–বাঃ এক দিন দেখি ভালই ঘুমাইসেন, সহাস্য মন্তব্য ছায়া দেবনাথের। ওর এই ঘরে ঢুকে প্রেসার মাপা, গায়ের তাপ দেখা, এসব আজকাল স্রেফ ভড়ং বলে মনে হয় অমলের। পোশাকটাও তো অদ্ভুত, নার্সের ক্যাপ নেই মাথায়। পরনে নেই সাদা থান, গায়ে আবার ডাক্তারদের মতো সাদা কোট। জিজ্ঞাসা করলে বলে ও নাকি স্পেশাল নার্স, ট্রেনিং-এ আছে। রীতিমতো সন্দেহজনক। মেয়েটা এক নম্বরের মিথ্যেবাদী। আজকে ঘরে ঢুকেই সবেধন নীলমণি চেয়ারটা টেনে অমলের কাছে এসে বসে। অমল যথারীতি জানালার পাশে খাটে আধবসা।
–আচ্ছা আপনার হিরো আর হিরোইন দুইজন দুইটা শহরে। কখনও চিঠিপত্র ল্যাখে না? একটা.জব্বর এ্যামপত্র না হইলে আর কাহিনী কি।
-দুর! এসব মান্ধাতার আমলের বাঙালি ন্যাকামি রাখো তো। প্রেমপত্র, ফুলকাটা নীলরঙের চিঠির কাগজ, পাখীআঁকা নীল রঙের খামে যাও পাখী বলো তারে সে যেন ভোলে না মোরে।
-হা হা হা, হি হি হি। এসব ছিল নাকি আপনাগো ব্যাংগলে। ছায়া দেবনাথ হেসে কুটোপাটি। একবার শুনেই তার মুখস্থ, বারবার আওড়ায় যাও পাখী আঃ কী হচ্ছে ফাজলামি, ধমক লাগায় অমল। হাসি থামায় ছায়া।
-তাহলে আপনার কাহিনীতে চিঠিপত্রের কারবার নাই বলসেন?
আছে বৈকি চিঠিপত্রের কারবার। পুরো একতাগোষ্ঠী প্রেমিকের মতো অধীর প্রতীক্ষায় ছিল একটি উত্তরের। অবশেষে বাইশে শ্রাবণের দিনদশেক আগে অমলের হাতে পৌঁছাল সেই বহু প্রত্যাশিত পত্র। নীলনয় বালি রঙের খামে, পাখীর ছবির বদলে বেগুনী সীলমোহরে আবছা ডিপার্টমেন্ট অফ কালচার, গভনমেন্ট অফ ওড়িশা। দুরু দুরু বক্ষে প্রেমপত্রটি খোলা হল। সরকার অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছেন যে একতা সাংস্কৃতিক সংস্থার রবীন্দ্রমণ্ডপে রবীন্দ্রমুর্তি উপহারদানের প্রস্তাব তারা প্রত্যাখ্যান করছেন কারণ সরকারি গৃহে বেসরকারি দান গ্রহণ নিয়ম বহির্ভূত।
দু লাইনের সংক্ষিপ্ত চিঠি। অমল তবু বার কয়েক পড়ে। সবসুদ্ধ ছত্রিশটা শব্দ। কয়েকটি মাত্র শব্দে, দুটি মাত্র ছত্রে লুকিয়ে আছে কত অসীম ক্ষমতা। একটি অণুর অন্তরে হিরোসিমা। বাইরে তার প্রকাশে অমলকুমার দাসের পুরো দুনিয়াটাই বিধ্বস্ত হয়ে যেতে পারে। আর তার তেজস্ক্রিয়ার রেশ মারক ব্যাধি হয়ে কত জীবন কত সম্ভাবনাকে বিনষ্ট করে দেবে হয়তো চিরতরে। একযুগ ধরে যে অস্তিত্ব সে তিল তিল করে গড়ে তুলেছে, যে বিশাল কাট আউট সাইজে আমি–যেন জয়ললিতা কি অমিতাভ বচ্চন-আজ তার পায়ের তলায় শক্ত ভিতটা কই। সবচেয়ে বড় কথা মৈত্রেয়ী। তার সামনে অমল দাঁড়াবে কোন মুখ নিয়ে। যে অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে তাদের মরে হেজে যাওয়া সম্পর্কে এক নতুন জোয়ার আসব আসব করছে—সেটাই যদি না হল তাহলে স্রোতটার পরিণতি কী?
বা, এত সহজে অমলকুমার দাস হার মানবে না। তাছাড়া সরকারের এরকম মত শেষ কথা হতেই পারে না। মানে যাকে আদালতের ভাষায় বলে উইদাউট অ্যাপ্লাইং মাইন্ড, যথাবিহিত মনঃসংযোগ না করে কে না কে দুম করে দুলাইন লিখে দিয়েছে। যতসব রুল অন্তপ্রাণ কেরানি সেকশান অফিসারের কাজ। উচ্চস্তরের কেউ হয়তো পড়েইনি। অভ্যাসমতো না দেখে সই মেরেছে। একেই তো বলে আমলাতন্ত্র।
অমল বেরিয়ে পড়ে। সেক্রেটারিয়েটে তার প্রথম টারগেট সংস্কৃতি দপ্তর। পি এ প্রাইভেট সেক্রেটারি সবাইকে সাধ্যসাধনা যথোচিত পূজানৈবেদ্য নিবেদন। আপাতত জলখিয়ার প্রতিশ্রুতি ও অদূর ভবিষ্যতে একতার অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণপত্র। দয়ার প্রাণ একজন ফাঁইলটি খুঁজে নিয়ে এলেন। অমলের চোখের সামনে এখন ফাঁইলের পাতায় বিস্তারিত নোটশিট, একতা ক্লাব একটি সর্বভারতীয় সাংস্কৃতিক সংস্থা বলে দাবি করে বটে কিন্তু এটি আসলে এক অনওড়িয়া বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। এর বেশির ভাগ সদস্য বহিরাগত, একটি প্রতিবেশী রাজ্যের। বম্বে থেকে আর্টিস্ট এনে এরা হিন্দি ফিল্ম সঙ্গীত পরিবেশন করে প্রচুর মুনাফা লোটে। ওড়িশার মাটিতে এরা এক ঐতিহ্যবিরোধী অপসংস্কৃতির বাতাবরণ সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে (উদাহরণ দৈনিক খবর তারিখ এত সন এত) দেখা যায় জনমত সংস্থাটির ঘোর বিরোধী। সন্দেহহতে পারে এমন একটি সংস্থার রবীন্দ্রমূর্তি স্থাপনের প্রয়াসে গভীর ষড়যন্ত্র আছে। ইত্যাদি।
অমল পড়ে যায় বটে কিন্তু প্রথমে যেন বুঝতে পারেনা। আবার পড়ে। কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থে নির্মিত সভাঘরটিতে যে প্রথমে রবীন্দ্রনাথের একটি বিশাল চিত্র ছিল এবং এই সভাঘরটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব যে রাজ্য সরকারের এ সব প্রসঙ্গের বিন্দুমাত্র উল্লেখ নেই। যেন মূর্তিপ্রতিষ্ঠার প্রস্তাবটি একতার এক হঠাৎ উৎপাত। নোট-এর তলায় সই, এ পট্টনায়ক। অনিলেন্দু নিজের হাতে লেখা সুচিন্তিত মতামত। ফাঁইলটা ফেরত দিয়ে অমল খানিকক্ষণ বসে থাকে। সরকারের সিদ্ধান্ত বলাবাহুল্য অনিলেন্দুর মন্তব্যের ভিত্তিতে। সংস্কৃতি দপ্তরের সচিব শ্ৰীব্রজেন্দ্র রথ আই এ এস সংবেদনশীল কবি। কলকাতায় বাঙালি কবিদের বন্ধু। তারই নির্দেশে সরকারের উত্তর লেখা।
অমল সোজা চলে যায় মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরে। আগে থেকে বন্দোবস্ত না করে সাক্ষাতের চেষ্টা কেবল তার মতো দুকান কাটা সর্বত্রগামী জনসংযোগ বিশেষজ্ঞর পক্ষেই সম্ভব। কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। অবশেষে সাক্ষাৎ। একতাকে লেখা সংস্কৃতি দপ্তরের চিঠিটা অমল মুখ্যমন্ত্রীর সামনে মেলে ধরে। তিনি চোখ বোলান নীরবে। অমল দৈনিক খবর-এর প্রতিবেদনটির কথা তোলে। তাঁ, মুখ্যমন্ত্রীর জানা। ব্যাপারটা দুর্ভাগ্যজনক, রাজনীতি ঢুকে গেছে, নিস্তেজ গলায় যোগ করেন। ভাববাচ্য। যেন ঝড়বৃষ্টি বাদলার মতো প্রাকৃতিক নিয়মে আপনা-আপনি হয়েছে। কোনও মানবশক্তির সক্রিয় ভূমিকা নেই।
