কী লাভ বাঙালি হয়ে। অমল তো বাংলা ভাষাটাই তেমন জানে না। বাংলা সাহিত্যে তার দৌড় স্কুলের দরজা ডিঙোনো পর্যন্ত। বাঙালির চিত্রকলা ভাস্কর্য তার কাছে কটা আবছা নাম, অবনীন্দ্রনাথ কি নন্দলাল দেবীপ্রসাদ বা রামকিঙ্কর। খবরের কাগজে পড়েছে। বটে জগদীশচন্দ্রের আবিষ্কার চুরি করে কোন সাহেব নোবেল প্রাইজ পেয়েছে। সত্যেন বসু আইনস্টাইনের খুব নীচে নন। কবে কোন্ বাঙালি বিজ্ঞানী আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সম্মান লাভ করেছেন বা করেননি এসব নিয়ে তার রক্ত গরম হয় না। শুধু বাংলা গান শুনতে তার ভাল লাগে, বাঙালি রান্না খেয়ে তার তৃপ্তি। মাত্র এটুকুর জন্য ওড়িশা কর্ণাটক মহারাষ্ট্র গুজরাটে অর্থাৎ ইন্ডিয়ায় স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বজায় রাখার চেষ্টা হাস্যকর নয় কি? ইন্ডিয়ান পরিচয়ই যথেষ্ট। হ্যাঁ যথেষ্ট।
যথেষ্ট হলেও চিঠিটা অমলের সামনে। এখনও। টেলিফোনে লাগায় একতার সেক্রেটারি সুজিতকে। জরুরি বৈঠক ডাকা দরকার। কঘণ্টার নোটিস হলেও একজিকিউটিভ কমিটির সকলেই হাজির। পত্রবোমাটি পড়ল। বিস্ফোরণ আলোড়ন জখম যন্ত্রণা। সকলের একসঙ্গে কথা। ক্ষোভ রাগ দুঃখ। একমাত্র সুজিত চুপ। অমল জিজ্ঞাসা করে,
—কী হল সুজিত? তোমার দেখছি কোনও রিঅ্যাকসানই নেই।
—আমি দাদা প্রথম থেকেই ভয়ে ভয়ে ছিলাম। ব্র্যহস্পর্শ তো। পিণ্ডি জ্বলে যায় অমলের। ক্যারাদের ক্যাওড়ামি। পাঁজি দেখে ওঠাবসা।
—শনি রাহুফাহু কিছু করল বলছ?
-না দাদা তার চেয়েও ভয়ঙ্কর। ওড়িয়াতে একটা প্রবাদ আছে, কাদের কাছ থেকে সাবধানে থাকতে হয়—পুরী ব্রাহ্মণ কটক করণ ভদ্ৰকপঠান জাজপুর সর্বসাধারণ। আপনার সেক্রেটারি অফ কালচার কবি ব্রজেন্দ্র রথ পুরীর ব্রাহ্মণ, চিফ মিনিস্টার কটকের করণ অর্থাৎকায়স্থ আর আপনার ডিয়ার ফেন্ড অনিলেন্দুর গাঁ জাজপুরে। তাই বলছিলাম ত্র্যহস্পর্শ।
সবাই হাসে। উত্তেজিত টান টান ভাবটা একটু শিথিল হয়। রণজিৎ প্রশ্ন করে,
—জাজপুর ব্যাপারটা একটু খোলসা কর। আর পঠান কী?
—চলিত ওড়িয়ায় মুসলমানদের পঠান বলে, ভদ্রকে বেশ কিছু মুসলমানের বাস, বহুদিন ধরে। জাজপুর হচ্ছে ওড়িশার সবচেয়ে ঘঁাচোড় বদমায়েশদের জায়গা। ওখানে লোকে রাতে ঘুমোবার সময় বুড়ো আঙুলে ন্যাকড়া জড়িয়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে শোয়, পাছে ঘুমের মধ্যে কেউ টিপসই নিয়ে যায়। আপনার অনিলেন্দু জাজপুরের যোগ্য সন্তান। সুবিনয় যোগ করে,
-কত খেয়েছে আর মাল টেনেছেএকতার ঘাড় ভেঙে। আপনি তো দাদা অনিলেন্দু অনিলেন্দু করে একেবারে অস্থির। আমাদের সব জমায়েতে ব্যাটার ফ্রি নেমন্তন্ন।
প্রদীপ ছাড়ে না।
-আর ওর ছেলের সেই কলকাতার ডেন্টাল কলেজে অ্যাডমিশান? আপনিই তো কলকাতায় গিয়ে সি-পি-এম হেল্থ মিনিস্টারকে ধরাধরি করে কত কাঠখড় পুরিয়ে…
অমল বাধা দেয়,
–থাকগে ওসব পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটে লাভ নেই। এখন আমাদের কী কর্তব্য ঠিক কর। অনিলেন্দু নিয়ে কোনও আলোচনায় যায় না। কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে কার ভাল লাগে।
-কিছুই কর্তব্য নেই, আমার এই মত, সুজিতের উত্তর।
–নেই মানে। বলি ফাংশানের কী হবে? কদিন মোটে হাতে সময় খেয়াল আছে?
—আছে বলেই তো বলছি। ফাংশানে টাংশানে দরকার নেই। এখানে আর কোনও বাঙালি অনুষ্ঠান নয়। সুজিতের দৃঢ় মত এবং সকলের সমবেত প্রতিধ্বনি। ঠিক ঠিক আর ওসব দরকার নেই। এত ঝামেলা এখানে।
-কিন্তু শুভমনাট্যসংস্থা কী দোষ করল? ওদের সম্বন্ধে কাগজে কেউ কিছু লেখেনি। তাছাড়া ওদের বায়না দেওয়া হয়েছে। এদিকে ওদের থাকাখাওয়া বন্দোবস্ত রেডি।
-কিন্তু ফাংশানটা আদৌ হবে কী করে? কার্ডে তো পরিষ্কার লেখা ২২ শে শ্রাবণ রবীন্দ্রমূর্তি প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে অনুষ্ঠান। তার কর্মসূচীর একটি শুভম-এর নাটক। মূর্তি প্রতিষ্ঠা নেই, অনুষ্ঠান হবে, এটা কী রকম?
—নতুন বয়ান তৈরি কর, আরেক সেট কার্ড ছাপাও।
–কে করবে? কে দায়িত্ব নেবে? একদিনের মধ্যে ছাপিয়ে বিলি করবে কে?
–স্থানীয় লোকেরা যে হল্লা করে ফাংশান বানচাল করবে না তার গ্যারান্টি কী?
–পুলিশের ছব্বা তো জানা আছে। ভুবনেশ্বরে রেপ-মার্ডার এসব ক্রাইমেরই কনভিকশান হয় না। কাগজে তারপর আবার কী লিখবে দেখ!
–এই তো সুজিত কদিন আগেই বলছিল একজন অবসরপ্রাপ্ত বাঙালি অফিসার ভুবনেশ্বরে তাঁর বাড়িটা বিক্রি করে দিল্লিবাসী হয়েছেন বলে ওড়িয়া কাগজে কী প্রচণ্ড বিরুদ্ধ সমালোচনা বেরিয়েছে। নিজের আইনসঙ্গত উপার্জনে তৈরি সম্পত্তি ইচ্ছেমত বিক্রির অধিকার পর্যন্ত এখানে আমাদের নেই। এই তো অবস্থা। অমল ডান হাত তোলে, অভয়দান মুদ্রা।
-আকী যে শুরু করেছ তোমরা। অবস্থাটা সেরকম খারাপ নয়। ওভার রিঅ্যাক্ট করছ কেন। ঠাণ্ডা মাথায় ভাবো। এই সুজিতই আমাকে গল্প করেছে, কটকে কত পয়লা বৈশাখ রবীন্দ্রজন্মোৎসব বিজয়া সম্মিলনীতে কলকাতা থেকে নামী কবি সাহিত্যিক এসেছেন। বারবাটি স্টেডিয়ামে তিন দিন ধরে উৎপল দত্তের গ্রুপ নাটক করে গেছে। ব্যারিকেড, টিনের তলোয়ার আরও কী। ভুবনেশ্বরে ওই রবীন্দ্র মণ্ডপেরই চৌহদ্দির মধ্যে খোলা জায়গায় করাত ধরে চলেছে শান্তিগোপালের বাংলা যাত্রা। কই কেউ আওয়াজ দেয়নি তো।
-সেটা দাদা আগেকার কথা। তখনও নতুন ভুবনেশ্বর ছিল পুরনো কটকের লেজুড়। আর কটকে তো জানেন ওড়িয়া বাঙালি বহু বছরের সম্পর্ক। সুখেদুঃখে ভালমন্দে একসঙ্গে পাশাপাশি জীবন। বাঙালিদের প্রতি ন্যায্য অন্যায্য রাগ-ঈর্ষা যতই থাকুক কোথাও একটা পারস্পরিক আদানপ্রদানের ইচ্ছে ছিল, মেধা-প্রতিভা স্বীকারের ঔদার্য ছিল। কটকে আমি যে স্কুলে পড়েছি তার হেডমাস্টার হরিহর মিশ্র চমৎকার বাংলা বলতেন। রবীন্দ্রনাথের কত কবিতা ওঁর মুখে শুনেছি। এছাড়া হিস্ট্রির স্যার। উকিল রামকৃষ্ণ পট্টনায়ক, ডাক্তার নিকুঞ্জ মহান্তি সবাই বাংলা উপন্যাসের ভক্ত। বাড়িতে ওঁদের মিসেসরা পর্যন্ত অনুরূপা দেবী নিরুপমা দেবীর লেখা পড়তেন। তারপর আমাদের চোখের সামনে সব পাল্টে গেল। এখন সরকারই সব। ভুবনেশ্বর নতুন দিল্লির হাবভাব চালচলন কপি করে। কটক হয়ে গেছে মফস্বল। পয়লা বৈশাখ অনুষ্ঠান হয় ওড়িয়াতে। কলকাতা থেকে আদৌ যদি কিছু আনা হয় তা সতী পেল না পতি গোছের যাত্রা। এত লম্বা স্পিচ সুজিত জীবনে আর কখনও দিয়েছে?
