-স্যার আপনার কথাতেই মুর্তি গড়তে দিয়েছিলাম, সবিনয়ে মনে করায় অমল। নিরুপায় ভঙ্গিতে হাত ওল্টান মুখ্যমন্ত্রী।
—দেখ, জনমত রবীন্দ্রনাথের মূর্তি প্রতিষ্ঠার বিপক্ষে। আমি কী করব। জনমত গঠনে সংবাদপত্রের ভূমিকা এবং সংবাদপত্রের মালিকানায় স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠদের স্বার্থ ইত্যাদি সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা যেত। কিন্তু অমল তুলতে পারল না। ভোলার অধিকার কি তার ছিল? সে তো এখানে বহিরাগত, এ মাটিতে তার শিকড় নেই, কেউ তার আপন নয়। কোনও রাজনৈতিক দল, কোনও সংস্থা তার হয়ে কড়ে আঙুলটি ওঠাবে না। সংবাদপত্র নেহাত করুণা হলে নীরব থাকবে,নইলে বিরোধিতা করবে। যেমন এ ক্ষেত্রে করেছে। অতএব সে শুধু বলে
-স্যার, আপনার কংগ্রেস দল থেকেই প্রস্তাবটা এসেছিল। ওয়েস্ট বেঙ্গলের হেমেন মিত্রর কথাটা নিশ্চয় মনে আছে?
সামান্য মাথা হেলালেন মুখ্যমন্ত্রী, হ্যাঁ। অমল অপেক্ষা করে। মুখ্যমন্ত্রী আবার হাত ওল্টান—যেন ওই একটি মুদ্রাই মুখ্যমন্ত্রীপদে স্বাভাবিক,
–পাবলিক হস্টাইল। কিছু করবার নেই।
-কিন্তু স্যার আমরা যে মূর্তিটা গড়িয়ে ফেলেছি। ভুবনেশ্বরে সেটা আনানো হয়ে গেছে। ফাংশানের প্রোগ্রাম সব রেডি। শুধু তো মূর্তি বসানো নয়, তার সঙ্গে একটা নাটক হবে। কলকাতার বিখ্যাত শুভনাট্য সংস্থা আসবে। রবীন্দ্র মণ্ডপ বুকিং হয়ে গেছে, তাদের অ্যাডভান্স দিয়েছি, কার্ড ছাপানো অন্যান্য ব্যবস্থা সব কমপ্লিট। এত কাকুতি মিনতি অমল জীবনে আর কখনও করে নি (অবশ্য টাকার কথাটা বানানো। শুধু টিকিটের খরচ দেওয়া হয়েছে)। যেন একশো বছর আগের কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা। বিয়ের আসর থেকে পাত্র উঠে চলে যাচ্ছে, যে কোনও মূল্যে তাকে সম্প্রদান সারতে হবে, নইলে জাত যাবে। সে আর সে থাকবেনা। গল্পে উপন্যাসে সিনেমায় এই পরিস্থিতিতে একজন উদার তরুণের পরিত্রাতা হিসেবে উদয় হয়—বলাবাহুল্য তিনি নায়ক এবং আসল পাত্রের চেয়ে সর্বাংশে শ্রেষ্ঠ-কিন্তু অমল কুমারের কাহিনী কল্পনাপ্রসূত, যা হলে ভাল হয় এমন প্রত্যাশাপূরণ নয়। নেহাৎ প্রতিদিন যা ঘটে। অতএব একই রকম নিস্তেজ গলায় মুখ্যমন্ত্রী বলেন,
–ফাংশানটা পিছিয়ে দাও। পাবলিক মেমরি ইজ সর্ট। আজকে হৈ চৈ করছে ব্যাপারটা গরম আছে বলে। কিছুদিন বাদে ভুলে যাবে।
—তাহলে স্যার একটা টেনটেটিভ ডেট কাইন্ডলি যদি দেন। জাহাজড়োবা যাত্রীর ভেসে থাকবার শেষ চেষ্টা। একখানা তক্তা অবলম্বন। আপাতনির্দিষ্ট তারিখের আশ্রয়ে মানরক্ষা। পৃথিবীর কাছে অমলকুমার দাসের মুখ দেখানোর শেষ আশা।
—সে পরে দেখা যাবে, মুখ্যমন্ত্রী ঘন্টি বাজান। পরবর্তী দর্শনপ্রার্থীর সঙ্গে কথা বলবেন। অমলের জন্য আর সময় নেই।
-নমস্কার স্যার কথাটা একটু মনে রাখবেন, অমল উঠে পড়ে। উত্তরে মুখ্যমন্ত্রী অতি অল্প মাথা হেলান।
অফিসে ফিরে আসে অমল। ভাবতে চেষ্টা করে যেন কিছুই হয়নি। সত্যি এমন কি হয়েছে। বড়দা ঠিকই বলেছিলেন ওড়িশাতে রবীন্দ্রনাথের একটা মূর্তি বসল কি বসল না তাতে কার কী এসে যায়। মূর্তিটি পড়ে আছে অমলের গ্যারেজে। থাক না। তার জীবিকা দেশে নতুন শিল্পোদ্যোগে সহায়তা। আজ ভুবনেশ্বর কাল হয়তো হায়দ্রাবাদ বা বম্বে। আর পাঁচজন প্রবাসী বাঙালির সঙ্গে মিলে একটা ক্লাব করেছে। সেখানে বিধিমতো এর বউ-এর গান ওর মেয়ের নাচ কি ছেলের আবৃত্তি হওয়ার কথা। অত্যন্ত নিচু পর্দায়। স্থানীয় জনগণের অর্থাৎ প্রভাবশালী মধ্যবিত্তের গায়ে জ্বালা ধরাবে না। স্থায়ী কিছু করার স্বপ্ন, অন্য মাটিতে শিকড় ফেলার চেষ্টা কি প্রবাসীর সাজে। ওড়িশা কর্ণাটক মহারাষ্ট্র গুজরাটে কেন বাঙালির নিজস্ব সত্তা বজায় রাখার চেষ্টা? বাঙালির আছেটাই কী?
ঠাকুরদার সময় কবেই গত। সত্তরের দশকে সে জীবিকা অর্জনে নেমেছে। তখন থেকে একটানা দেখে আসছে ব্যবসাবাণিজ্য শিল্পায়নে অর্থাৎ তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বাঙালির সম্পূর্ণ ব্যর্থতা। কলকাতায় তার চাকরি জীবনে প্রথম কবছরের কথা মনে পড়লে এখন আর ক্ষোভ দুঃখ রাগ কিছুই হয় না। শুধু কতগুলো ছবি মনে ভাসে। প্রথম ছবিতে টিটাগড় বা হাওড়ার একটি বিরাট শেড, বিশাল প্রাগৈতিহাসিক চেহারার যন্ত্রপাতি তলায় শিরোনাম,উপনিবেশে শিল্পোদ্যোগ ১৮৮০। এর মধ্যে একটির কাজকর্ম দেখাশুনার দায়িত্ব ছিল অমলের ১৯১৯ সালে। দ্বিতীয় ছবিতে বড় সাহেব বারীন মিটার, সুদর্শন অভিজাত একদা ব্রাহ্ম পরিবারের সন্তান, পরনে নিখুঁত থ্রিপিস স্যুট, মুখে পাইপ, দেখলেই বোঝা যায় থ্রি কোর্স লাঞ্চ খান টলি বা বেঙ্গল ক্লাবে ড্রাই মার্টিনি সহ, জিভের স্বাদ তৈরি হয়েছে। নির্ভুল সাহেবি ইংরিজি উচ্চারণে। এ ছবির তলায় লেখা, কোই হ্যায় জমানা, ১৯৩৮। অমল অবশ্য তার অধীনে কাজ করেছে ১৯১৯ থেকে। তৃতীয় চিত্রটিতে বিরাট পোস্টার তাতে একসার উদ্ধত মুষ্টি বাহু, মাধো গিরিধারি পঞ্চা জগু মধু মানিকদের। পিছনে এক সারি লাল তেরঙা পতাকা। তলায় লেখা জাতীয় শ্রমিক সংহতি ১৯৭১। যে যার সময়ের খাঁচায় আটকা। সেই টাইম মেসিন।
কিন্তু কাস্তে হাতে ভয়ঙ্কর দর্শন সময়প্রভু তো কাউকে ছেড়ে দেন না। ছবি সব মুছে যায় কোলাহলে, শ্লোগানের পর শ্লোগান, ভাঙচুর, গেট বন্ধ কারখানা। বারীন মিটারের পাইপটা পায়ে পায়ে ভেঙে টুকরো টুকরো, টাই মেঝেতে গড়াগড়ি। আজও এই ১৯১৪ সালেও অমলের কানে ভাসে আকাশ ফাটানো পুঁজি তাড়ানো দেবব্রত মুখুজ্যে কি বেণীপদ বাঁড়ুজ্যের জ্বালাময়ী বক্তৃতা। না, এঁরা কারখানার মজদুর নন, পেশাদার শ্রমিক নেতা। জাতে তালাওয়ালা। চাবিওয়ালারা যেমন হেঁকে হেঁকে যায় তাদের চাবি তৈরির কুশলতা, এঁরা জারি করে বেড়ান তালা লাগানোর প্রতিভা। এঁদের ভাষা বাংলা হিন্দি, হিন্দ বাংলা, হিন্দি হিন্দি বাংলা, হিন্দি হিন্দি….। যেন হিন্দি বললেই হিন্দুস্থানের সব মজদুর এক হবে, যেন হিন্দি হিন্দুস্থানের মজদুরদেরই ভাষা, হিন্দুস্থানি পুঁজিপতির ভাষা নয়, যেন হিন্দিভাষী বাঙালি মজদুরের মুখের গ্রাস হিন্দিভাষী গুজরাটি মরাঠি কন্নড় মজদুর কেড়ে নেবে না। যে জাত নিজেদের ছেলেমেয়েরা কী খাবে কেমন করে বাঁচবে কী ভাষা বলবে চিন্তা করে না তাদেরই একজন অমলকুমার দাস। ভারতীয় উপমহাদেশে তার জন্মকর্ম এমন সময়ে যখন বাঙালি মানে একটি দুর্ভাগ্য; পৃথিবীর একমাত্র মানবগোষ্ঠী যারা পরাধীনতার বদলে বেছে নিয়েছে দাসত্ব।
