একতা ক্লাবের এহেন সংস্কৃতিচর্চা ছাড়াও একটা অন্তরঙ্গ ভূমিকা ছিল—তার ইনার হুইল অর্থাৎকার্যনির্বাহী কমিটি এবং আসল কলকাঠিনাড়া সদস্যদের সামাজিক মেলামেশা। অমল একতার সভাপতি। যদিও সম্পাদক, কোষাধ্যক্ষ সব পদেই লোক বদলে যায় কিন্তু অমল গোজ অন ফর এভার। কারণ সে শুধু সভাপতি নয়, প্রতিষ্ঠাতা। সবচেয়ে বেশি চাঁদা তোলে। স্পনসর জোগাড়ের গুরুদায়িত্বটা তারই স্কন্ধে। এককথায় একতার প্রাণপুরুষ। অতএব, তার বাড়িটা যে একতা ক্লাবের এক্সটেনশন হবে তাতে আশ্চর্য কি। দু-একমাস পরপরই একটা গেট টুগেদার, একসঙ্গে হওয়া। নৈশভোজের বিভিন্ন পদ ও পানীয়ের দায়িত্ব বহন করে তার ঘনিষ্ঠ সদস্যরা সস্ত্রীক। দারুণ জমাটি পার্টি। আচ্ছা হাসি ঠাট্টা গান। মনপ্রাণ খুলে। সবশেষে তাদের একটা বিদঘুঁটে প্রথা পালন—সমস্বরে সঙ্গীত এক জাতি এক প্রাণ একতা।
আর সেই মুহূর্তে চার্চিল জানান দিত তার উপস্থিতি। অমলের জন্মদাতা স্বর্গত হরিচরণ দাস, বি-এ বি-এল-এর কংগ্রেসে যোগদান ছিল একইসঙ্গে ইংরেজ-ভক্ত পিতা ও ইংরেজ শাসনের বিরোধিতা অর্থাৎ এক ঢিলে দুই পাখি মারার সৎ সংকল্প সাধন। তার সুযোগ্য উত্তরাধিকারীর পোষা কুকুরকে চার্চিল নামকরণ জাতীয়তাবাদী পিতার প্রতি আধুনিক যুগোচিত দ্বৰ্থক আনুগত্যের পরাকাষ্ঠা। চৌকো থ্যাবড়ামুখো চার্চিল জাতে বুলডগ এবং স্বভাবে ল্যাপড়গ। ব্যাচেলার অমলের সংসারচালক, পার্শ্ববতী রাজ্যের সুদুর মজঃফরপুর জেলা থেকে আগত বীর সিং-এর সযত্ন তত্ত্বাবধানে চার্চিলের খাদ্যাভাস মোটামুটি তার প্রভুরই সম্পূর্ণ অনুগামী। তার সারাদিন শাওয়াবসা চলাফেরা সবই মানবজাতির অনুকরণে। সোফা ছাড়া বসে না। ঠাণ্ডা জল ছাড়া খায় না। মশলা ছাড়া রান্নায় প্রবল বিরাগ। প্রিয় খাদ্য চাঁদা মাছ, সন্দেশ ও পান। তার প্রভুর মতোই তার স্বভাব। অর্থাৎ অতি মিশুকে। ফলে প্রতিটি পার্টিতে সন্ধে থেকে লিভিংরুমের ঠিক মাঝখানটিতে বপুটি স্থাপন করে সামাজিকতায় অতি সক্রিয় চার্চিল। স্মিতমুখে অতিথিদের এর ওর মুখের দিকে তাকায় ল্যাজ নাড়ে এবং তাদের সঙ্গে একই তালে তার পানীয় না হোক খাদ্যের আস্বাদন চলে। প্রথমে তার আচরণ অতি সুসভ্য পরে অতি অসভ্য। রাত সাড়ে এগারোটা নাগাদ পর্যাপ্ত খাদ্যপানীয়ে আর পাঁচজনের মতো সেও যখন পরিতৃপ্ত, সকলে যখন একমত যে বাঙালির কি হবে না, কলকাতা মনুষ্যবাসের অযোগ্য অতএব, ছাড়ো বাংলা, মেরা ভারত মহান এবং সমবেত কণ্ঠে গান একজাতি একপ্রাণ এক, তখন কিনাহুমদোমুখো জাতে বুলডগ স্বভাবে ল্যাপড়গ চার্চিলের মুখচোখে ফুটে উঠত একটা অসম্ভব কষ্টের ভাব। এবং অচিরে পিছনের ঠ্যাং তুলে সশব্দে বায়ুত্যাগ। ব্যস একজাতি একপ্রাণ একতার ফুলে-ফেঁপে ওঠা বিশাল তেরঙা বেলুনটি ফুটো। পাংচারড। উত্তর কলকাতার কংগ্রেসের স্থায়ী ভোটব্যাঙ্কর প্রতিনিধি মুখুজ্যে বাঁড়ুয্যে ঘোষ বোস কুণ্ডু পাল সবার একযোগে অভিযোগ,
—অমলদা আপনার কুকুরকে সামলান।
–ওকে অত কাজু আর পাকোরা খেতে দিলে কেন?
—প্লেটে ঢেলে সেন আবার একটু বিয়ার দিয়েছিল না?
–কুকুরের পেটে এ সব সহ্য হয় না।
সৌমেন ইতিহাসের ভাল ছাত্র ছিল—এখন যদিও টায়ার বেচে—সে গম্ভীর মুখে বলে,
—একেই বলে ইম্পিরিয়ালিজম। রোয়াব দেখেছেন? মরেও মরে না। রক্তবীজের বংশ। দাদা আপনার চার্চিল কিন্তু ইংরেজদের স্পাই। নির্ঘাৎ। ঠাট্টাতেও পার্টির মেজাজ ফেরে না। সবাই কেমন অপ্রতিভ। মানবেতর একটা সামান্য প্রাণীর অকিঞ্চিৎকর নেহাত জান্তব ক্রিয়াতে ভদ্রসভ্য সমাজের বিশিষ্ট মানুষজন কুপোকাৎ। এ অবস্থায় পার্টির মুড ফেরাতে পারে একমাত্র একজন। কে আবার। বিপত্তারিণী মৈত্রেয়ী চক্রবর্তী। তাকে ছাড়া অমলের বাড়িতে বা বাইরে কোথাও কোনও অনুষ্ঠান জমায়েত ভাবতেই পারা যেত না। সত্যি কথা বলতে কি তাকে ছাড়া অমলের জীবনেই বা কী ছিল? তার বাড়ির আসবাবপত্র পর্দা বাসনকোসন কেনা থেকে চাকরের ট্রেনিং খাবার মেনু লোক-লৌকিকতা সবেতেই মৈত্রেয়ীর উপস্থিতি। এমনকি তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের হদিস পর্যন্ত মৈত্রেয়ীর হেফাজতে। সেই তো অমলের ঠিকঠিকানা। বাবা-মা দাদা-দিদি দূরে, নিকট রক্তের সম্পর্ক তো কবে শিথিল হয়ে গেছে।
দাঁড়ান দাঁড়ান, একটু খোলসা করেন। ছায়ার চোখেমুখে উৎসাহ উপচে পড়ছে। এতক্ষণে আপনার হিরোইনরে পাইলাম। তা ঠিকভাবে গোড়া থিক্যা বলেন, মৈত্রেয়ী কে, কেমন চেহারা, কোথায় প্রথম দেখা–
–আঃ, অমল বাধা দেয়। আমি কি তোমার জন্য ধারাবাহিক উপন্যাস লিখছি না কি। আমার দ্বারা ওসব হবে না। আরে বাবা আমি তো তোমাদের নামডাকওয়ালা সাহিত্যিক নই। ব্যাঙ্কে চাকরি করেছি সারা জীবন। কাটখোট্টা মানুষ। ওসব রসকষ আমার নেই।
—বারে! এই যে বললেন আপনি ছিলেন সর্বভারতীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সভাপতি, আর এখন বলেন আপনার রসকষ নাই।
-ওহো তুমি তো দেখছি আমার কাহিনীর কিছুই বুঝতে পারনি। আমার কাজ ছিল সংগঠন। ছোট-বড়-মাঝারি আর্টিস্ট ভুবনেশ্বর-কটকে এনে ছোট-বড়-মাঝারি ফাংশান অর্গানাইজ করা। সারা ওড়িশাতে আমাদের মতো রেকর্ড কারও নেই জানো। এসবের জন্য টাকা জোগাড়, আর্টিস্টদের খাওয়া-থাকার বন্দোবস্ত, হল-এ সিকিউরিটি, সাউন্ড সিস্টেম দেখা এইসব ছিল আমার কাজ। এটাই তোমাদের ওই কালচারের প্রাণ, বুঝলে?
