—তিলোত্তমার কবিতা। ইংরিজি অনুবাদ। কী সুন্দর। ঠিক বাংলার মতো। সেই গ্রাম সেই গাছপালা ধান ক্ষেত মানুষ প্রকৃতি, একই অনুভূতি। কোনও তফাত নেই ওড়িয়া আর বাংলায়।
তিলোত্তমা নববধুর মতো সলজ্জ হেসে সবিনয়ে মাথা নত করে রইলেন। আমি অমলকুমার দাস স্বর্গত হরিচরণ দাস বি এ বি এল, কংগ্রেসকর্মী জাতীয়তাবাদীর পুত্র, জন্ম থেকে দেখেছি দিদির হাতে ক্রসস্টিচে গেরুয়া সাদা সবুজে মহান মন্ত্র লতার ভঙ্গিতে সেলাই করা ঘরের দরজার মাথায় সযত্নে বাঁধানো একজাতি এক প্রাণ একতা। অতএব তৎক্ষণাৎ সুর মেলাই,
–নিশ্চয় নিশ্চয়, সে তো বটেই। এক দেশ, পাশাপাশি থাকা। কত শত শত বছরের সম্পর্ক। কবি সুহাস হাসি হাসি মুখে বলে চলেন,
–হ্যাঁ। সব কিছুই আমাদের মতো। জানেন ইনি–কানু মিশ্রকে দেখিয়ে বলছিলেন, এখানেও নাকি কলকাতার মতো বলিষ্ঠ নবনাট্য আন্দোলন আছে। প্রচুর প্রতিবাদী নাটক লেখা হয়। নিয়মিত অভিনয় চলে। কটকে অন্নদা থিয়েটার খুব বিখ্যাত। আপনারা দেখেছেন নিশ্চয়? প্রশ্নটা আমাকে ও সৌম্যেনকে লক্ষ্য করে।
আমি একটু অবাক। এক যুগ ওড়িশাবাসে মাঝে মাধ্যে সারা রাত ধরে পালা বা যাত্রা অভিনয়ের কথা শুনি, কিন্তু নিয়মিতভাবে টিকিট বিক্রি করে নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে এমনটি তো জানা নেই। এক সময়ে কটকেনাটক করত এক বাঙালি দম্পতি, উকিল স্বামী অধ্যাপিকা স্ত্রী। তারা দুজনেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে একত্র পড়বার সময় বহুরূপীর নাটক দেখে মোহিত ও উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। কটকে ফিরে গিয়ে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে বাংলায় বিদেশি নাটকের ভাবানুবাদ মঞ্চস্থ করলেন। গাঁটের পয়সা খরচ করে। দর্শক সব বিনেপয়সার আমন্ত্রিত। তা সত্ত্বেও দু-চারটির বেশি শো করতে পারেননি। স্থানীয় বাঙালিদের মধ্যে মাগনায় নাটক দেখার শখও নেই। তারপর এঁরা ওড়িয়াতে লিখলেন সামাজিক নাটক, এখানে ওখানে বিভিন্ন জেলা সদরে কটি শো হল। আর্থিক সাফল্য শূন্য। এখন আর করেন না। এঁদের দলের দু-চারটি ছেলে একতার ইনহাউস নাটকে অভিনয় করেছে। তাই ভাল করে জানি। সুতরাং আস্তে করে না বলে পারলাম না।
-আমি তো এখানে বেশ কবছর আছি। কই অন্নদা থিয়েটারের নাম তো শুনিনি। কবি সুহাস উত্তেজিত হয়ে বললেন–
-এই তো বাঙালিদের দোষ। সব সময় নিজেদের সাহিত্য নিজেদের সংস্কৃতি নিয়ে মেতে থাকে। অন্যকে জানবার, অন্যের কাছ থেকে কিছু গ্রহণ করবার মানসিকতা নেই। কানু মিশ্র এতক্ষণ একটু বিব্রত মুখে শুনছিল, এখন তাড়াতাড়ি বলে ওঠে,
—নাহি নাহি, সিমিতি কিছি নুহে। ঘটনা কণ কি, কেত্তে দিন হেলা অন্নদা থিয়েটার বন্ধ অছি। তাই দাসবাবু জানি নাহান্তি।
এবারে বিরক্ত লাগে। কটক ভুবনেশ্বর খোরদায় যত দল বিভিন্ন প্রোদানুষ্ঠান করে প্রত্যেকের নাড়ীনক্ষত্র আমার জানা। বিলিতি ঢং-এর কনসার্ট, ওড়িশি নৃত্য, ক্ল্যাসিক্যাল গান, বেহালা বাজনা কে কেমন করে, কার কত রেট,কী বাহানা সব আমার নখদর্পণে। এই তো বিখ্যাত ওড়িশি নাচিয়ে ওড়িশি গবেষণা কেন্দ্রের ডিরেক্টর ঝুমঝুম মহান্তির প্রচণ্ড শুচিবাই, ওঁর ছাত্রীদের একতার বার্ষিক সমাবেশে নাচতে দেন না। বলেন হোটেলের খিয়াপিয়া সাঙ্গরে ওড়িশি চালিবনি। হোটেল স্বস্তি, কি হোটেল মেঘদূত-এর ব্যাংকোয়েট হল যেন বাইনাচ বা ক্যাবারের জায়গা এমন ভাব। কানু মিশ্রকে জব্দ করার জন্য বলি,
—আচ্ছা কটকে অন্নদা থিয়েটারে কবে লাস্ট শো হয়েছিল? কী নাটক ছিল সেটা কানু মিশ্রর মনে নেই। তিলোত্তমা বিশোয়ালও ঠিক জানেন না। কবি সুহাস চট্টোপাধ্যায় অবশ্য এসব কিছুই কানে নিচ্ছেন না। তিনি তিলোত্তমার কবিতার ইংরিজি অনুবাদের ইতস্তত পাতা ওল্টাচ্ছেন আর বলে যাচ্ছেন সত্যি সবই আমাদের মতো। কোনও ভেদ নেই কোনও ভেদ নেই।
তিলোত্তমা বিশোয়াল কানু মিশ্রকে কবি সুহাসের খাওয়াদাওয়া ঠিকমতো দেখাশুনা করতে অনুরোধ করে উঠে পড়েন, তাঁর কলেজে পরীক্ষা সংক্রান্ত কী কাজ আছে। কানু মিশ্র নট নড়ন চড়ন। কী আর করা। আমিও সৌম্যেনকে নিয়ে উঠে পড়ি। কানু মিশ্রর সামনে তো রবীন্দ্র মুর্তিটুর্তির ব্যাপার তোলা যাবে না। সে তো এখন বসে বসে আরও জ্ঞান দিয়ে যাবে, ওড়িয়াদের কী কী ঠিক বাঙালিদের মতো।
একতার আমরা সবাই খেয়াল করেছি স্থানীয় ওড়িয়ারা কথায় কথায় একটা মজার ইডিয়ম ব্যবহার করে, আম্ভে আউবঙ্গালি মানে, আমরা আর বাঙালিরা। যেমন সব পাঁচমিশালি পার্টিতে শোনা যায় আম্ভে আউ বঙ্গালি মানে সবুবেলে মাছ খাউঁচু। তারপর নির্ঘাৎ দেখব মিশ্র পাণিগ্রাহী পট্টনায়েক মহান্তি-মিস্টারনা হোক মিসেস গুটি গুটি চলেছে নিরামিষ টেবিলের দিকে, আজি সোম গুরু (বৃহস্পতি) শনিবার অথবা কার্তিকমাস বা অমুক ও বা ব্রত কিংবা সংক্রান্তি অতএব সাদা খাইবা, নিরামিষ আহার।
আম্ভে আউ বঙ্গালি মানে ধুয়াটির সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ভুবনেশ্বরে আসার পর পরই অফিসে এক বিড়াখানায় বড়বাবুর অবসর গ্রহণ উপলক্ষে স্টাফের সঙ্গে দ্বিপ্রহরিক আহারে। আতপচালের ভাত অড়হর ডাল, রসুন দিয়ে শাক, ফুলকপি আলুর তরকারি এবং কড়া ভাজা ছোট পোনার ঝোল। দুটি পদই পেঁয়াজ-রসুন গরগরে অতএব যথাসম্ভব ঝোল বাদ দিয়ে খাচ্ছি। এমন সময় প্রচুর পেঁয়াজ কাঁচালঙ্কা ও সামান্য টমাটো শশাকুচি ভর্তি পাতলা দই হাতা হাতা দিয়ে গেল। শেষ হতে না হতে সমস্বরে রব উঠল ক্ষীরি কাঁই, ক্ষীরি আন। পিয়ন নিরঞ্জনের সসম্ভ্রমে পরিবেশন ক্ষীরি সার ক্ষীরি। একটা ধোঁওয়াওঠা মাটির খুরি এঁটো পাতায় ঠক করে বসল। পাশে বসা বিদায়ী বড়বাবু সাগ্রহে ব্যাখ্যা করলেন, আম্ভে আউ বঙ্গালিমানে সার বহুৎ মিঠা খাউঁচু। আপনমানংকর পায়েস আউ আম ক্ষীরি। একা জিনিস। নিয়ন্তু সার। আরে নিরঅ আউ টিকিএ সারকু দেলু। বলাবাহুল্য তাকেও আউ টিকিএ আরও একটু।
