমারের ছোট ছেলে দুটো আর ভাগ্নীর মেয়ে সবিতা নিঃশব্দে বসে লুডো খেলছে। অজীন অভীককে দেখতে পেলেন না।
কান্তিকুমারকে দেখে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল দু-একজন। কান্তিকুমার বললেন,থাক থাক, তোমরা খেলো।
ছোটরা সংকুচিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল।
অথচ এই শিশুদের রাজ্যে কান্তিকুমারের ছিল রাজাসন। আগে হলে কান্তিকুমার সহাস্যে ঘরে ঢুকে পড়ে বলতেন, কে জিতছে? কে হারছে?
ওরা হইহই করে জানাত হার-জিতের খবর। কান্তিকুমার বসে পড়ে বলতেন,আচ্ছা দেখি আমায় কে হারাতে পারে।
মহা কলরব পড়ে যেত ওদের মধ্যে। কে কান্তিকুমারের ঠিক পাশটিতে বসবে তাই নিয়ে প্রায় মারামারি লেগে যেত। আজ ওরা সংকুচিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
ওরাও বুঝে ফেলেছে বাড়ির অবস্থা আর স্বাভাবিক নেই।
ওরাও তাই ম্রিয়মাণ হয়ে গেছে, নিষ্প্রভ হয়ে গেছে। সংসারের সেই আনন্দ কোথায় গেল? সেই রং কোথায় গেল? কে যেন মুঠোয় করে চেপে উপড়ে নিয়েছে সে আনন্দ, হাতের তেলোয় মুছে নিয়েছে সে রং।
কে?
কে সে? কোন নিষ্ঠুর ব্যক্তি? ভাগ্য?
কিন্তু কান্তিকুমার কি ভাগ্যের সেই নিষ্ঠুরতাকে পরাজিত করতে পারেন না? নিজের জোরে আবার আনতে পারেন না সেই আনন্দ, সেই রং? আবার আগের মতো এই ছোটদের নিয়ে হইহই করে বেড়াতে যেতে পারেন না? সার্কাস দেখাবার কি একজিবিশন দেখাবার, গান শোনাতে নিয়ে যাবার কি খাবার-দাবার বেঁধে নিয়ে পিকনিক করতে যাবার হুজুগ তুলে ওদের মাতিয়ে দিতে পারেন না?
আর এখন ওদের কাছে গিয়ে বলতে পারেন না, কী? কে জিতছে? কে হারছে?
.
না, তা পারবেন না কান্তিকুমার।
গলায় সে সুর ফুটবে না। সুরহীন চেষ্টাকৃত ভাষা নেহাত বেখাপ্পা লাগবে।
নিজেকে নিজের মনের মতো ছাঁচে গড়তে চাইলেই কি গড়তে পাওয়া যায়? সংসারের মধ্যে সেই স্বয়ংসম্পূর্ণতার জায়গা কোথায়? পরিবেশের খাঁজে খাঁজে তো বসাতে হবে নিজেকে। অতএব পরিবেশই হচ্ছে গঠনকর্তা।
সেই পরিবেশ অহরহ নিত্য নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে, নিজেকে বিকৃত করছে, ছাঁচ বদলাচ্ছে। কে পারবে তবে জোর করে বলতে, আমি বদলাব না, আমি যা আছি তাই থাকব।
তা থাকলে, কোন খাঁজে বসাবে মানুষ নিজেকে? কোন খাপে খাপ খাওয়াবে? নেই কোথাও সেই নিজের গড়নের খাপ।
তবে আর কী করা?
বেমানান হবার ভয়ে বদলাতে হবে নিজেকেই। সেই বদলানো নিজেকেই বসিয়ে নিতে হবে বিকৃত সেই ছাঁচের খাঁজে খাঁজে।
তাই কান্তিকুমারকে শান্ত শিথিল গলায় বলতে হচ্ছে,থাক থাক, তোমরা বোসো৷ বলে চলে যাচ্ছিলেন, যেতে গিয়ে ফিরলেন। বললেন, অজি অভিকে দেখছি না?
অঞ্জনা মাথা নিচু করল।
অরুণা আর সবিতা উসখুস করল; আর ওদের ছোটকাকার ছোট ছেলেটা হি হি করে বলে উঠল, সেজদা নদা-কে মেজ জেঠিমা মেরে তুলো ধুনেছে।
কান্তিকুমার যেন হঠাৎ সামনে সাপ দেখলেন। বিচলিত হয়েও স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তারপর বললেন, কী করেছেন?
