—আমি কি মানা করসি না কি? চটেন ক্যান। তা আপনার নায়িকাটি কেমন বলবেন তো?
.
আমার নায়িকাটি কেমন। মনের পর্দায় ভেসে ওঠে শ্যামবর্ণ ভারী একটি মুখ। চোখের কোলে নাকের দু পাশে ঠোঁটের কোণে সামান্য ক্লান্তির ছাপ। শরীরে মাঝ বয়সের ভাঙন। কান ঘেঁষা সযত্নে বিন্যস্ত বিউটি-সেলুনের ছাঁটা চুল। পরনে দামি শাড়ি, বাহারি সেফটি পিনের ফোঁড়ে কাঁধে টানটান। হ্যাঁ, স্মার্ট সন্দেহ নেই। দাপটে চাকরি করে। ঘর-গেরস্থালি এক হাতে সামলায়। পোশকি রান্নায় সাক্ষাৎ দ্রৌপদী। শৌখিন নাটক অভিনয়ে মুখ্য চরিত্র। অর্থাৎ আধুনিক বঙ্গরমণী। দশপ্রহরণধারিণী স্বয়ং শক্তি। অপ্রতিরোধ্য।
আচ্ছা, মৈত্রেয়ীর এই মধ্য গগনের দিফাটা গনগনে রূপটাই আমার মনে সর্বদা ভাসে কেন। আমি তো তাকে দেখেছিলাম তরুণী অবস্থায়। তখন সদ্য অরুণোদয় নয় বটে কিন্তু তখনও ঊষাকাল। স্নিগ্ধ মধুর শান্ত। সে রূপটা কখনওই প্রায় মনে আসে না। অথচ বছর চারেক ধরে সে রূপই তো প্রায় প্রতিদিন চোখের সামনে থাকত। আলাপ-পরিচয়, অচেনা-অজানার দেওয়াল আস্তে আস্তে ভাঙা। দিনের পর দিন একটু দেখা একটু কথা।
কত পরে একটু ছোঁওয়া। কত মাস কত দিনে চার বছর। ভুবনেশ্বরে মৈত্রেয়ী আসত মাসে একবার, থাকত দু-চারদিন। গরমে স্কুলে ছুটিতে সেটা বেড়েবড় জোর সাত-দশদিন। সর্বদা একতার সদস্যরা ঘিরে থাকত। কতটুকু সময়ই বা আমরা একান্ত হতাম। অথচ ভুবনেশ্বরের চেহারাটি আমার আজকের স্মৃতিতে এত সজীব। সময় সত্যি বড় রহস্যময়। আজ আমি মৈত্রেয়ীকে যে চোখে দেখি ভুবনেশ্বরের কি ঠিক সেইভাবে সেই চোখে দেখতাম? মোটেই না। বরং তখন সর্বদা মৈত্রেয়ীর সেই ঊষাকালের রূপটি মনে ভাসত। অতীত কেন যে আমাকে সর্বদা ধাওয়া করে। বর্তমানকে নিয়ে থাকতে পারি না কেন। সময়ের তফাতে মানুষ যে পালটে যায় সেটা মেনে নেওয়া শক্ত বলে কি? হায় সময়, তোমার মতো একচ্ছত্র ক্ষমতা কার? তুমি একাধারে হিটলার-মুসোলিনী-স্ট্যালিন। হয়-কেনয়, সাদাকে কালো করতে তুমি ওস্তাদ। তোমার দৌলতে আজ মৈত্রেয়ী শুধু অতীতের।
না, মৈত্রেয়ী মৃত নয়। এটা বঙ্গলক্ষ্মী স্মৃতিগড়ার কেস হয়নি। শুধুবর্তমানের মৈত্রেয়ীকে আমি মনে করতে পারি না। হয়তো মনে করতে চাই না। স্মৃতিটুকু থাক। যা দূরে সরে গেছে, যা নাগালের বাইরে যা কোনদিন কোনও কিছুর বিনিময়েই আর ফিরে আসবে না সেই অতীতই কেবল সুখময়। যে স্বর্গ হারিয়ে গেছে তাই একমাত্র স্বর্গ।
-আপনি যখন হিরোইন সম্বন্ধে কিছুই মনে করতে পারেন না তাহলে সেই পার্টির কথাই চলুক। ছায়া দেবনাথ মেয়েটা অতি চালাক। যে জানে কতটুকু জেদ করতে হয়। অগত্যা অমল ফিরে আসে কাহিনীর বর্তমানে। নট থেকে কথকের ভূমিকায়।
একতা ক্লাবের পার্টি-টাটির এমন বেহাল অবস্থায় সামাল দিত মৈত্রেয়ী। খুব জমাটি মেয়ে তো। হয়তো ফট করে একটা ইংরিজি ছড়া ধরল। বাচ্চাদের ছড়া। ওতো বাচ্চাদের স্কুলের হেডমিস্ট্রেস। ছড়া-টড়া প্রচুর জানত।
—কী ছড়া কী ছড়া? বলেন দেখি শিইখ্যা লই।
–আরে এমন আহামরি কোনও ছড়া নয়। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া সব বাচ্চাই জানে।
–বলেনই না।
–জ্যাক অ্যান্ড জিল/ওয়েন্ট আপ দ্য হিল/টু ফেচ আ পেইল অফ ওয়াটার/জ্যাক ফেল ডাউন/অ্যান্ড ব্রোক হিজ ক্রাউন/অ্যান্ড জিল কেম টাম্বলিং আফটার।
—তা এ ছড়াতে মজার কী আসে। দুইটা পোলাপান মানে ছেলেমেয়ে পাহাড়ে চড়ছিল এক বালতি জল আনতে, ছেলেটা পড়ে মাথা ফাটালো, মেয়েটাও পিছন পিছন গড়িয়ে গেল—এই তো? এই সব ছড়া শিখবার জন্য ক্যান যে মাইনসে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে কে জানে।
-তুমি একেবারে বাঙাল। ব্যাপারটাই বুঝছ না। আরে মানে-ফানে দিয়ে কী হবে। মজা হচ্ছে ছড়াটাকে নিয়ে যা করা হল। প্রথমে মৈত্রেয়ী হাতমুখ নেড়ে বাচ্চাদের মতো আধো-আধো উচ্চারণে আবৃত্তি করল। তারপরে বিভিন্ন প্রদেশের মার্কামারা সুরে ভঙ্গিতে ফেলে গাইল। যেমন বাংলা কীর্তন, জ্যাক রে..। তারপর ভোজপুরী, আরে হো জ্যাক হো। কাটকি, জ্যাকম জিলম। হাতে তালি মেরে পঞ্জাবি কাওয়ালি। সকলে ওর সঙ্গে সুর মেলালো। হারীন আর কেতকী যাদের আমরা হ্যারি আর কিটি বলতাম, ওরা স্বামী-স্ত্রী জ্যাক এ রে এ… বলে এমন টান দিত যে বাঘা বাঘা কীর্তনীয়াও হার মেনে যায়। তখন লোকে না হেসে পারে। পার্টি এত জমল যে মাঝরাত পার। পরদিন বাড়িওয়ালার মুখ ভার। ব্যাটা ক্যারা তো, মানে ওড়িশাতে স্থায়ী বাসিন্দা বাঙালি। একটি চিজ। ভূতভূতে, সবসময় ভয়ে সিঁটিয়ে আছে হাঁটতে ভয়, চলতে ভয়, খেতে ভয়। অসম্ভব কনজারভেটিভ, হচিকাসি-টিকটিকি মানে, পাঁজিনা দেখে সকালে বিছানা থেকে ওঠেনা। ভদ্রলোক আমাকে ধরে বললেন,
—আচ্ছা অমলবাবু আপনি গভমেন্ট অফ ইন্ডিয়ার একটা প্রেস্টিজিয়াস ব্যাঙ্কে সিনিয়র পজিসনে আছেন। আবার একটা সর্বভারতীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সভাপতি। আপনার বাড়িতে এরকম রাত কাবার করে হল্লা কি ভাল দেখায়? পাড়াপ্রতিবেশী কী ভাবে বলুন তো? এই বাঙালি কালচারের নমুনা?
-দেখুন নগেনবাবু, আমরা কটি বাঙালি পরিবার দেশের বাইরে থাকি। মাঝে মাঝে একসঙ্গে হয়ে একটু খাওয়াদাওয়া গানটান করি। তাতে এমন কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায় বলুন তো? তাছাড়া আমরা তো বাঙালি জাতির প্রতিভূনই যে সবসময় মেপে চলতে হবে। বাঙালিয়ানা ঠিকমতো বাইরের লোকের চোখে দেখানো হচ্ছে কি না। আমরা নেহাত সাদামাঠা মানুষ। তবে কারও পাকা ধানে মই দিই না। দোষের মধ্যে একটু মদটদ খাই। জানেন তো মাতালরা দরাজ দিল? ভদ্রলোকের মুখ আরও কঠিন হয়।
