ইতিমধ্যে আমি সাবধানে একটু মুখে দিয়েছি–গরম ফ্যানা ভাতে খানেকটা দুধ ঢালা কিটকিটে মিষ্টি মাঝে মাঝে কিশমিশ ও কাঁচা চিনেবাদাম। হে ঈশ্বর এ কী পরীক্ষায় আমাকে ফেললে। এ যে ধর্মসঙ্কট। আমি কিনা খাঁটি ক্যালকেশিয়ান। তিন পুরুষ কলকাতায় ক্লিয়ার পেডিগ্রি। আমার জিভ তৈরি হয়েছে দ্বারিক ভীমনগনকুড় হয়ে বাঞ্ছারামে। বাড়িতে পায়েসে গোবিভোগ চাল আর দুধের অনুপাত এক আর দশ। আর আমাকে কিনা এ পদার্থ পায়েস হিসাবে মেনে নিতে হল। তারপর যে কোনও নেমন্তন্নে ক্ষীরি বস্তুটি দেখলেই বলি মাপ করবেন। সুগারের প্রবলেম। মিষ্টি বারণ। অতঃপর জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কত ক্ষীরিকে পায়েস হিসেবে দেখাবার সুযোগ কানু মিশ্ররা সদ্ব্যবহার করবে কে জানে। নাট্য আন্দোলন তো সামান্য দৃষ্টান্ত।
কবি তিলোত্তমা বিশোয়লের সঙ্গে কথা বলতে বলতে নীচে নামি। একতা ক্লাবের কাজকর্ম সম্পর্কে দু-চারটে মামুলি প্রশ্নোত্তরের পরে ভদ্রমহিলা একটু ইতস্তত করে বললেন তার একটি অনুরোধ আছে। বাংলা হাতে লেখা একটি চিঠি তিনি পেয়েছেন সেটি কি আমরা একটু পড়ে দিতে পারি। আরও জানালেন যে তিনি বিশ্বভারতীর এম-এ, বাংলা প্রচুর পড়েন, স্বদেশ নেন নিয়মিত, কলকাতার অনিলদা মুক্তিদার সঙ্গে সর্বদা যোগাযোগ। সকলেরই তিনি আশীর্বাদধন্যা। কলকাতা বইমেলা, সাহিত্য আকাদেমির আলোচনা অনুষ্ঠানগুলিতে নিমন্ত্রণ পান। শুধুহাতে লেখা বাংলা পাঠোদ্ধারে একটু যা অসুবিধা। আমি যদি দয়া করে ইত্যাদি। বেরুবার মুখে লাউঞ্জে বসা হল। ব্যাগ থেকে চিঠিটা বের করে দিলেন তিলোত্তমা। আশ্চর্য এত বছর বাদে আজও চিঠিটির প্রায় প্রতিটি ছত্র আমার মনে আছে।
স্নেহের তিলোত্তমা,
এত সুন্দর বাংলা তুমি কোথায় শিখলে? শান্তিনিকেতনে? তোমার চিঠি পড়ে সত্যি আমি অভিভূত। লিখেছ আমার আকাদেমি পুরস্কার পাওয়া বই কলকাতার বিশু তুমি ওড়িয়াতে অনুবাদ করতে চাও। আমার সানন্দ সম্মতি রইল। কিছু কিছু অনুবাদ ওড়িয়া পত্র পত্রিকায় প্রকাশনার কথাও ভেবেছ। সে তো অতি উত্তম প্রস্তাব। ছাপা হলে আমাকে খবর দিও।
গত মাসে ভূপালে কালিদাস সম্মেলনে রজনীকান্ত মিশ্রর সঙ্গে দেখা। তার শ্রীগণেশ সম্মান পাওয়ার পর এই প্রথম যোগাযোগ পুরস্কৃত কাব্য আজিকার পার্বতীর অংশবিশেষ পাঠ করলেন। সত্যি অপূর্ব। যোগ্য পাত্রেই সম্মান অর্পিত হয়েছে। এমন শক্তিশালী কলম বাংলায় কই। শ্রীনিশিকান্ত পট্টনায়েক খবর কী? বিদ্যাপীঠ পুরস্কার পাওয়ার সময় তো উনি দিল্লিতেই ছিলেন। শোনা যাচ্ছে অবসর গ্রহণের পর সাহিত্য আকাদমি বা ন্যাশনাল বুক ট্রাস্টের দায়িত্ব নেবেন। ওঁর নির্বাচিত কবিতাগুচ্ছের ইংরেজি অনুবাদ জগা কালিয়া অ্যান্ড আদার পোয়েমসআমাকে এক খণ্ড পাঠিয়েছিলেন। ওড়িয়া কবিদের যে বৈশিষ্ট্যটি আমাকে গভীর ভাবে নাড়া দেয় সেটা হল তাঁদের ঐতিহ্য চেতনা। শিবপার্বতীর কাহিনী জগন্নাথদেবের মাহাত্ম্য আজও তাদের প্রেরণা জোগায়। বাঙালি কবিদের ঐতিহ্যের বা মাটির সঙ্গে এমন যোগ আর দেখা যায় না। সত্যি জনজীবন থেকে আমরা বড় দুরে সরে এসেছি।
শুনলাম ওড়িশা সরকারের সংস্কৃতি দপ্তরের ভার নিয়েছেন ব্রজেন্দ্র রথ। গুয়াহাটিতে পূর্বাঞ্চল কবি সম্মেলনে তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। ভারীন বিনয়ী সংবেদনশীল। একজন কবির ঠিক যেমনটি হওয়ার কথা। তোমার সঙ্গে তো বোধহয় এঁদের যোগাযোগ হয়। সবাইকে আমার প্রীতিও শুভেচ্ছা জানিও।
লিখেছ ভুবনেশ্বর গেলে যেন তোমাদের বাড়িতে উঠি। তোমার আতিথেয়তার তুলনা নেই। গতবারে তোমার স্বামী ও ছেলেমেয়েদের সঙ্গে গল্পগুজবের সন্ধ্যাটি স্মরণীয় হয়ে আছে। তোমার ছেলে বুরলা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হয়েছে আর মেয়ে ভুবনেশ্বরে জ্যাভেরিয়ান ইনস্টিটিউটে এম বি এ কোর্স করছে জেনে সুখী হলাম। শ্রীযুক্ত বিশোয়াল তো এখন সেক্রেটারিয়েটে মৎসদপ্তরের উঁচু পদে আছে। তাই না? সপরিবারে তোমাদের উন্নতি ও শ্রীবৃদ্ধি কামনা করি।
ইতি
শুভাকাঙ্খী
নরেন্দ্রনাথ চাকলাদার
আমার জীবনের সঙ্গে এদিনের ঘটনা বা এ চিঠির কোনও সম্বন্ধ নেই। তবু প্রতিটি শব্দ প্রতিটি ছত্র আজও মনে আছে। কেন কে জানে। কার্যকারণ যোগ পাই না, যুক্তি তোনয়ই। সে সময় কবি সুহাসের কথা শুনে,নরেন্দ্রনাথ চাকলাদারের চিঠিটা পড়ে কেমন একটা কষ্ট হয়েছিল। যেন কেউ আমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছে। অথচ কে কবি নরেন্দ্রনাথ চাকলাদার তার সঙ্গে আমার কস্মিনকালে কোনও যোগাযোগ নেই। যেমন নেই তিলোত্তমা বিশোয়ালের সঙ্গে। তাহলে এদের মধ্যে চিঠি চালাচালিতে আমার গায়ে হুল ফোটে কেন। বুঝতে পারি না। তাই ছায়া দেবনাথকে এসব কথা বলি না। যে সব ঘটনা আদ্যোপান্ত বেশ যুক্তিটুক্তি দিয়ে পরিষ্কার বুঝি, সেগুলোই শুধু বলি। অন্য একজনকে কি মনের সব কথা বলা যায়। আমি তো মৈত্রেয়ীকেই কত কথা বলিনি। ছায়া দেবনাথ তো কোথাকার কে। সেদিনকার মেয়ে। পরের দিন যখন হাসি হাসি মুখে এসে চেয়ার টেনে বসবে এসব স্মৃতি কিছুই মনে পড়ে না এমন ভান করব। জীবনের বেশির ভাগ পরিস্থিতিতে বেশির ভাগ মানুষের সঙ্গে আমরা তো ভানই করি। আসল কথা সর্বদা মনের কোন অতলে চাপা।
