– সেইটাই তো মুশকিল। আবার লেডিজও থাকেন। আমি বলছি না সেটা খারাপ কিছু। সবাই নিজের পরিবার নিয়েই আসেন। কিন্তু স্ত্রী-পুরুষ মিলে এমন হল্লা, মদ খাওয়া এগুলো ঠিক আমাদের কালচারে….
—আরে রাখুন মশায় আপনাদের কালচার।
–এটা কিন্তু অমলবাবু ঠিক সঙ্গত হল না। ব্যাজার মুখে নগেন পালিত দোতলায় উঠে গেল। ন্যাকা আর কি। তুমি কে সঙ্গত অসঙ্গত বিচার করবার? তোমার নিজের দাদা তো স্ত্রী ব্রেস্ট ক্যান্সারে মারা যাওয়ার পর বছর ঘুরতে না ঘুরতে ষাটের ওপর বয়সে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছেন। সেটা খুব সঙ্গত না? শালা ক্যারা। ঠিকই করেছে ওড়িয়ারা তোমাদের ক্যারা নাম দিয়ে। বাড়িটা ভাড়া দিয়েছ তো বাজারের রেট থেকে বহু বেশিতে। তখন তো কত তেলানো রোজ অফিসে এসে বলতে স্যার, বাঙালিকে বাঙালি না দেখলে কে দেখবে। তারপরের পার্টিতে তিন রাউন্ড ড্রিংকের পর চেঁচিয়ে সবাই মিলে বলতে লাগল। ভারি অসঙ্গত হেলা,বুঝিলে ভারি অসঙ্গত হেলা। শেষে মৈত্রেয়ীর ধমকে চুপ। ওকে অত ইম্পর্টেন্স দিচ্ছ কেন। ব্যাপারটা কি ফাজলামি ফোককুড়ির পর্যায়ে রয়ে গেল নাকি শেষে বহুদূর বিস্তৃত হল তার ফলাফল? অমলের বরাবর সন্দেহ এই নগেন পালিত, রিটায়ার্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার অফ সেলস ট্যাক্স তার বিরুদ্ধে বম্বে হেড অফিসে অভিযোগের মূলে। ব্যাটা নিজে দুপয়সা করেছে। ঘাঁৎঘোঁত সব জানা। ভুবনেশ্বর অফিসে মাসে মাসে ভাড়ার চেক আনার ছুতোয় যাতায়াত ছিল। অফিসের স্টাফ তো সবই স্থানীয়, আর ক্যারাদের তো এদের সঙ্গেই ভাব-ভালবাসা। সবসময় ঘোঁট পাকানো অভ্যেস। না, প্রমাণ কিছু নেই নগেন পালিতের জন্যই তার চাকরি জীবনের এক সন্ধিক্ষণে এত বড় একটা ধাক্কা এসেছিল। তার বাদবাকি কেরিয়ার, পোমোশন
—আপনি কোথা থেকে কোথায় আইস্যা গ্যালেন। বাপ-ঠাকুরদার কথা শ্যাষ হইল। নায়িকাটা তো দরকচা মাইর্যা রইল। এদিকে আপনি চাকরি-বাকরির কথায় চইল্যা আসলেন। চাকরির কথা পরে হইব। আসল গল্পের কী হইল? প্র্যামের কথা না হইলে আর কাহিনী কী?
–উঃ ছায়া। ওই মাইরা চইল্যা এ্যাম কি চলে নাকি! একটু ভদ্র বাংলা বলল।
–খুব চলে। তবু তো বাংলা বলি। আপনাগো ভারতীয় বাংলা তো আই লাভিউ ইলু ইলু। তাই যদি সোনামুখ কইর্যা শোনেন তা হইলে এ্যাম কী দোষ করল? বলেন তারপর কী হইল।
—আবার তারপর কী হল। না, তোমার ওই ধারাবাহিকের জুলুম চলবে না। শুনতে হয় তো তার আগে কী হয়েছিল শোনো।
ঠাকুরদা বিষ্ণুপদ দাসের সংসারে প্রয়োজনবোধে জন্মতিথি মানা হত। কনিষ্ঠ পুত্র হরিচরণের কনিষ্ঠ পুত্র অমলের আবির্ভাবের পর থেকে জন্মদিন চালু। কারণ সে জন্মাল ১৮ই আগস্ট ১৯৪৬, দাঙ্গার মধ্যে। দি গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং। যখন কলকাতা শহর জুড়ে বন্দেমাতরম্ আল্লাহহাআকবর বোমা আগুন আর্তনাদ। সেই ডামাডোলের মাঝখানে বেআক্কেলে মাঝবয়সী ছোট বউ সময়ের দুহপ্তা আগে প্রসববেদনা উঠিয়ে বসলেন। বৃদ্ধ কর্তা থেকে প্রায় প্রবীণ স্বামী, সব পুরুষবীরদের হাত-পা পেটের ভেতরে। ভাগ্যে অমলের মা সুধাময়ী আগের দিনের অভিজ্ঞতায় দুরস্ত ছিলেন এবং মাঝের দুটির বেলা ডাক্তার হাসপাতাল ইত্যাদি আধুনিক বিজ্ঞানলব্ধ সুব্যবস্থা এবং স্বাচ্ছন্দ্যে বিগড়ে যাননি। আরও ভাগ্য সে সময় বাড়িতে উপস্থিত অমলের ডাকসাইটে বহুপ্রসবিনী বড় পিসি। আঁতুড় সামলাতে তার দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা দুই-ই প্রচুর। পিত্রালয়ের ঠুটো পুরুষবীরদের প্রতি বাক্যবাণসহ কোমরে আঁচল জড়ালেন।
–বলিহারি বুদ্ধি-বিবেচনা তোমাদের। বলি তোমাদের সুবিধা-অসুবিধা মেনে কি পেটের ছেলে জন্ম নেবে। তোমাদের সকলের ওপরে যিনি, তার ইচ্ছেয় সে আসবে।
সকলের ওপরে যিনি তার ইচ্ছের বহর নিরাপদ নির্ঞ্ঝাট প্রসবের বেশি কিছু বলে মনে হল না। জন্মদিনটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব সত্ত্বেও আমাদের নায়কটির নায়কোচিত কোনও গুণ দেখা যায়নি। হ্যাঁ, তার নামকরণটির একটা তাৎপর্য ছিল। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের কালিমা যেন তার এই সন্তানটিকে কখনও মলিন না করে এই প্রার্থনায় একজাতি একপ্রাণ একতায় দৃঢ় বিশ্বাসী হরিচরণ দাস, বি এ বি এল নাম রাখলেন অমল। পিতার দেশভক্তি, ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে জন্ম নামকরণের মর্ম কোনও কিছুই অমলকে অসাধারণত্ব প্রদান করেনি। অমল সব দিক দিয়েই একেবারে সাধারণ। তার বাল্যকালে দুরন্তপনার কোনও মজাদার ঘটনা নেই। কৈশোরে দেখা যায়নি কোনও প্রতিভার পূর্বাভাস। অন্যান্য বাঙালি নায়কদের মতো তার রাজনীতিতে রুচি নেই, ইডিওলজি নিয়ে নেই মাথাব্যথা রোমান্টিকতার ধার ধারে না। সিনেমার হিরোদের মতো কোনদিন বেকার প্রেমিক হয়নি। তার শিক্ষাদীক্ষাও গতানুগতিক পথে। প্রথমে পাড়ার আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র বিদ্যালয়ে। জাতীয়তাবাদের জোয়ারে দিশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের হুজুগে গজিয়ে-ওঠা একটি হাইস্কুল যার গভর্নিং বডিতে হরিচরণ দাস বি এ বি এল-এর সর্বদা উপস্থিতি। বাড়ির সব ছেলেদের হাতেখড়ি আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রে। সারাটা স্কুলজীবন অমলের কেটেছে কোনও বিশেষ তাৎপর্য ছাড়া। পড়াশোনা খেলাধুলো ডাকটিকিট জমানো কোনও কিছুতেই অমলের তেমন বিশেষ উৎসাহ ছিল না। দাদারা এসব করেছে, তাই যেন সেও করতে বাধ্য। ইচ্ছে অনিচ্ছের প্রশ্ন নিরর্থক।
